বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)-এর বিচার কার্যক্রম আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না—এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch) (এইচআরডাব্লিউ)। নিউইয়র্কভিত্তিক এই সংস্থাটি বুধবার (২৯ জুলাই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ মন্তব্য করে।
HRW জানায়, এসব ঘাটতির কারণে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, আইনের শাসন দুর্বল হতে পারে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলায় বিরোধীদের কারাবন্দি করার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে অতীতের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও রয়েছে।
২৭ জুলাই ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জ দাখিল করেন। এসব অভিযোগ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে ঘিরে আনা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিকও রয়েছেন। ২০২৪ সালে বিক্ষোভের মুখে ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা ওই সরকারের পতন ঘটে।
HRW-এর এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত অনেক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার জন্য যারা দায়ী, তাদের যথাযথভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তবে অনেককে অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় থাকছে না।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় দ্রুত সংস্কার জরুরি। তাঁর ভাষায়, ‘ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত ও ইচ্ছামাফিক আনা অভিযোগের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কোনো সুযোগ যেন না থাকে, সেটা নতুন সরকারের নিশ্চিত করা উচিত।’
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ঘটনায় দায়ের করা বিভিন্ন মামলার শুনানি বর্তমানে আইসিটিতে চলছে। ওই সময় ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং হাজারো মানুষ গুরুতর আহত হন। পাশাপাশি শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমসহ অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।
HRW জানিয়েছে, তারা আইসিটির এক ডজনের বেশি মামলা পর্যবেক্ষণ করছে এবং এসব মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত জবানবন্দিতে ‘কাট-পেস্ট’ বা হুবহু পুনরাবৃত্তির প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল ছয়টি মামলার রায় দিয়েছে। এতে ৬২ জনকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ জনের বিচার হয়েছে অনুপস্থিতিতে এবং ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
২০১০ সালের মার্চে এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে। সে সময় ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে সেই বিচারপ্রক্রিয়াও প্রমাণের ঘাটতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং যথাযথ আইনি সুরক্ষার অভাবের কারণে সমালোচিত হয়েছিল।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার আইসিটি-সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার চেষ্টা করে। কিন্তু HRW-এর মতে, এখনও আন্তর্জাতিক আদালতের তুলনায় যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের নেতৃত্বে থাকা বর্তমান প্রশাসন এ আইনে নতুন কোনো সংশোধনী আনেনি।
সংস্থাটি আরও বলেছে, বর্তমান আইনে প্রসিকিউটররা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারেন এবং আটক ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় কারণ না জানিয়ে আটক রাখা সম্ভব। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন আপিলের সুযোগও নেই। এতে আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সময় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
গত ১৪ মে ট্রাইব্যুনাল দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়। ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ নিয়ে প্রতিবেদন করার কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। প্রসিকিউটররা দাবি করেন, তাঁরা ‘মিথ্যা তথ্য’ প্রচার করে হত্যাকাণ্ড আড়াল করতে সরকারকে সহায়তা করেছেন।
সাংবাদিকদের আইনজীবীরা HRW-কে জানান, গ্রেপ্তারের কারণ লিখিতভাবে জানানো হয়নি, যা আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
২৭ জুলাই দাখিল করা ৪১ জনের অভিযোগপত্রেও ওই দুই সাংবাদিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা বলতে বোঝায় কোনো জাতিগত, ধর্মীয় বা জাতীয় গোষ্ঠীকে আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত কর্মকাণ্ড।
HRW আরও উল্লেখ করেছে, একাধিক মামলায় একই ধরনের জবানবন্দির পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে মোহাম্মদ হাছান মাহমুদ চৌধুরীসহ অন্যদের মামলায় ১৪টি জবানবন্দিতে একই অনুচ্ছেদ প্রায় হুবহু পাওয়া গেছে।
একই মামলায় আওয়ামী লীগের নেতা এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবীরা একটি অডিও রেকর্ডিং প্রকাশ করেন, যেখানে এক প্রসিকিউটর অর্থের বিনিময়ে জামিনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ওই প্রসিকিউটর পদত্যাগ করেন, তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যেভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষকে শিকার বানিয়েছিল, সেই অতীত অপব্যবহারের পুনরাবৃত্তি যে করা যাবে না—সেটা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের বোঝা দরকার। হুবহু একই রকম (ডুপ্লিকেট) জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ আনা হলে তা একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচারপ্রক্রিয়ার ঘাটতিকেই তুলে ধরে, যা আবারও ভুক্তভোগী, তাঁদের পরিবার এবং সব বাংলাদেশিকে হতাশ করবে।’
-
‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানে শিক্ষকের ভিডিও ঘিরে যা ঘটেছে
-
হজ ক্যাম্পে প্রবাসীদের জন্য ১০০ শয্যার আবাসন হবে: প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী
-
২০ জেলায় নারী ডিসি, ১৯১ উপজেলায় ইউএনও নারী
-
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন কি পদত্যাগ করছেন : উত্তরসূরি নিয়ে জোর আলোচনা
-
নৈতিক স্খলন: গাজী নজরুলকে বহিষ্কার করল জামায়াত, এমপি পদও ঝুঁকিতে