ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ২৯৯টি আসনের মধ্যে বেসরকারি ফলাফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পেয়েছে দলটির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থীরা এবং বিএনপি সমর্থিত প্রতীকের প্রার্থীরা।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে লন্ডনে প্রায় দুই দশক স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখান থেকে দেশে ফিরে মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তিনি।
একসময় দুর্নীতির অভিযোগে যার বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল, সেই শান্ত স্বভাবের ৬০ বছর বয়সী নেতা এখন দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন।
২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেফতার ও কারাবন্দি অবস্থায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর চিকিৎসার প্রয়োজন দেখিয়ে দেশ ছাড়েন তারেক। প্রায় ১৬ বছর পর গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় ফেরেন।
ফেরার দিন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাজারো নেতাকর্মীর উপস্থিতি, বিজয়ী প্রত্যাবর্তনের আবেগ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় নাটকীয় দৃশ্য। দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সময় যেন এত দ্রুত বয়ে গেছে যে, নিজের অনুভূতি প্রকাশেরও অবকাশ পাননি তিনি। গত শনিবার রয়টার্সকে তিনি বলেন, যেদিন থেকে দেশে নেমেছি, সময় কীভাবে কাটছে বুঝতেই পারছি না।
তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বংশপরম্পরার এক প্রতীকী নাম। তার মা বেগম খালেদা জিয়া, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও দীর্ঘদিনের বিএনপি প্রধান, যিনি গত ৩০ ডিসেম্বর দীর্ঘ অসুস্থতার পর মৃত্যুবরণ করেন। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচদিনের মাথায় মাকে হারান তারেক রহমান।
তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ১৯৭৭-১৯৮১ মেয়াদের রাষ্ট্রপতি। ১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তার মৃত্যু দেশকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। তিন বছর পর খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। পরে দুই নেত্রীর বিরোধ চরমে পৌঁছে ‘ব্যাটলিং বেগমস’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়ের পথে বিএনপি
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলে বিএনপি পেয়েছে ২০০টির বেশি আসন, যা দলটির ইতিহাসে অন্যতম বড় বিজয়। ২০০১ সালে তারা পেয়েছিল ১৯৩টি আসন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে অবশ্য আওয়ামী লীগ ২৩০টির বেশি আসন জিতেছিল। এরপর আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।
এদিকে, গণঅভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্ব নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। ১১ দলীয় জোট থেকে নির্ধারিত ৩০টি আসনের মধ্যে তারা পেয়েছে মাত্র ছয়টি।
রাস্তায় উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও ভোটে তার প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি দলটি। নির্বাচনের আগের জরিপেও এমন আভাস মিলেছিল। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সমঝোতায় এনসিপির জোট গঠনের সিদ্ধান্ত অনেক তরুণ সমর্থকের কাছে দলটির আদর্শবিরোধী হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
গণভোটেও ইতিবাচক ইঙ্গিত
জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি সাংবিধানিক গণভোট। যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো হয়নি, বিভিন্ন জরিপ ও স্থানীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী—হ্যাঁ ভোট ২০ লাখের বেশি এবং না ভোট ৮ লাখ ৫০ হাজারের বেশি।
গণভোটের উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরও জোরদার করা এবং প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই মেয়াদে ১০ বছর সীমা নির্ধারণ।
বিএনপির সংযত উদযাপন, শুক্রবার বিশেষ দোয়ার আহ্বান
বিপুল জয় সত্ত্বেও বিএনপি কোনো বিজয় মিছিল বা শোভাযাত্রা না করার নির্দেশ দিয়েছে। দলের বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে বিজয় অর্জন করলেও কোনো বিজয় মিছিল বা শোভাযাত্রা আয়োজন করা হবে না। বরং দেশের কল্যাণে জুমার নামাজের পর বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হবে।
কোন পথে এগোবেন তারেক রহমান?
তারেক রহমান এখন নিজেকে কেবল ‘রাজনৈতিক উত্তরসূরি’ নয়, বরং ‘গণতন্ত্র পুনর্গঠনের নেতৃত্ব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের অগ্রগতির একমাত্র পথ গণতন্ত্র চর্চার মধ্য দিয়েই সম্ভব। পররাষ্ট্রনীতির পুনর্বিন্যাস, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর সহায়তা বাড়ানো এবং নতুন শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে তিনি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, তার আকস্মিক উত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। তরুণদের নেতৃত্বে যে পরিবর্তনের ঢেউ তৈরি হয়েছিল, তা ভোটে প্রতিফলিত হয়নি। একই সঙ্গে দুই প্রধান দলের আধিপত্যের পরিচিত কাঠামোয় বিএনপির এই জয়কে অনেকেই প্রত্যাবর্তন হিসেবেই দেখছেন।
এদিকে গণভোটের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তায় জনসমর্থন স্পষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৪-২০২৫ সময়পর্ব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মানচিত্রকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে পারে।
-
শিক্ষানুরাগী, সংগঠক ও শালিস ব্যক্তিত্ব আজিজুর রহমান (সেক্রেটারি)-র ইন্তেকাল
-
ড. ইউনূসের সম্পদ বেড়েছে, দেড় বছর পর সম্পদের হিসাব দিলেন উপদেষ্টারা
-
ভোটের ফল যাই হোক, জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার আহবান প্রধান উপদেষ্টার
-
যে কোনো সময় ‘সরে দাঁড়াতে’ চান ঢাবির উপাচার্য
-
কারাবন্দি অবস্থায় মারা গেলেন আওয়ামী লীগ নেতা রমেশ চন্দ্র সেন