উগ্রবাদ হঠাৎ জন্ম নেয় না। পরিকল্পিত প্রচারণা, অপতথ্য এবং ধাপে ধাপে ধর্মীয় ব্যাখ্যার অপপ্রয়োগের মাধ্যমে মতাদর্শিক প্রভাব বিস্তারের মধ্য দিয়েই ছড়িয়ে দেওয়া হয় উগ্রবাদ। এই অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে একজন সাধারণ তরুণ ধীরে ধীরে উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। অদৃশ্য এক প্রক্রিয়ায় তার আগ্রহ রূপ নেয় উগ্র মতাদর্শে। কারা তাদের টার্গেট করে এবং কোন কৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এসব মতাদর্শ, এ প্রশ্ন এখন জনমনে।
কৌশলগতভাবে মতাদর্শ ছড়ানো
বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম ধাপ শুরু হয় ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত চিন্তা, বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রচারণার মাধ্যমে। ধীরে ধীরে অনুসারী তৈরি হলে ধর্মীয় উপদেশের আকারে নির্দিষ্ট মতাদর্শ তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক উগ্রবাদ সরাসরি সহিংসতার আহ্বান দিয়ে শুরু হয় না। প্রথমে ধর্মীয় আবেগ, পরিচয় সংকট কিংবা বৈশ্বিক অন্যায়ের বয়ান তুলে ধরে সহানুভূতি তৈরি করা হয়। এরপর ‘আমরা বনাম তারা’ ধরনের বিভাজন তৈরি করে ভিন্নমত বা ভিন্ন চর্চাকে শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একপর্যায়ে সহিংসতাকে ধর্মীয় বা নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলে।
বিতর্কিত বক্তব্য ঘিরে আলোচনা
অতি সম্প্রতি ইসলামিক স্কলার হিসেবে পরিচিত শাইখ ড. মুযাফফর বিন মুহসিনের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একটি ঘরোয়া সমাবেশে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বেনামাজিকে মেরে ফেলতে হবে’। তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও তিনি লিখেছেন, ‘যে সালাত আদায় করে না, সে কাফের মুরতাদ, হত্যাযোগ্য অপরাধী।’
এ ধরনের বক্তব্য মানুষের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সালাফি মতাদর্শ অনুসারীদের মধ্যে বিভিন্ন বয়সীরা তার উল্লেখযোগ্য অনুসারী রয়েছেন।
অতীতের ঘটনা ও গ্রেফতার
২০১৪ সালে তিনি মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী সম্পর্কে ‘শিরক করছেন’ ও ‘দাজ্জাল হয়ে গেছেন’—এমন মন্তব্য করে প্রতিবাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন মুযাফফর বিন মুহসিন। এর কয়েক দিন পর, ওই বছরের ২৭ আগস্ট আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের জঙ্গিদের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মাওলানা ফারুকী। ওই ঘটনায় ‘উসকানি ও নির্দেশদাতা’র অভিযোগে একই বছরের নভেম্বরে মুযাফফর বিন মুহসিনকে গ্রেফতার করা হয় এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে রিমান্ডে নেয়। তবে পরবর্তীকালে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ফারুকীর পরিচয়
মাওলানা ফারুকী সুপ্রিম কোর্ট জামে মসজিদের খতিব, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মতিন)-এর সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের নেতা ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ইসলামিক মিডিয়া’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও চ্যানেল আইয়ের একটি জনপ্রিয় ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন।
এ বিষয়ে মাওলানা ফারুকীর ছেলে আহমেদ রেজা ফারুকী বলেন, ‘‘দীর্ঘ একযুগ পেরিয়ে গেলেও মামলার কোনও অগ্রগতি হয়নি। শিগগিরই আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’’
মামলার বাদী ইসলামী ছাত্রসেনার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষারও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘‘অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও নানা কারণে তা করা হয়নি। এবার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আইনি উদ্যোগ নেওয়া হবে।’’
সরকারের অবস্থান
গত ৫ মে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, দেশে এক্সট্রিমিজম বা উগ্রবাদের অস্তিত্ব রয়েছে। এটিকে জঙ্গিবাদ বলুন বা উগ্রবাদ বলুন, এক ধরনের নিম্নমাত্রার ঝুঁকি বা লো-ইনটেনসিটি থ্রেট যে আছে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যে কারণে সরকার সতর্কতা বা অ্যালার্ট জারি করেছে।
মানবাধিকারকর্মীর উদ্বেগ
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ইউটিউবভিত্তিক কিছু ধর্মীয় বক্তার উসকানিমূলক বক্তব্য উপেক্ষিত থেকে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব বক্তব্য উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘এমন বক্তব্যও সামনে এসেছে যেখানে দাবি করা হচ্ছে—নামাজ না পড়া ব্যক্তিকে হত্যা করা বৈধ, যা সমাজে সহিংসতা ও নৈরাজ্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও ধর্মচর্চার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হুমকি তৈরি করছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘ধর্ম পালন করা বা না করা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। ভয়ভীতি বা চাপ প্রয়োগ করে কাউকে ধর্মীয় আচরণে বাধ্য করা গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের বক্তব্য উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোর জন্য হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।’’
নূর খান লিটনের মতে, যারা প্রকাশ্যে মানুষের অধিকার খর্ব করে, সম্মানহানি ঘটায় কিংবা জীবননাশের হুমকি দেয়—তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে সহিংসতা বা ঘৃণার বৈধতা দেওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, ‘‘ইসলাম শান্তি, সহনশীলতা ও মধ্যপন্থার শিক্ষা দেয়। অথচ কিছু বক্তা ধর্মের মূল চেতনাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছেন, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের পাশাপাশি ইসলামের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর। তাই ধর্মের নামে উগ্র ব্যাখ্যা নয়, সহনশীল ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা জরুরি।’’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ
র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, ‘‘ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানো ব্যক্তিরা নজরদারিতে রয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান।’’
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদী কনটেন্ট পুলিশের বিভিন্ন সাইবার ইউনিট নিয়মিত মনিটরিং করছে। কোথাও উগ্রপন্থি কার্যক্রমের ইঙ্গিত পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। উগ্রবাদ মোকাবিলায় পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে।’’
-
ঢাকা বার নির্বাচনে ২০ হাজারের মধ্যে পড়ল ৭ হাজার ভোট, জামায়াত-এনসিপি’র ভরাডুবি
-
ঢাকা-সিলেট ‘সড়ক ও রেল’ যোগাযোগ উন্নত করা হচ্ছে : জানালেন প্রধানমন্ত্রী
-
হামে প্রতিদিন মরছে মানুষ : ইউনিসেফের সতর্কতা উপেক্ষা করে টিকা কেনার পদ্ধতি পাল্টায় ইউনূস সরকার: সায়েন্সের প্রতিবেদন
-
সিলেটের বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ৭৫০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প ,শনিবার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
-
বিএনপি সরকার কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে পারবে?