সিলেট মহানগরীর রায়নগর এলাকায় বৃদ্ধ দম্পতি ও তাদের গৃহকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় প্রায় ছয় ঘণ্টার মধ্যেই বাবুল মিয়া (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রায়নগর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বাবুল মিয়া রাজবাড়ী এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনিতে বসবাস করেন এবং পেশায় রংমিস্ত্রি হলেও মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
যেভাবে ঘটে হত্যাকাণ্ড
সিলেট মহানগরীর রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় বুধবার সকাল ৯টা ২৫ থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে এই ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা ঘটে বলে জানান সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, প্রযুক্তিগত তথ্য ও অন্যান্য বিষয় বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে বাবুল মিয়াকে শনাক্ত করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলেও জানান পুলিশ কমিশনার।
নিহতরা হলেন-মৃত আবরু মিয়ার ছেলে, ওই বাসার মালিক মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২৫)।
পুলিশ জানায়, নিহত তিনজনের সঙ্গেই বাবুল মিয়ার আগে থেকে পরিচয় ছিল। তিনি আগে এই বাড়িতে রংমিস্ত্রি ও রাজমিস্ত্রির কাজ করেছিলেন এবং প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন আগে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার একটি ছুরি নিয়ে ওই বাড়িতে যান বাবুল। দরজায় নক করলে তাহমিনা তাকে ভেতরে ঢুকতে দেন। পরে একটি কক্ষে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হলে বাবুল তাহমিনাকে ছুরিকাঘাত করেন। তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে সুরাইয়া বেগমকেও আঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। তিনজনকে হত্যার পর বাবুল বারান্দা দিয়ে পালিয়ে নিজের বাসায় ফিরে যান, পরে বিশেষ পুলিশ টিম অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।
বাবুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তার বাড়ি চাঁদপুর বলে সে পুলিশকে জানিয়েছে।
ঘটনাস্থলের বর্ণনা ও তদন্তের নতুন মোড়
পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে লাশ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠায়। সুরতহাল প্রতিবেদনে নিহতদের গলা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলের দেয়াল ও বাথরুমের বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ দেখা গেছে এবং সাত্তারের কক্ষের তিনটি ওয়ারড্রোব তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায়।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া গেছে এবং মেঝেতে একটি দলিলের কপিও পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, রিকাবীবাজারের একটি সম্পত্তি নিয়ে চলমান বিরোধ ও মামলার একটি বিষয় চলছিল, যার একটি শুনানি আগামী ১৯ আগস্ট হওয়ার কথা ছিল।
নিহত আব্দুস সাত্তারের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক এই বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, রিকাবীবাজারের পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও সেখানে ইম্পাস টাওয়ার নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। গির্জা সমিতির কাছ থেকে লিজ নিয়ে সেখানে বাসা ও স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন আব্দুস সাত্তার।
২০২৩ সালে তিনি ওই সম্পত্তি নিয়ে স্বত্ব মামলা করেন (মামলা নম্বর ২১১/২৩)। পরে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সিভিল রিভিশন মামলা করেন, যেখানে আব্দুস সাত্তারকে বিবাদী করা হয় (মামলা নম্বর ৭০/২৩)। ওই মামলার শুনানির তারিখ ছিল আগামী ১৯ আগস্ট। আইনজীবী আরও জানান, প্রতিটি শুনানিতে আব্দুস সাত্তার নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতেন এবং প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও তিনি শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে নিহতের পরিচিত, বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখার দাবি জানিয়েছেন এবং এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে বলে ধারণা প্রকাশ করেছেন।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য বিভিন্ন কারণ সামনে রেখে তদন্ত চলছে এবং রিকাবীবাজারের জায়গা নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, ধারালো অস্ত্র দিয়ে তিনজনকে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে এবং এই ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রেমঘটিত বিষয়কে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে জানা গেলেও পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
নিহত আব্দুস সাত্তারের পরিচিতি
জানা যায়, আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন । এবং একসময় কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে থাকেন, যাদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। ফলে বুধবার পর্যন্ত নিহত দম্পতির সন্তানদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় বুধবার রাত পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।