সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের রাষ্ট্রপতির আদেশকে ‘জাতির প্রতারণার দলিল’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর ভাষায়, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অন্তহীন একটি প্রতারণার দলিল’।
সংসদে বক্তব্যে তিনি বলেন, এই আদেশের কোনো বৈধতা নেই। ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন হলেও প্রথম দিনেই এই আদেশ আনা হয়নি।
“এই আদেশ রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ না হওয়ার কারণে ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হলেও সংসদের প্রথম দিনে এই আদেশতো উপস্থাপন করা হল না। কারণ এটা না হয় অধ্যাদেশ, নহে আইন। আমি সেজন্য বলেছিলাম এটা হয়তো কোনো নিউট্রাল জেন্ডার হতে পারে। এই আদেশটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্তহীন একটি প্রতারণার দলিল।
“এই আদেশের ১০ ধারা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের যে অধিবেশন আহ্বান করার কথা আমাদের মাননীয় বিরোধী দলীয় নেতা উত্থাপন করেছেন সেইটা ফ্যাক্ট ইস্যু সম্পর্কে আমি আজকে বলে ফেললাম। যে আদেশটার অনুকুলে আমরা দাবি করছি সেটা তো একটা অবৈধ আদেশ। অসাংবিধানিক আদেশের অনুকূলে বেআইনি কোনো আদেশের মাধ্যমে কোনো কিছুই বৈধতা পেতে পারে না।”
🔹 জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকার
তিনি বলেন, বিএনপি ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর প্রতিটি বিষয় ধারণ করে এবং তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
“বিএনপি এই স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ এর প্রতিটি অক্ষর শব্দ বাক্যকে ধারণ করে। বাস্তবায়নের জন্য জাতির কাছে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে জুলাই ছাত্রগণ অভ্যুত্থানের ২০২৪ এর শহীদের আকাঙ্ক্ষা এবং জাতির প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
🔹 সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের আহ্বান
৫১ শতাংশ জনগণের ম্যান্ডেটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সব দলের অংশগ্রহণে সংবিধান সংশোধন করতে চান।
“সরকারি দল-বিরোধী দল সবাইকে নিয়ে মহান জাতীয় সংসদে সমঝোতার ভিত্তিতে আলাপের মধ্য দিয়ে সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংশোধনী আনতে চাই।
“বাংলাদেশের মানুষের বিশাল জনপ্রত্যাশার প্রতি আমরা সকলেই দায়বদ্ধ। তাই আহ্বান জানাচ্ছি, আসুন সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে, সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার প্রতিপালন করি।”
🔹 বিশেষ সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব
সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
“সেজন্য আজকে এই মহান জাতীয় সংসদে প্রস্তাব রাখছি-সংসদ নেতার পক্ষে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সকল রাজনৈতিক দলের এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করা হোক। উক্ত কমিটিতে সকলে মিলে আলাপ-আলোচনা করে সমঝোতার মাধ্যমে জনপ্রত্যাশিত সংবিধান সংশোধনী বিল এই মহান জাতীয় সংসদে উত্থাপন করি এবং সেটা সমঝোতার মাধ্যমে আমরা গ্রহণ করি।”
🔹 রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন
সংবিধানের বিধান তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাষ্ট্রপতির এই আদেশ জারির ক্ষমতা আছে কি না।
“রাষ্ট্রপতি ৭২ অনুচ্ছেদ অনুসারে যে সংবিধানের মানে বিধান অনুসারে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী এই মহান জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন স্থান এবং সময় নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের কি কোনো অস্তিত্ব এখন আছে যে রাষ্ট্রপতি কোন বিধান বলে এই অধিবেশন আহ্বান করবেন?
“আমরা যেটা এখানে দাবি করছি সেটা তো একটা অবৈধ আদেশ। এখন যদি এটার ময়নাতদন্ত করতে চাই রাষ্ট্রপতির এই আদেশ কেন অবৈধ তার যুক্তিসমূহ একটু বলি। ৭ এপ্রিল, ১৯৭৩ সাল- এই তারিখ থেকে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ক্ষমতা রোহিত করা হইল। সংবিধানে চতুর্থ তফসিলের ১৭ দফার ২ দফার শেষ প্যারা।
“রাষ্ট্রপতি কোনো আদেশ এবং অধ্যাদেশ দ্বারা পরবর্তী সংসদের সার্বভৌম এখতিয়ারকে খর্ব করতে পারেন না কেন। পারেন না? আর্টিকেল সেভেন…(অনুযায়ী) রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং সেই জনগণের সার্বভৌমত্ব এখতিয়ার প্রয়োগের মাধ্যমে এই সংবিধান হচ্ছে সর্বোচ্চ আইন।”
🔹 জনগণের অধিকার ও ‘সম্রাটের আদেশ’ প্রসঙ্গ
তিনি বলেন, এই আদেশ জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করছে।
“সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ, সংবিধান পরিষদের অধিবেশন আহ্বান, সংবিধান সংস্কার অবিলম্বে কার্যকর করা- একটা ‘মহামান্য সম্রাটের’ আদেশ জারি হয়ে গেল- ১৮০ দিনের ভেতরে বিধান সংশোধন হয়েছে বলে ধরিয়া লওয়া হবে। তাহলে জনগণের অধিকার কোথায়? সুপ্রিমিসি কোথায়?
“জনগণ ৫১% ভোট দিয়ে কনস্টিটিউশনাল ম্যান্ডেটে নির্বাচিত করেছে এই সংসদ সদস্যদের। প্রশ্ন আসছে ওই পক্ষ থেকে তাহলে ৭০% কি হবে। এই ৭০% এর একটা ফয়সালা হবে। জনগণের রায়কে আমরা সম্মান করতে চাই। কিন্তু ৭০% তো দেওয়ার কথা ছিল- মাননীয় স্পিকার, জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে আছে কি নাই সেটার ওপর।”
🔹 অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা নিয়ে সমালোচনা
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মৌলিক সংশোধনের ক্ষমতা নেই।
“অন্তর্বতীকালীন সরকার মৌলিক কোনো সংশোধনের অধিকার রাখে না। তারা কীভাবে আদেশ জারি করে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে।
“আমি তখন মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে কথা বলেছিলাম যে, মহামান্য আপনি কি আদেশ জারি করতে পারেন? বললেন, আমি তো পারি না কিন্তু আমাকে পারাচ্ছে। তো এখন রাজহংসকে জোরপূর্বক স্বর্ণের ডিম পাড়তে বাধ্য করার মতো ঘটনা। যাই হোক এখন সেটা অবৈধ ডিম্ব হয়েছে।”
🔹 শপথ ও নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গ
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
“অস্তিত্বহীন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো বিধান না থাকার পরেও এখানে মাননীয় সদস্যবোধহয় ডক্টর শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেছেন, ‘এই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার ফর্ম আমি পটুয়াখালী থেকে আনি নাই। এখানে কে সাপ্লাই করলো’? আমি একমত।
“প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অফিস থেকে এই ফর্ম এখানে জাতীয় সংসদে দেওয়ার এখতিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নাই। তিনি শপথ নিয়েছেন তফসিল ১৪৮ অনুচ্ছেদের অনুবলে তফসিল ৩ এ। সংবিধান সংরক্ষণের জন্য তিনি শপথ নিয়েছেন। তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন, সংবিধান লংঘন করেছেন। কেউ একজন সিভিল রাইট হিসেবে মামলা করেছে ওখানে পক্ষভুক্ত করে নাই নির্বাচন কমিশনকে। কিন্তু রায় যদি আসে নির্বাচন কমিশন যে এটা ব্যাত্যয় করেছে এটা আসবে।”
🔹 শপথ জটিলতা ও দ্বৈততা প্রসঙ্গ
তিনি আরও বলেন, একই বিষয়ে দ্বৈত শপথের জটিলতা তৈরি হয়েছে।
“আমি মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এখানে বলা ঠিক না যেহেতু উনি অনুপস্থিত, এটা বিধান নাই সেজন্য ঘুরিয়ে বলছি- আপনি সংবিধান সংরক্ষণের জন্য শপথ নিয়েছেন এই ফর্ম আপনাকে দাখিল করা জাতীয় সংসদ সচিবের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এখতিয়ার কে দিয়েছে, কোন আইন বলে পেয়েছেন?
“জাতীয় সংসদের সচিব এখানে উপস্থিত আছেন বলতে পারি। ভায়োলেশনতো হবে না। তিনি সেই ফর্মটা আমাদের কাছেও পাঠালেন, ওনাদের কাছেও পাঠালেন- আমরা তখন আমাদের নেতৃবৃন্দ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ করে বললাম, আমরাতো আজকে শপথ নিতে যাব এখানেতো দুইবার শপথ নিতে হবে দেখা যাচ্ছে।
“প্রথমবার শপথ নেওয়ার পরে দ্বিতীয়বার শপথ নিলে তো আগেরটা ভাইলেশন হয়ে যাবে। এখন কী করবেন? উনি বললেন, ‘আমি তো এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। ব্যালেটের মধ্যে একটা ধানের শীষ ছিল, আরেকটা কোদাল মার্কা ছিল, আরেকটা কি কি যেন ছিল, দাঁড়িপাল্লা ছিল, শাপলাও ছিল’। উনি বললেন যে, ‘ব্যালটেতো এখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা কোনো ব্যালট ছিল না। এখানে এমপি নির্বাচিত হওয়ার জন্য কনস্টিটিউশনাল ম্যান্ডেট হিসেবে নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্যদের নির্বাচনে একটা ব্যালট দিয়েছে। সেখানে আমরা সিল দিছি। আর একটা গণভোটের ব্যালট ছিল।”
-
মব সৃষ্টি করে ইউটিউবার আর এস ফাহিম আটক, দেওয়া হলো পুলিশে
-
গ্রিসে যাবার পথে সাগরে মৃত্যু : ভাসমান ২১ বাংলাদেশি উদ্ধার, মৃতদের ৮ জন সুনামগঞ্জের
-
হবিগঞ্জের মাধবপুরে তাহেরীর ওয়াজ মাহফিল ঘিরে ১৪৪ ধারা
-
শরীয়তপুরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন, কীভাবে দেওয়া হলো?
-
বিয়েবাড়িতে গান বাজানোর জেরে মারধরের অভিযোগ, কনের নানা-নানি বাড়িছাড়া
আরও পড়ুন: