সোমবার, ২৭ জুন ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
https://blu-ray.world/ download movies
সর্বশেষ সংবাদ
যুক্তরাজ্যে ঈদের ছুটির দাবীতে  আলতাব আলী পার্কে সমাবেশ অনুষ্ঠিত  » «   পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে স্পেনে দূতাবাসের বিশেষ আয়োজন  » «   পদ্মা সেতুর স্মারক নোট বাজারে আসবে রবিবার  » «   পদ্মা সেতুর জন্য অভিনন্দন বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধির  » «   অদম্য বাংলাদেশ, খুলল পদ্মার দ্বার  » «   আছে শুধু ভালোবাসা, দিয়ে গেলাম তাই: প্রধানমন্ত্রী  » «   রেমিটেন্স প্রেরণে উদ্বুদ্ধকরণে মাদ্রিদে মতবিনিময় সভা’ অনুষ্ঠিত  » «   বিশ্বনাথে মায়ের কোল থেকে ভেসে গেল শিশু, ৫ জনের মৃত্যু  » «   লন্ডনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ইউকের বিশ বছরপূর্তি উদযাপন  » «   মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবাদ এবং সাধারণ জনগণ  » «   স্পেনে ঢাকা ফ্রুতাস (Frutas) এর ১৬ বছর পূর্তি উৎসব অনুষ্ঠিত  » «   সিলেটে বন্যা : বৃষ্টি হয়েছে নদ-নদীর পানি কমেছে  » «   সিলেটে রানওয়েতে বন্যার পানি, বন্ধ বিমানের ফ্লাইট  » «   যুক্তরাজ্যে ঈদে ছুটির দাবীতে আলতাব আলী পার্কে সমাবেশ ২২শে জুন  » «   বিয়ানীবাজারে বিদ্রোহী প্রার্থী ও গোলাপগন্জে নৌকা বিজয়ী  » «  
সাবস্ক্রাইব করুন
পেইজে লাইক দিন


নাগরী লিপি সাহিত্যের নিউইয়র্ক জয়



সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

বাংলা সাহিত্যের সম্পদ হয়েও মূল স্রোতধারা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন সিলেটি নাগরী লিপি বা হরফে রচিত সাহিত্য। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের এই ঐশ্বর্য্য নিকট অতীতেও সাধারণে ছিল অজ্ঞাত, অনাবিষ্কৃত। খুব অল্প মানুষই জানেন বাংলা হরফে বাংলা সাহিত্য চর্চার সমান্তরালে একদা সিলেটি নাগরী হরফেও বাংলা সাহিত্য চর্চা হতো । কালপরিসরে প্রায় ছয়শত বছর বৃহত্তর সিলেট এবং তার ভৌগোলিক সীমারেখার সংলগ্ন অঞ্চলে। ঢাকার অদূরে গাজীপুর থেকে ত্রিপুরা, আসামের শিলচর থেকে নেত্রকোনা জেলায় এই লিপির সাহিত্য আদৃত হয়েছিল। কয়েক বছর আগে ভৈরবের এক সাবেক সংসদ সদস্য, তার এলাকার এক মাজার থেকের সংগ্রহ করে একটি পান্ডুলিপি আমার কাছে নিয়ে এসেছিলেন। হাতে লেখা এ পুথিটি নাগরী লিপিতে রচিত। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা বিষয়ক এক পান্ডুলিপি   ছিল এটি। একটা সময় জনে জনে, ঘরে ঘরে আশ্রয় পেয়েছিল এই লিপিতে রচিত পুথি। মুদ্রণের যুগ শুরু হলে, ১৮৭০ সালে এর ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয় সিলেটের বন্দর বাজারে। বিলেত ফেরত মুন্সি আব্দুল করিম তার   ‘ইসলামিয়া প্রেসে’ নাগরী লিপির পুথি-পুস্তক মুদ্রণের উদ্যোগ নেন। মুন্সি নিজেও কয়েকটি কাহিনীকাব্য রচনা করেছেন এই নাগরী লিপিতে। নাগরী লিপি জনপ্রিয়তার শীর্ষে যখন পৌঁছেছে, তখন সিলেটে দুটো, কলকাতায় দুটো, সুনামগঞ্জে একটি এবং শিলচরে একটি ছাপাখানা একযোগে নাগরী হরফের বইপত্র মুদ্রণের কাজটি করতেন। শত বছর আগেও ছিল নাগরীর সুবর্ণকাল।

নাগরী লিপির সাহিত্য জগতের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের মূলধারার পাঠক তো বটেই, সাহিত্য ইতিহাসকারদের কাছেও ছিল অজ্ঞাত। বাংলা সাহিত্যের প্রথম ইতিহাস রচয়িতা গোপাল হালদার থেকে ড. শহীদুল্লাহসহ কারো সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থেই এ গৌরবময় বিষয়টি আলোচিত হয়নি। ফলে, এ লিপির সাহিত্য রচয়িতাগণ ইতিহাসের অন্ধকারে নিপতিত। অন্যপক্ষে, নাগরী হরফে রচিত সাহিত্য পাঠোদ্ধারে সক্ষম নন বলে অনভ্যস্ত পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছে এই সাহিত্যকর্ম। মধ্যযুগে যোগাযোগ ছিল পশ্চাৎমুখী, ফলতঃ এই লিপি ও সাহিত্য তার গন্ডি বাইরের মানুষের সহৃদ অভ্যর্থনা পায়নি।  নাগরীসাহিত্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। সেন্টমার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের মূল মানচিত্র থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন হলেও তা বাংলাদেশই। তেমনি নাগরী হরফ, যা বাংলা ভাষা চর্চায় ব্যবহৃত; তার সাহায্যে যে সাহিত্য এবং জীবনচর্চা হয়েছে, তাও বাংলা ভাষার সাহিত্যসম্পদ। সেন্টমার্টিনের সঙ্গে ব্রিজ স্থাপিত হলে যেমন এই দ্বীপটি বাংলাদেশের সাথে বিচ্ছিন্ন থাকে না, তেমনি নাগরী লিপি ও সাহিত্যের সাথে মূলধারায় বাংলা সাহিত্যের একটি সেতু তৈরি হলে, তা আলাদা থাকে না। এই যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে কাজ করে চলেছি ২০০৭ সাল থেকেই। এই আখ্যানের এক নবঅধ্যায় সিলেটি নাগরী লিপির নিউইয়র্ক জয়।

বাংলা সাহিত্যে সিলেটি নাগরী হরফ চর্চা কীভাবে এবং কখন চালু হল, তা বিস্তৃত পরিসর আলোচনার বিষয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে বাংলা লিপির সমান্তরালে বাংলা বর্ণমালারই একটি সংক্ষিপ্ত, সংস্কারকৃত, অধিকতর গতিময় ৩২ বর্ণের একটি বর্ণমালা চালু হয় সিলেট অঞ্চলে। উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িতদের হদিস এখন আর কোনো গবেষকদের হাতে না থাকলেও নাগরী লিপি গবেষকদের প্রায় সকলেই অনুমিত, কোনো ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণে সিদ্ধান্ত, হজরত শাহজালালের সিলেট আগমনের পরবর্তীকালে তার অনুসারীদের হাতেই এ বর্ণমালা উদ্ভাবন। সিলেট অঞ্চলে এর উৎপত্তি বলেই সম্ভবত এর নামকরণ হয় দেবনাগরীর আদলে সিলেটি নাগরী লিপি। ফুলনাগরী এই লিপির অন্য আরেকটি নাম। কেউ কেউ একে মুসলমানি নাগরী নামেও অভিহিত করেছেন।

সিলেটি নাগরী লিপির সাহিত্যে বাংলা ভাষার সিলেটি উপভাষা আশ্রিত হয়েছে প্রায় শতভাগ। আরবি-ফারসি প্রভাবিত সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা গ্রহণ করেছে বলে, সিলেট অঞ্চলের মানুষের দাবি, এটি তাদের ভাষার বর্ণমালা। এ কারণে সিলেটি নাগরী লিপি ও তার সাহিত্য ভাণ্ডারের প্রতি তাঁরা লালন করেন সুগভীর ভালোবাসা। হালে লুপ্ত এই ঐতিহ্যের নবজাগরণের একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, এবং এর পালে উৎসাহ উদ্যমের নতুন হাওয়া লেগেছে।

এরকম এক উৎসবে নাগরী লিপি সাহিত্যের নিউইয়র্ক যাত্রা এবং তার রচিত হয়েছে জয়গাথা। ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর আমেরিকার নিউইয়র্কের বাঙালি অধ্যুষিত জামাইকা শহরে ইয়র্ক কলেজ মাঠ  ‘বিশ্ব সিলেট সম্মেলন‘  অনুষ্ঠিত হল। গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া সিলেটি বাঙালিদের এক মহামিলনের স্বপ্নে আয়োজকরা মার্কিন মুল্লুকে বিস্তার করেছিলেন তাদের কর্মপ্রয়াস। ইয়র্ক কলেজের সবুজ চত্ত্বরে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে সূচিত এই উৎসব উদ্বোধন করেন বন্যাঢ্য সিলেটি স্যার ফজলে হাসান আবেদ। দুইদিনব্যাপী এই উৎসবে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, বাংলাদেশ, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সফল কয়েকজন সিলেটি মানুষ। বিজ্ঞানী আতাউল করিম যেমন উপস্থিত ছিলেন তেমনি লন্ডন থেকে যুক্ত হয়েছিলেন মটিভেশনাল স্পিকার তরুণ সাবিরুল হক। সম্মেলনে ইয়র্ক কলেজের মাঠে সমবেত হয়েছিলেন হাজার কয়েক মানুষ। তাদের মধ্যে দ্যুতি ছড়িয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত আলোকিত সফল মানুষেরা। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্যই ছিল জন্মভূমি সিলেট বন্দনা। আয়োজকেরা দুই দিনের এই সম্মেলনকে তাই সাজিয়েছিলেন ‘সিলেট সত্তা’  খুঁজে নেবার কিংবা খোঁজ দেবার পসরা নিয়ে। এই আয়োজনে একটি সেমিনার ছিল  ‘সিলেট হেরিটেজ‘। এ সেমিনারে অন্যান্য বিষয়ের সাথে   ‘সিলেটি নাগরী লিপি’র গৌরবগাথা নিয়ে বক্তৃতা দেবার জন্য আমন্ত্রিত হয়ে যোগ দিয়েছিলাম এ সম্মেলনে।

এ সম্মেলনের আগের দিন ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় দৈনিক প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকা সংস্করণ। প্রতি সপ্তাহে শুক্রবারই এ পত্রিকাটি নিয়মিত ওই অঞ্চলের পাঠকের দোরগোড়ায় হাজির হয়। নিউইয়র্ক থেকে ২২টি সাপ্তাহিক কাগজ প্রকাশিত হয় বলে জেনেছি। অন্য সকল কাগজের মুখায়ব, ব্যবসায়িক চরিত্র এবং দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় এক। কেবল ব্যতিক্রম প্রথম আলো। অন্য পত্রিকাগুলোর মুখশ্রী আমাকে তেমন আকর্ষণ করতে পারেনি।ও গুলো কমিউনিটি পত্রিকাই। কেবল প্রথম আলো কমিউনিটির জন্য প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের পত্রিকা হয়ে। প্রথম আলো বিশ্ব সিলেট সম্মেলনকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকাশ করেছে এই সংখ্যাটি। সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্য বিষয়ে গোটা দশেক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এই সংখ্যায়। লিখেছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, শাকুর মজিদসহ আরো অনেকে। এই সংখ্যায়     ‘নাগরী লিপি : বাংলা ভাষার অনন্য সম্পদ’ শিরোনামে আমারও একটি লেখা মুদ্রিত হয়েছে।

পরদিন বিশ্ব সিলেট সম্মেলনের উদ্বোধনী দিবস। প্রবেশমুখেই নাগরী লিপিতে লেখা একাধিক ফেস্টুন। মাঠের চারপাশেই লাগানো ফেস্টুনে সিলেটের গৌরব পরিস্ফূট করার চেষ্টা। এগুলোতে শোভা পেয়েছিল এই নাগরী হরফের তৈরি নানা বৈচিত্র্য। মাঠের এক কোণায় রয়েছে  ‘সিলেট ঐতিহ্য প্রদর্শনী’। সেখানে আগ্রহীরা নেড়েচেড়ে দেখছেন নাগরী লিপির বইপত্তর। রয়েছে ২৫টি গ্রন্থের নাগরী গ্রন্থসম্ভার (সম্পাদক : মো. আব্দুল মান্নান ও মোস্তফা সেলিম)। একটু এগুলেই প্রথম আলোর স্টল। সেখানে ফ্রি বিতরণ করা হয়েছে তাদের চলতি সংখ্যা। যেখানে রয়েছে সিলেটি নাগরী লিপির উপর পূর্ণপৃষ্ঠা একটি নিবন্ধ। মূলমঞ্চে বিকেলে প্রদর্শিত হয় সরোয়ার তমিজ উদ্দিন পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্র     ‘সিলেটি নাগরী লিপির নবযাত্রা‘। আমি অভিভূত। সিলেট উৎসব যেন নাগরীলিপিময়। এ সময়ের জন্য, এ দিনের স্বপ্নে আমি যাত্রা শুরু করেছিলাম ২০০৭ সালে প্রায় একা। ১০ বছর পর বিদেশবিভূইয়ে এমন উচ্ছ্বাস দেখে আবেগে আমার চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে।

পরদিন ১৭ সেপ্টেম্বর ইয়র্ক কলেজের একটি হলে বেলা ১২টায় শুরু হল আমার নাগরী লিপি বিষয়ে সেমিনার, সিলেট হেরিটেজ। হলভর্তি শ্রোতা, প্রতিটি আসন পূর্ণ কানায় কানায়। শ্রোতার সংখ্যা প্রায় শতাধিক, এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন একেকজন বোদ্ধা মানুষ। দিনের প্রথম সেশন ছিল এটি। দিনের অন্য সেশনের বক্তা, শ্রোতারাও এসে পড়েছেন ততক্ষণে। ফলত তারা সকলেই উদ্বোধনী সেশনের শ্রোতার আসনে। সমস্ত দুনিয়া থেকে আগত অতিথি সিলেটিদের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন নিউইয়র্কের সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মাধ্যমের সম্পাদকেরাও। উপস্থিত হয়েছিলেন নিউইয়র্কের বিশিষ্টজনেরা। এত গুণী মানুষকে কোনো সেমিনারে একসাথে পাওয়া বড়ই সুখের স্মৃতি। এই বিজ্ঞজনের সামনে আমি সিলেটি নাগরী লিপি ও সাহিত্য, তার গৌরবগাথা, লুপ্ত হয়ে যাওয়া এবং পুনরুজ্জীবনের ইতিবৃত্ত শুনালাম। খুব আগ্রহ নিয়ে শুনলেন শ্রোতারা। এই সেমিনারে শত মনীষার চিন্তাভুবনে বিস্তার করা গেলো বাংলা ভাষা সাহিত্যের এই অধ্যায়। এখানেই শেষ নয়।

কুইন্সের লেক সিয়রে ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে  ‘শহীদ ডা. আব্দুন নূর ফাউন্ডেশন‘ আয়োজন করে   ‘সিলেটি নাগরী লিপির নবযাত্রা’ প্রামাণ্যচিত্রের প্রদর্শনী এবং মত বিনিময় অনুষ্ঠান। ডা. আব্দুন নূর মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা। একাত্তরে পাকহানাদারের হাতে তিনি নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। সংগঠনটির নিউইয়র্ক সমন্বয় কমিটি এই আয়োজন করে। দর্শকদের বড় অংশ ছিলেন নবপ্রজন্মের সিলেটি বাঙালি। প্রদর্শনীর মতবিনিময় পর্বে তারা আবেগঘন বক্তৃতা করেন। এর নবজাগরণে, নিউইয়র্কে বাঙালি সমাজে কাজের উৎসাহ প্রদর্শন করেন।

ওজন পার্কে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে রোজ বেঙ্গল রেস্টুরেন্টে এ প্রামাণ্যচিত্রের তৃতীয় প্রদর্শনী ও মত বিনিময় অনুষ্ঠান হয়। আয়োজন করে শহীদ মনু মিয়া ফাউন্ডেশন। মনু মিয়া ছয় দফা আন্দোলনের প্রথম শহীদ। তার বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজারে। বিয়ানীবাজারের কয়েকজন মানুষ তার স্মৃতি রক্ষা এবং সমাজকল্যাণের লক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করেছেন শহীদ মনু মিয়া ফাউন্ডেশন। প্রদর্শনী স্থানের ধারণ ক্ষমতা পূর্ণটাই ছিল শ্রোতা ও দর্শকময়। এই প্রদর্শনীর মতবিনিময়ে প্রবীণরা স্মৃতি কাতর হয়ে ওঠে। তাদের শৈশব-কৈশোরে জৈষ্ঠ্যদের এই পুথি পড়তে দেখেছেন তারা। তাদের নানা-নানি, দাদা-দাদির নাগরী লিপিতে রচিত হালতুন্নবী কিংবা জঙ্গনামা পুথি পাঠের স্মৃতির ঝাপি খুলেন, প্রজন্মের প্রতিনিধিরা তা হৃদয়ঙ্গম করেন।

শেষে অন্য একটি অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ, কমিউনিটি নেতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার আয়োজন করেন তিনজন সিলেটিকে নিয়ে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। ছিলেন সংসদ সদস্য সেলিম উদ্দিন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক দূত ড. এ কে আব্দুল মোমেন, আমাকেও রেখেছিলেন আয়োজক কর্তৃপক্ষ। আলী বাবা কনভেনশন হলে সন্ধ্যায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে আমি সবিস্তারে সিলেটি নাগরী লিপি ও সাহিত্যের ইতিহাস এবং তার নবজাগরণের কাহিনি শোনাই সুধিদের।

কমিউনিটি টিভি টিভিএন ২৪, টাইম টিভি প্রচার করে একাধিক প্রোগ্রাম। কয়েকটি পত্রিকা এ বিষয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিশ্ব সিলেট সম্মেলন আয়োজক কমিটির আহবায়ক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, তারাও এ বিষয়ে আমাদের সাথে কাজ করবেন। আমার এই ভ্রমণ ছিল স্বল্প সময়ের। তারপরও দু’সপ্তাহের এই ভ্রমণের প্রতিদিন নিউইয়র্কে এ নিয়ে ছোটবড় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। আমেরিকাপ্রবাসী বাঙালিদের এই স্বতস্ফূর্ততা আমার কাছে ছিল অভাবিত। জীবনকে সাজাতে যারা প্রবাসী হয়েছেন, তারাও যে মর্মে দেশকে কত ভালোবাসেন, যতনে পোষেণ প্রিয় দেশমাতৃকাকে, তা হয়তো আমার অজানা থেকেই যেত।

নাগরী লিপি সাহিত্যেও নিউইয়র্ক জয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ফরাসি নাগরিক ড. থিবো দু’বের গবেষণা কাজে ঢাকায় এলেন। তার আগ্রহ রয়েছে এই লিপির সাহিত্য নিয়ে। তার সাথে একাধিক বৈঠক হল আমার কার্যালয়ে। তাকে নিয়ে আমি ১৩ জুলাই ২০১১ তারিখে ঢাকায় আয়োজন করি ‘সিলেটি নাগরীসাহিত্য : নতুন দৃষ্টিতে দেখা‘ অনুষ্ঠান। তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের লাইব্রেরির জন্য সংগ্রহ করেন ২৫টি গ্রন্থের নাগরী গ্রন্থসম্ভার। তার হাত ধরে মার্কিন মুল্লুকে ঠাঁই পেয়েছিল বাংলা ভাষার তো বটেই পৃথিবী ভাষা লিপির অনন্য গৌরব একই ভাষার একাধিক লিপি এবং তার সাহায্যে রচিত সাহিত্য ভান্ডার। বাংলার নিভৃত কোণে যা ছিল অনাদৃত, তা মর্যাদায় অভিসিক্ত হয়েছে বিদেশে বিভূইয়ে, সুদুর মার্কিন মুল্লুকে। সে যাত্রার পূর্ণতা দিল বিশ্ব সিলেট সম্মেলনের উপলক্ষ। এ অধ্যায়টি ছিল সিলেটি নাগরী লিপিতে রচিত সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের মূলস্রোতে প্রবাহমান করার আমাদের প্রচেষ্টার একটি সার্থক রূপায়ণ।

মোস্তফা সেলিম: নাগরী গবেষক, প্রকাশক;উৎস


সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন