উন্নত জীবন আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন সিলেটের ওসমানীনগরের যুবক মো. শামসুল ইসলাম কামরান (২৫)। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন কফিনে বন্দি। পর্তুগালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো এই রেমিট্যান্সযোদ্ধার মরদেহ আগামী শুক্রবার দেশে ফিরছে—সরকারি সহায়তায় নয়, সহকর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের আর্থিক সহযোগিতায়।
নিহতের মামাতো ভাই ও পর্তুগালপ্রবাসী আব্দুল কাইয়ুম জানান, মরদেহ দেশে পাঠানোর জন্য তারা প্রথমে বাংলাদেশ দূতাবাসের শরণাপন্ন হন। তবে দূতাবাস থেকে জানানো হয়, আগের অনেক আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। আইনি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত সহায়তা দেওয়া সম্ভব নয়।
এমন পরিস্থিতিতে পর্তুগালপ্রবাসী বাংলাদেশিরা নিজেরাই উদ্যোগ নেন। সামাজিকভাবে তহবিল সংগ্রহ শুরু করলে এখন পর্যন্ত ছয় হাজার ইউরোর বেশি অর্থ সংগ্রহ হয়েছে। সেই অর্থেই মরদেহ দেশে পাঠানোর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
পর্তুগাল বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রনি মোহাম্মদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পর্তুগালে আছি। এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের অসংখ্য প্রবাসীর লাশ চাঁদা তুলে দেশে পাঠাতে হয়েছে। আমরা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠাই, অথচ একজন প্রবাসী মারা গেলে তার লাশ পাঠাতে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কিছু হতে পারে না।”
প্রবাসী ব্যবসায়ী জুমন আহমদ বলেন, “কামরান মাত্র চার মাস আগে দেশে গিয়ে বিয়ে করেছিলেন। নতুন সংসারের সুখ আর সচ্ছলতার আশায় বিয়ের মাত্র তিন মাস পরই আবার পর্তুগালে কর্মস্থলে ফিরে আসেন। কিন্তু ভাগ্য তাকে আর দেশে জীবিত ফিরতে দিল না।”
স্থানীয় সময় ৪ জুলাই রাতে পর্তুগালের সেতুবাল জেলার আলমেদা এলাকায় কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন কামরান। তাকে আলমেদা হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পরদিন বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
রোববার লিসবনের সেন্ট্রাল মসজিদে জোহরের নামাজের পর কয়েক শতাধিক প্রবাসীর অংশগ্রহণে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
কামরানের বাড়ি সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর ইউনিয়নের খাগদিওর গ্রামে। তিনি প্রয়াত মুতলিব আলীর তৃতীয় সন্তান। দয়ামীর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস টি এম ফখর উদ্দিন জানান, নিহতের বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নতুন পুত্রবধূসহ পরিবারের সদস্যরা এখন প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় রয়েছেন।
- প্রতিশ্রুতি ছিল সরকারের, বাস্তবে এগিয়ে এলেন প্রবাসীরাই
প্রসঙ্গত, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর একাধিকবার বলেছেন, বিদেশে কর্মরত কোনো বাংলাদেশি মারা গেলে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সরকার নেবে। তিনি প্রবাসীদের 'রেমিট্যান্সযোদ্ধা' উল্লেখ করে তাদের মরদেহ দ্রুত ও সম্মানজনকভাবে দেশে পাঠানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানান।
তবে কামরানের মরদেহ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজন ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাদের দাবি, দূতাবাসের সীমাবদ্ধতার কারণে শেষ পর্যন্ত প্রবাসীদের চাঁদায় অর্থ সংগ্রহ করেই মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হয়েছে।
এদিকে প্রবাসীদের মরদেহ পাঠানোর বিষয়ে দূতাবাসের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কামরানের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতিই নয়, বরং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের কল্যাণে ঘোষিত সরকারি উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর-সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: