বিশেষ প্রতিবেদক
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে শুক্রবার ৪ সেপ্টেম্বর সকালে দেখা গেল এক বিরল দৃশ্য-স্ট্রেচারের ওপর পরিপাটি বেডশিট পাতা, সঙ্গে বালিশও। যে হাসপাতালে সাধারণত সময়মতো একটা স্ট্রেচার মেলা তো দূরের কথা, ট্রলি টানার জন্য দালাল বা ওয়ার্ডবয়দের টাকা না দিলে রোগী নিয়ে টানাটানি করতে হয়, সেখানে এমন আয়োজন রোগী ও স্বজনদের কাছে রীতিমতো অস্বাভাবিক ঠেকেছে। কারণ একটাই-হাসপাতাল পরিদর্শনে আসছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
তবে এই একরাতের রূপান্তর আর পরিচ্ছন্নতার ‘নাটক’ সিলেটের সাধারণ মানুষের মনে আনন্দের বদলে জন্ম দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন-মন্ত্রী এলে যদি মাত্র ১২ ঘণ্টায় হাসপাতালের চিত্র বদলে যেতে পারে, তবে বছরজুড়ে হাজার হাজার সাধারণ রোগী কেন দুর্গন্ধ, নোংরা পরিবেশ আর অব্যবস্থাপনার নরকযন্ত্রণায় ভুগবে?
- আগের চিত্র: ময়লা, দুর্গন্ধ ও অবহেলার রাজত্ব
ওসমানী হাসপাতাল ৫০০ শয্যা থেকে ১০০০ শয্যায় উন্নীত হলেও প্রতিদিন এখানে চিকিৎসা নেন প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী। দীর্ঘদিন ধরেই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগীর অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে সর্বনিম্ন সেবার মান।
হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাথরুম সাধারণত এমন নোংরা অবস্থায় থাকে যে ভেতরে ঢুকলেই পেট গুলিয়ে ওঠার উপক্রম হয়-ময়লা ও তীব্র দুর্গন্ধে সুস্থ মানুষেরও অসুস্থ বোধ করার অবস্থা। রোগীর স্বজন কয়সর আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আজকে মন্ত্রী আসায় কিছুটা পরিষ্কার লাগছে। আর নাহলে নোংরা অবস্থায় সবসময় থাকে। কাল থেকে তারা পরিষ্কার করা শুরু করেছে।"
আরেক স্বজন ফারুক আহমদের ভাষ্য, "মন্ত্রী আসায় আজকে অনেক পরিবর্তন। খাবারের মান ভালো হয়েছে। সব পরিষ্কার।" এই দুটি বক্তব্যই স্পষ্ট করে দেয়, রোগীর স্বজনদের কাছে এই পরিচ্ছন্নতা কোনো নিয়মিত সেবা নয়, বরং শুধুই ‘মন্ত্রী তোষণ’ ও প্রদর্শনীর অংশ।
- একরাতের ‘রূপান্তর’ ও ক্যামেরার ভয়
মন্ত্রীর আগমনের খবর পৌঁছানোর পর থেকেই, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার রাত থেকে হাসপাতালজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক ধোয়ামোছা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কর্মযজ্ঞ। ঝাড়ু দেওয়া, মেঝে ধোয়া, বাথরুম পরিষ্কার করাসহ নানা কাজে রাতারাতি ব্যস্ত হয়ে পড়েন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা-যে কাজ স্বাভাবিক সময়ে নিয়মিত হয় না বলেই রোগীদের অভিযোগ।
শুক্রবার সকালেও এই তোড়জোড় অব্যাহত ছিল। শিশু ওয়ার্ডে এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে বাথরুম পরিষ্কার করতে দেখা যায়, যিনি সাংবাদিক ও ক্যামেরা দেখেই নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। যা ইঙ্গিত দেয়, এই কর্মকাণ্ড ছিল মূলত পরিদর্শনকেন্দ্রিক তাৎক্ষণিক লোকদেখানো প্রস্তুতি।
খাবারের মানেও এসেছিল সাময়িক পরিবর্তন-রোগীদের গরম ও তুলনামূলক উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হয়, যা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই। তবে সাজানো এই আয়োজনে সব ঘাটতি ঢাকা পড়েনি। বিভিন্ন ওয়ার্ডের বিছানায় ছারপোকার উপদ্রব থেকেই যায়, যা দেখে খোদ মন্ত্রীও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অর্থাৎ, ওপরের চকচকে ভাব যতটা দ্রুত তৈরি করা গেছে, দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ কাঠামোগত সমস্যা ও মূল অবহেলা ততটা সহজে ঢাকা সম্ভব হয়নি।
- রোগীদের পুরনো অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক উদ্বেগ
ওসমানী হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নতুন কিছু নয়। স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, স্বাভাবিক দিনগুলোতে ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি, ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার জন্য বাইরের প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠাতে বাধ্য করা এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বকশিস বা ঘুষ বাণিজ্য এখানকার নিত্যদিনের সঙ্গী।
শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি এক শিশুর অভিভাবক জানান, মন্ত্রীর সফরের দিন ডাক্তার ও নার্সরা বারবার এসে রোগীর খোঁজখবর নিচ্ছিলেন, যা সাধারণ দিনে কদাচিৎ ঘটে।
গত কয়েক মাসে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ ওসমানী হাসপাতালের সেবার মান বৃদ্ধি এবং পরিচ্ছন্নতার দাবি জানিয়ে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করলেও কতৃপক্ষ দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কিন্তু মন্ত্রী আসার খবর পেতেই এক রাতে হাসপাতাল ‘ঝকঝকে’ করার এই প্রবৃত্তি প্রমাণ করে, কর্তৃপক্ষের দায়িত্ববোধ রোগীর সেবায় নয়, বরং উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে খুশি রাখার ওপর নিবন্ধিত।
- মন্ত্রী কি অঘোষিত আসতে পারেন না?
একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিদিনকার পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টিকর খাদ্য ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হাসপাতাল প্রশাসনের মৌলিক দায়িত্ব। পরিদর্শনকেন্দ্রিক এই সাময়িক সাজসজ্জা বা ‘ভিআইপি কালচার’ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনছে।
সিলেটের সর্বস্তরের ভুক্তভোগী মানুষের একটাই দাবি-মন্ত্রীর সফরের দিন যে তৎপরতা, পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসকদের উপস্থিতি দেখা গেল, তা যেন একদিনের নাটকীয় প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ না থাকে। কোনো মন্ত্রী বা ভিআইপির আসার অপেক্ষায় না থেকে বছরজুড়ে ২৪ ঘণ্টাই ওসমানী হাসপাতালে যেন এই সেবার মান ও মানবিক পরিবেশ বজায় থাকে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের ছুটির দিনে সিলেট সফর টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সিলেটের প্রবাসীরা সামাজিক যোগাযোগে মন্ত্রীর সফরকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছেন। একজন লিখেছেন, মন্ত্রী কি না জানিয়ে সফরে আসতে পারতেন না! এই লোকদেখানো সফরের মানে কী?
আরেকজন লিখেছেন, মন্ত্রীকে প্রকৃত অবস্থা জানানো থেকে কারা পেছনে কাজ করেছেন-সিলেটের মন্ত্রী এমপিরাও কেন নিরব!
-
দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ইয়াসমিন
-
ঢাকায় গ্রেপ্তার বিয়ানীবাজার আওয়ামী লীগ নেতা পল্লব, নেওয়া হচ্ছে সিলেট আদালতে
-
৬ মাসের মধ্যে ২ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক নেবে মালয়েশিয়া
-
মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে নতুন তালিকা, এবার ৩৩৮ বাংলাদেশি এজেন্সি
-
মালয়েশিয়ায় বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী পাঠাবে সরকার
আরও পড়ুন: