ঢাকা ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
ঢাকা ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
সর্বশেষ
যুক্তরাজ্যে ঈদের ছুটির দাবিতে হোয়াইটচ্যাপেলে দিনব্যাপী ক্যাম্পেইন, ১১ মে আলতাব আলী পার্কে সমাবেশ কলকাতায় মাংসের দোকানে বুলডোজার চালালো বিজেপি সমর্থকরা ১১ বছরের শিশু অন্তঃসত্ত্বা : নেত্রকোণার সেই মাদ্রাসাশিক্ষক গ্রেপ্তার ইরানকে ‘পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার’ হুমকি ট্রাম্পের মোদী সুনামিতে ভেঙে পড়ল মমতার শক্ত রাজনৈতিক দুর্গ, নেপথ্যে পাঁচ কারণ ঢাকা বার নির্বাচনে ২০ হাজারের মধ্যে পড়ল ৭ হাজার ভোট, জামায়াত-এনসিপি’র ভরাডুবি পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল হঠিয়ে আসছে বিজেপি? প্রাথমিক গণনায় এগিয়ে ঢাকা-সিলেট ‘সড়ক ও রেল’ যোগাযোগ উন্নত করা হচ্ছে : জানালেন প্রধানমন্ত্রী লিমনের পর বৃষ্টির মরদেহ যেভাবে শনাক্ত করল ফ্লোরিডা পুলিশ ইরানের নতুন ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব, গ্রহণে ‘সন্দিহান’ ট্রাম্প ‘যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে’ ইরান যুদ্ধ শেষ—জানালেন ট্রাম্প, ইরানের জন্য স্থলপথ খুলে দিল পাকিস্তান ইতালিতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, পরিবারকে ভিডিও কলে দেখালেন মরদেহ হামে প্রতিদিন মরছে মানুষ : ইউনিসেফের সতর্কতা উপেক্ষা করে টিকা কেনার পদ্ধতি পাল্টায় ইউনূস সরকার: সায়েন্সের প্রতিবেদন সিলেটের বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ৭৫০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প ,শনিবার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী বিএনপি সরকার কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে পারবে? নিউ ইয়র্কে মসজিদে মেয়ে শিশুকে নির্যাতনের অভিযোগে বাংলাদেশি ইমাম গ্রেপ্তার ইরানে আবার হামলা শুরু হতে পারে, ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা সরানোর আভাস ট্রাম্পের যুক্তরাজ্য বিএনপির ৪১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন সংসদে জামায়াত-রাজাকার ইস্যুতে মুখ খুললেন বিএনপির মন্ত্রীরা ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো ইমির জামিন, আইভীও জামিন পেলেন দুই হত্যা মামলায় ১১ টন ইউরেনিয়াম মজুত করল কীভাবে ইরান, কোথায় সেই মজুত? টাওয়ার হ্যামলেটসে লুৎফুর রহমান ও এসপায়ার পার্টির ইশতেহার ঘোষণা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-‘আমরা নারী’ সমঝোতা : শিক্ষা-গবেষণায় কাজ করবে কাঁদছেন কৃষকরা, ১৬০০ খরচ করে ৬০০ টাকায় ধান বিক্রি রোমানিয়ায় অনিয়মিত বাংলাদেশিদের সুখবর ইতালিতে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গেল বাংলাদেশি কর্মীর বিএনপি–জামায়াত পাল্টাপাল্টি বক্তব্য: কেবলই রাজনীতি? ফজলুরের বক্তব্যে সংসদ উত্তপ্ত: ‘শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করতেই পারে না’ প্রবাসীদের দোরগোড়ায় সেবা, নাপোলিতে সফল কনসুলার ক্যাম্প নতুন মুসলিমদের পাশে ইস্ট লন্ডন মসজিদ, চালু হলো নিউ মুসলিম হাব

রিকশাচালকের ঘর থেকে চাঁদাবাজির সাম্রাজ্যে

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৫, ০৯:২০ পিএম

রিকশাচালকের ঘর থেকে চাঁদাবাজির সাম্রাজ্যে
‘সমন্বয়ক’ পরিচয়ের আড়ালে রাজধানীতে চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য গড়ে তোলা রিকশাচাকের ছেলে রিয়াদ— তার গল্প এখন তরুণ রাজনীতির অন্ধকার গলির এক বিপজ্জনক প্রতিচ্ছবি। সাবেক এক সংসদ সদস্যের বাসায় চাঁদা তুলতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন তুলেছে আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান ওরফে রিয়াদের নাম। একদিকে দরিদ্র পরিবারের সন্তান হিসেবে শিক্ষাজীবনের সংগ্রাম, অন্যদিকে রাজনীতির ছায়ায় অপরাধে গা ভাসানো— দুই বিপরীত বাস্তবতা মিলিয়ে রিয়াদের এই পথচলা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, রিয়াদের শেকড় নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নে। দাদা ওয়ালীউল্যাহ চালাতেন রিকশা, বাবা আবু রায়হানও দীর্ঘদিন রিকশা চালিয়ে পরে দিনমজুরের কাজ ধরেন। মা সামসুন্নাহার অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। পাঁচ সদস্যের পরিবারে দিন এনে দিন খেয়ে চলত সংসার। সাবেক এমপির কাছে চাঁদাবাজির অভিযোগ, বৈষম্যবিরোধী নেতাসহ গ্রেপ্তার ৫সাবেক এমপির কাছে চাঁদাবাজির অভিযোগ, বৈষম্যবিরোধী নেতাসহ গ্রেপ্তার ৫ স্থানীয়দের সহযোগিতায় রিয়াদের পড়াশোনার খরচ চলত। নবীপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে ভর্তি হন কোম্পানীগঞ্জ সরকারি মুজিব কলেজে। সেখানেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাই কাদের মির্জার হাত ধরে রাজনীতিতে হাতেখড়ি। স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পান ‘কাদের মির্জার ক্যাডার’ হিসেবে। পরে ঢাকায় এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে রাজনীতির নতুন অধ্যায় শুরু করেন। কোটাবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে পরে যুক্ত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে। সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক হন। ধীরে ধীরে উত্থান ঘটে তার ‘সমন্বয়ক’ পরিচয়ের। ২০২৫ সালের আগস্টের পর রিয়াদ নিজ রাজনৈতিক পরিচয় বদলে দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন ‘সমন্বয়ক’ হিসেবে। এ পরিচয়ের আড়ালে চলতে থাকে সংগঠন, যোগাযোগ, ফান্ড সংগ্রহ— যার মধ্যে কতটা ছিল আদর্শ, কতটা ছিল স্বার্থসিদ্ধি, তা অনেকেরই অজানা। কিছুদিনের মধ্যে রাজপথের রাজনীতি, পোস্টার-ফেস্টুন আর ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরেন ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি, সচিবালয় ও রাজপথে উপস্থিতি— সব মিলিয়ে নিজেকে তরুণ সংগঠকের চেহারায় স্থাপন করেন। কিন্তু আড়ালের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। পুলিশ জানায়, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) শাম্মী আহমেদের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফরকে (৭৪) জিম্মি করে প্রথম দফায় ১০ লাখ টাকা আদায় করেন রিয়াদ ও তার সহযোগীরা। এরপর আরও ৪০ লাখ টাকার দাবিতে গত শনিবার (২৬ জুলাই) সন্ধ্যায় তারা ফের গুলশানের সেই বাসায় গেলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক ইব্রাহীম হোসেন মুন্না, সদস্য মো. সাকাদাউন সিয়াম ও সাদমান সাদাব এবং কর্মী মো. আমিনুল ইসলাম। এর মধ্যে চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। আরেকজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাকে গাজীপুরের টঙ্গী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় রিয়াদের গ্রামে ফের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে তার অতীত ও বর্তমান। একসময় যেসব মানুষ তাকে সাহায্য করেছিলেন, আজ তারা বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। নবীপুরে তাদের পুরোনো জরাজীর্ণ ঘরের পাশেই এখন উঠছে পাকা ভবন। দামি গাড়িতে রিয়াদকে ঘুরতে দেখা গেছে এলাকায়। অভিজাত রেস্টুরেন্ট, বিলাসী জীবন, প্রভাবশালী চলাফেরা— সব মিলিয়ে এক অস্বস্তিকর বিস্ময় তৈরি করেছে তার চারপাশে। এক প্রতিবেশী বলেন, ‘যে ছেলেটার মা মানুষের বাসায় কাজ করতেন, সেই ছেলে এখন ঢাকায় বড় নেতা হয়ে গেছে। আমরা তো শুধু অবাকই না, ভয়ও পাই।’ নবীপুর হাই স্কুলের সাবেক সভাপতি শিহাব উদ্দিন বলেন, ‘ওকে আমরা বই-খাতা দিয়েছি, পাশে থেকেছি। ভাবিনি সে এই পথে যাবে।’ রিয়াদের মা সামসুন্নাহার পর্যন্ত তার ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমরা না খেয়ে ওকে শহরে পাঠিয়েছি। কেউ ষড়যন্ত্র করে ওকে চাঁদাবাজ বানিয়েছে।’ তবে এই ‘ষড়যন্ত্র’ ঠিক কাদের আশ্রয়ে গড়ে উঠেছে, তা স্পষ্ট হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা এক বিস্ফোরক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘এদের শেকড় অনেক গভীরে।’ তিনি অভিযোগ করেন, সচিবালয়, মিছিল-মিটিং থেকে গুলশান-বনানীর গ্যাং কালচার পর্যন্ত সবখানেই ছিল তাদের অবাধ বিচরণ। উমামার ভাষায়, ‘রিয়াদ গত ডিসেম্বরে রূপায়ন টাওয়ারে আমাদের মেয়েদের সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেছিল। পরে জানতে পারি, তার বিরুদ্ধে হুমকি, চাঁদাবাজি, মারধরের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সে রাজনৈতিকভাবে প্রোটেকটেড ছিল—এই বাস্তবতা আমরা দিনের পর দিন দেখেছি।’ ৫ সমন্বয়কের চাঁদাবাজির খবরে বেদনায় নীল হয়ে গেছি: ফখরুল৫ সমন্বয়কের চাঁদাবাজির খবরে বেদনায় নীল হয়ে গেছি: ফখরুল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে একসময় সামনের কাতারে থাকা এই ছাত্রনেতা আরও লিখেছেন, ‘আজকের এই চাঁদাবাজির খবরে সবাই অবাক হওয়ার ভান করছেন। কিন্তু আমরা যারা ভেতর থেকে দেখেছি, তাদের কাছে এসব নতুন কিছু নয়।’ চাঞ্চল্যকরভাবে রিয়াদের ফেসবুক ঘেঁটে পাওয়া গেছে বিএনপি নেতা বাবর, এলডিপির আন্দালিব রহমান পার্থ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টার সঙ্গে তোলা ছবি। এসব সংযোগই তাকে রাজনৈতিকভাবে ‘নিরাপদ’ বলয়ে রেখেছিল বলে ধারণা করছেন অনেকে। ঘটনার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আজ পত্রিকা খুলে দেখি পাঁচজন সমন্বয়ককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা সাবেক একজন সংসদ সদস্যের কাছ থেকে জোর করে ৫০ লাখ টাকা আদায় করেছে। আমি বেদনায় নীল হয়ে গেছি।’ মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘এটাই কি আমরা চেয়েছিলাম? দেশের মানুষ কি এটা চেয়েছিল? এখনো এক বছর হয়নি, এত দ্রুত যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে ভবিষ্যৎ কী?’ এদিকে, চাঁদাবাজির অভিযোগে সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মীর নাম জড়ানোর পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি রিফাত রশিদ ঘোষণা দেন, কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সারাদেশের সব কমিটি স্থগিত করা হয়েছে। রিফাত বলেন, ‘গতকালের ঘটনা (শনিবার চাঁদাবাজির অভিযোগে পাঁচজন গ্রেপ্তার) এবং এর আগের কিছু ঘটনায় আমরা দেখতে পেয়েছি, সংগঠনের ব্যানার ব্যবহার করে নানা অপকর্মের চেষ্টা হয়েছে। আমরা যখন আত্মপ্রকাশ করেছিলাম, তখনই বলেছিলাম— এই প্ল্যাটফর্ম কোনো অপরাধের আড়াল হবে না।’ কেন্দ্রীয় কমিটি বাদে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সব স্থগিতকেন্দ্রীয় কমিটি বাদে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সব স্থগিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় এই সভাপতি আরও বলেন, ‘আমরা দেখছি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের কেউ কেউ বিভিন্ন মহলের আশ্রয়ে বিপথে চলে গেছে। দুর্নীতির চিহ্নও স্পষ্ট। এই পরিস্থিতি এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই সম্মিলিত সিদ্ধান্তে সারাদেশের কমিটিগুলো স্থগিত করা হলো।’ রিয়াদদের গল্প সমাজের সেই ভয়ংকর সত্যকে সামনে আনে, যেখানে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলতে বলতে কেউ কেউ নিজেরাই হয়ে উঠছে বৈষম্যের প্রতীক।