ঢাকা ৩০ চৈত্র ১৪৩২, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
ঢাকা ৩০ চৈত্র ১৪৩২, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

কুষ্টিয়ায় দরবারে হামলা চালিয়ে পীরকে কুপিয়ে হত্যা, কী হয়েছিল সেখানে?

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২১ এএম

কুষ্টিয়ায় দরবারে হামলা চালিয়ে পীরকে কুপিয়ে হত্যা, কী হয়েছিল সেখানে?
কুষ্টিয়ার ফিলিপনগর ইউনিয়নের 'শামীম বাবার দরবার শরিফ'-এ হামলার চিত্র

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একটি দরবারকে ঘিরে যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তা শুরু হয় একটি পুরনো ভিডিওকে কেন্দ্র করে জমে ওঠা ক্ষোভ থেকে। শনিবার (১১ এপ্রিল) ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় অবস্থিত ‘শামীম বাবার দরবার শরিফ’-এ দুপুরের দিকে ধীরে ধীরে লোকজন জড়ো হতে থাকেন। অভিযোগ—কোরআন শরিফ অবমাননা করা হয়েছে। যদিও পুলিশ বলছে, যে ভিডিওটি ঘিরে এই উত্তেজনা, সেটি অন্তত তিন বছর আগের।

দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে দরবারটি ঘেরাও করা হয়। এরপর শত শত মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হামলা রূপ নেয় আরও ভয়াবহ আকারে—দরবারে অগ্নিসংযোগ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও দেখা যায়, উত্তেজিত জনতা দরবারের বিভিন্ন অংশে আগুন দিচ্ছে এবং তাণ্ডব চালাচ্ছে।

এই সময় দরবারের ভেতরে ছিলেন এর প্রধান আব্দুর রহমান ওরফে শামীম এবং তাঁর দুই অনুসারী। হামলাকারীরা তাঁদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়। লাঠিসোটা দিয়ে পিটিয়ে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয় তাঁদের। পরে স্থানীয়রা ও পুলিশ মিলে তাঁদের উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। চিকিৎসকরা জানান, আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে শামীম মারা যান। অন্য দুইজন চিকিৎসাধীন থাকলেও তাদের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত বলে জানানো হয়েছে।

ঘটনার সময় উপস্থিত স্থানীয় সাংবাদিকদের একজন জানান, হামলাটি ছিল আকস্মিক হলেও দ্রুতই তা ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নেয়। তিনি বলেন, প্রথমে কিছু মানুষ জড়ো হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা কয়েকশ মানুষের ভিড়ে পরিণত হয়। তাদের অনেকেই ছিল স্থানীয় তরুণ, কিশোর এমনকি শিশু।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুর একটা থেকে প্রায় পৌনে তিনটা পর্যন্ত হামলা ও ভাঙচুর চলে। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠায়। তবে হামলার তীব্রতা ও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় শুরুতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলে বিকেলের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, ২০২৩ সালের একটি ভিডিও নতুন করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই এই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তাঁর দাবি, হামলায় অংশ নেওয়া সবাই স্থানীয় এবং তারা ক্ষোভ থেকেই এই কাজ করেছে।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, নিহত শামীম নিজেকে ওই দরবারের পীর দাবি করতেন। এর আগেও ২০২১ সালে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলায় তিনি তিন মাস কারাগারে ছিলেন।

ঘটনার পর সন্ধ্যা পর্যন্ত দরবার এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের উপস্থিতিতেও কিছু বিচ্ছিন্ন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। পরে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

আইনগত পদক্ষেপের বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের পরিবার মামলা করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো মামলা করার আগ্রহ দেখা যায়নি। নিহতের বড় ভাই জানিয়েছেন, তারা কোনো ঝামেলায় যেতে চান না।

তীব্র প্রতিক্রিয়া
কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান লিখেছেন, ‘এই মানুষটাকে দেখুন। আরেক বার দেখুন। নাম তাঁর শামীম আল জাহাঙ্গীর। একজন সুফি। ভাবজগতের সহজিয়া মানুষ। তাঁর চিন্তার সঙ্গে হয়তো আপনার চিন্তা মিলবে না। কিংবা আপনার চিন্তার সঙ্গে তাঁর চিন্তা মিলবে না। না মিলার কারণে আজ কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরে তাঁর দরবারে হামলা চালিয়ে তাঁকে হ-ত্যা করেছে তৌহিদী জনতা নামক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

পুলিশ কেন? আদালত কেন? রাষ্ট্রইবা কেন? এই জন্য যে, তুমি আমার ওপর কোনো অন্যায় করতে পারবে না, আমিও তোমার ওপর কোনো অন্যায় করতে পারব না। করলে দণ্ডিত হতে হবে।

দেশে পুলিশ আছে, আদালত আছে, নির্বাচিত সরকার আছে, তবু আজ তৌহিদী জনতা এই হা-ম-লা ও হ-ত্যা-কা-ণ্ড ঘটিয়ে দিল প্রকাশ্যে, যেমন ঘটাত ইউনুসীয় শাসনামলে। এখনো তাদের ত্রাস বন্ধ হয়নি। আদৌ হবে কিনা কে জানে!

সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। সংস্কৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। গোটা সমাজ একদিকে কাৎ হয়ে আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে, ততক্ষণ কাৎ হয়েই থাকবে, সমান্তরাল হবে না।’