যুক্তরাজ্যে আধুনিক দাসত্ব (modern slavery) ও কর্মক্ষেত্রে শোষণের শিকার অভিবাসী কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে হোম অফিস। স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় থাকা এবং আধুনিক দাসত্বের স্বীকৃত ভুক্তভোগীরা এখন তাঁদের শোষণকারী নিয়োগকর্তার চাকরি ছেড়ে অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে পারবেন, শুধু চাকরি পরিবর্তনের কারণে তাঁদের অভিবাসন-স্থিতি ঝুঁকির মুখে পড়বে না। হোম অফিস সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় বিষয়টি তুলে ধরেছে।
হোম অফিসের বক্তব্য অনুযায়ী, "আধুনিক দাসত্বের কোনো ভুক্তভোগীকে তাঁর অভিবাসন-স্থিতির কারণে শোষণকারী নিয়োগকর্তার কাছে আটকে থাকতে হবে না।" নতুন ব্যবস্থায় স্বীকৃত ভুক্তভোগীদের জন্য বিদ্যমান স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার মেয়াদ চলাকালীন অন্য নিয়োগকর্তার কাছে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
এর আগে স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল নির্দিষ্ট স্পনসর ও নির্দিষ্ট চাকরির সঙ্গে কর্মীর অভিবাসন-অনুমতির সম্পর্ক। সাধারণ নিয়মে ভিসাধারী ব্যক্তি তাঁর স্পনসর করা চাকরির বাইরে অন্য চাকরি করতে পারেন না। ফলে কোনো কর্মী যদি নিয়োগকর্তার কাছ থেকে গুরুতর শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম কিংবা আধুনিক দাসত্বের শিকার হতেন, তাহলে চাকরি ছেড়ে দিলে ভিসা হারানোর আশঙ্কা তাঁর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারত। নতুন পরিবর্তনটি এই ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেই আনা হয়েছে।
- নতুন নিয়মে কারা সুবিধা পাবেন
এই সুবিধা সব স্কিলড ওয়ার্কার ভিসাধারীর জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়। হোম অফিসের কম্পিটেন্ট অথরিটি (Competent Authority)-এর মাধ্যমে যেসব কর্মীকে আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, মূলত তাঁরাই নতুন বিধানের আওতায় পড়বেন।
হোম অফিসের ব্যাখ্যায়, এ ধরনের কর্মীদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার বাকি সময়ের জন্য নির্দিষ্ট স্পনসরের সঙ্গে কাজ করার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ তাঁরা অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে পারবেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের অধিকার পেয়ে যাবেন। তাঁদের বর্তমান অভিবাসন-অনুমতির মেয়াদ ও অন্যান্য প্রযোজ্য অভিবাসন শর্ত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
'স্বীকৃত ভুক্তভোগী' হওয়াটাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। শুধু নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই নতুন সুবিধাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগী হিসেবে হোম অফিসের নির্ধারিত কম্পিটেন্ট অথরিটির মাধ্যমে শনাক্ত হতে হবে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম (National Referral Mechanism বা NRM) ব্যবস্থায় সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের বিষয়ে প্রথমে একটি "রিজনেবল গ্রাউন্ডস" (reasonable grounds) এবং পরবর্তী পর্যায়ে "কনক্লুসিভ গ্রাউন্ডস" (conclusive grounds) সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামো রয়েছে। হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় এখনো সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা মামলার একটি ব্যাকলগ রয়েছে এবং সরকার ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেই ব্যাকলগ দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
- কেন এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ
অভিবাসন-স্থিতির সঙ্গে চাকরির সম্পর্ক অনেক সময় বিদেশি কর্মীদের নিয়োগকর্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল করে তোলে। যুক্তরাজ্যের মাইগ্রেশন অ্যাডভাইজরি কমিটি (Migration Advisory Committee)-ও অতীতে উল্লেখ করেছে যে অভিবাসন ব্যবস্থার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্কের কারণে অভিবাসী কর্মীরা বিভিন্ন ধরনের শোষণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এর মধ্যে অতিরিক্ত নিয়োগ ফি, বাজারদরের তুলনায় বেশি আবাসন খরচ এবং অন্যান্য শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ও রয়েছে।
আধুনিক দাসত্বের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। হোম অফিসের সাম্প্রতিক স্ট্যাটিউটরি গাইডেন্সে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক শ্রমের ক্ষেত্রে শারীরিক সহিংসতা ছাড়াও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বা পুলিশের কাছে কর্মীকে রিপোর্ট করার হুমকি এক ধরনের 'পেনাল্টি' (penalty) হিসেবে কাজ করতে পারে। এমনকি কোনো ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে কাজ করতে সম্মত হলেও যদি তাঁর কাছে বাস্তবসম্মত বিকল্প না থাকে, তাহলে পরিস্থিতিটি ফোর্সড লেবার (forced labour)-এর আওতায় পড়তে পারে।
সামগ্রিকভাবে, নতুন পরিবর্তনটি স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সুরক্ষা যোগ করছে। কারণ একজন কর্মী যদি জানেন যে শোষণকারী নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে কথা বললে চাকরি হারানোর পাশাপাশি তাঁর ভিসাও বিপদে পড়তে পারে, তাহলে তিনি নির্যাতন বা শোষণের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানাতে ভয় পেতে পারেন। নতুন নিয়মের লক্ষ্য হলো সেই ভয় কমানো — আধুনিক দাসত্বের স্বীকৃত ভুক্তভোগী যেন অভিবাসন-স্থিতির কারণে শোষণকারী নিয়োগকর্তার কাছে বন্দি হয়ে না থাকেন।
- যুক্তরাজ্যে আধুনিক দাসত্বের চিত্র কতটা বড়
হোম অফিসের সর্বশেষ পূর্ণ-বছরের পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ব্যাপকতা তুলে ধরে। ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যে ২৩,৪১১ জন সম্ভাব্য আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগীকে NRM-এ রেফার করা হয়। এটি ২০২৪ সালের ১৯,১১৭ জনের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি এবং ২০০৯ সালে NRM চালুর পর সর্বোচ্চ বার্ষিক সংখ্যা।
২০২৫ সালের রেফারেলগুলোর মধ্যে ৭৭ শতাংশ বা ১৭,৯৯৯টি কেস সিঙ্গেল কম্পিটেন্ট অথরিটির কাছে পাঠানো হয় এবং ২৩ শতাংশ বা ৫,৪১২টি কেস ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট কম্পিটেন্ট অথরিটির কাছে পাঠানো হয়। সবচেয়ে বেশি রেফার হওয়া জাতীয়তার মধ্যে ছিল যুক্তরাজ্যের নাগরিক, ইরিত্রিয়ার নাগরিক এবং ভিয়েতনামের নাগরিক।
২০২৬ সালেও প্রবণতাটি অব্যাহত রয়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত আরও ৬,০০৩ জন সম্ভাব্য ভুক্তভোগী হোম অফিসে রেফার করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি।
- বিশেষ করে বিদেশি কর্মীদের জন্য কেন বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের সঙ্গে আধুনিক দাসত্ব ও শ্রমিক শোষণের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। সরকারি নির্দেশিকাতেও বিদেশি কর্মীদের আধুনিক দাসত্বের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা ও রিপোর্টিংয়ের ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
তবে কর্মীদের মনে রাখা প্রয়োজন, এটি সব ধরনের কর্মক্ষেত্রের বিরোধ বা সাধারণ চাকরির সমস্যা সমাধানের কোনো সাধারণ ছাড় নয়। নতুন সুরক্ষা মূলত হোম অফিসের মাধ্যমে আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগী হিসেবে শনাক্ত হওয়া স্কিলড ওয়ার্কারদের জন্য প্রযোজ্য।
সূত্র: হোম অফিস, যুক্তরাজ্য
আরও পড়ুন: