ঢাকা ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬
ঢাকা ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬
সর্বশেষ
আমিরাতে ভিসা বাতিল আতঙ্ক: গুজব নয়, দূতাবাসের বার্তা মানুন নিউইয়র্কে সড়ক দুর্ঘটনা: তিন বাংলাদেশির ক্ষতিপূরণ ৩৩ কোটি টাকা প্যারিসে থেকেও বাংলা গানের সঙ্গে জয়া বর্মণ জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করতে ট্রাম্পের নতুন আদেশ : উদ্দেশ্য সন্তানদের স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ বন্ধ মালয়েশিয়ার জাতীয় দলে বাংলাদেশি তরুণ, খেলবেন জন্মভূমির বিরুদ্ধে মেসির জোড়া গোলে লিগস কাপে দুর্দান্ত সূচনা, ৪-২ ব্যবধানে জিতল ইন্টার মায়ামি যুক্তরাজ্যে তাপপ্রবাহে ২,৮৭৭ মৃত্যু, চাপ মোকাবিলায় এনএইচএসকে প্রস্তুতির নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আরব আমিরাতে শুক্রবার পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টির সম্ভাবনা সৌদিতে কোম্পানি থেকে বাসায় গৃহকর্মী আনার নতুন সহজ নিয়ম চালু শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে যা লিখল বিশ্বমিডিয়া সৌদি প্রবাসীদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ: জেনে নিন অভিযানের আসল কারণ ও আইনি নিয়মাবলি শেখ হাসিনা ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ও ঘৃণ্য ফ্যাসিস্ট ছিলেন: রিজভী যুক্তরাজ্যে টয়লেট ব্যবহারে নতুন নিয়ম, বদলাবে ১৮ হাজার সাইনবোর্ড লন্ডনের কভেন্ট গার্ডেনে ছুরি নিয়ে তাণ্ডব, আহত চার, নারী গ্রেপ্তার সিডনির সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত নুরহায়াতি, লাইফ সাপোর্টে বাংলাদেশি মাহবুবুল প্যারিসে জেমসের কনসার্ট : এক টুকরো বাংলাদেশ আমিরাতে ৯৮৫ বাংলাদেশির ভিসা বাতিল : তালিকা পাঠাল দূতাবাস প্রবাসজীবনের চাপ : মালদ্বীপে ১০ দিনে ৮ বাংলাদেশির মৃত্যু টাঙ্গুয়ার হাওরের একাংশে নৌযান নিষিদ্ধ, কত দূর যেতে পারবেন পর্যটকরা? সিডনির মঞ্চ মাতালেন রুনা লায়লা নিউ ইয়র্ক বাংলা ফিল্ম ফেস্ট: তারার মেলায় সেরা যারা লন্ডনে ব্রিক লেইন জামে মসজিদের ৫০ বছর: দুইদিনব্যাপী অনুষ্ঠান সেপ্টেম্বরে প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে বিদেশ যাত্রা, বুলডোজার দিয়ে বাড়ি গুঁড়িয়ে দিলেন দ্বিতীয় স্ত্রী ‘প্রতারণা’: নিউ জার্সিতে ২ বাংলাদেশি গ্রেপ্তার স্ত্রীকে মার*ধর, ইতালি থেকে বাংলাদেশি বহিস্কার আরব আমিরাতে কড়াকড়ি, কারা পড়ছেন নিষেধাজ্ঞার আওতায়? প্রবাসীদের টাকা নিয়ে উধাও ‘ইয়েপবিট’ ও ‘বনচ্যাট’ মার্কিন ভিসার জন্য বাংলাদেশিদের ২০ হাজার ডলার বন্ড আর লাগবে না ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে সেনাবাহিনীতে বিক্রি, ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দি ৩ বাংলাদেশি জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই, জিতলেন যারা

সংগ্রামপুঞ্জির মায়াবতী ঝর্ণায়

প্রকাশিত: ০৯ জুলাই ২০১৮, ১০:০৬ পিএম

সংগ্রামপুঞ্জির মায়াবতী ঝর্ণায়
জৈন্তাবাজার  ছাড়িয়ে যাওয়ার পর হাতের ডানপাশ হয়ে চলে গেছে ডিবির হাওর। হাওরের বিস্তীর্ণ প্রান্তরের ওপাশে মেঘালয় পাহাড় শ্রেণী। চোখ চলে যায় দূরের সেই গিরি শিখরে। পাহাড় জুড়ে ঘন সবুজ অরণ্য। তার গায়ে চুমো খেয়ে উড়ে যাচ্ছে মেঘদল। কোথাও আবার পাহাড়ের গায়ে ঠেস দিয়ে জমে আছে টুকরো টুকরো মেঘ। যেন সরে যাওয়ার নাম নেই! আরেক জায়গায় মেঘের বড়সড় একখন্ডের চারপাশে দল বেঁধেছে টুকরো মেঘের দল। যেন সাদা শাড়ির বুড়ো দাদুর চারপাশে গল্প শুনতে গোল হয়ে বসেছে নাতিপুতির দল! উঁচু-নিচু পথ। সে পথের কোথাও ডানে-বাঁয়ে মোড়। বাহনের ভেতরে অনেকের সাথে যাত্রী আমরা ও তিনজন। সকাল বেলা সিলেট থেকে রওয়ানা হয়েছি আমি আর মিজান। রুহুলের বাড়ি লালাখালের ভাটিতে সারি নদীর পারে। বাস সারীঘাটে থামলে তাকে তুলে নিলাম। পাথুরে পাহাড়ের গা ঘেষে পাহাড়ী পথ চলে গেছে জাফলংয়ের দিকে। একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম মেঘালয় পাহাড় শ্রেণীর দিকে। বর্ষাকাল আর বিশ্বের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের অঞ্চল; দুইয়ে মিলিয়ে প্রবল তেজে ফুঁসছে দুধের মত সাদা স্রোতের ঝর্ণাগুলো। অনেক দূর থেকেও শোনা যাচ্ছিল পানির আছড়ে পড়ার জোরালো শব্দ। বাস থামে তামাবিলে। সারি সারি ট্রাক কয়লার চালান নিয়ে দাড়িয়ে আছে। তামাবিল ছাড়ার পর বাস যেন আকাশের দিকে উঠতে লাগলো! নাক বরাবার খাড়া একটি আপহিল। বাকি পথের চড়াই-উৎরাই শেষে আমাদের বাস পৌছে গেল জাফলংয়ে। দুপুর হয়ে গেছে। উদরপূর্তির কাজটা সেরে ফেললে ভাল হয়। দেখে-শুনে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ি। জাফলংয়ের বুক চিরে বয়ে গেছে পিয়াইন নদী। মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা পিয়াইনের তীরে পাথর নিয়ে বেশ ব্যস্ততা। নদীর পার জুড়ে সারি সারি বারকি নাও। তাতে করে প্রবল স্রোতে ডুব দিয়ে দিয়ে পাথর উত্তোলন আর তা পরিবহনে ব্যস্ত পাথর শ্রমিকরা। পার ধরে এগিয়ে যাই নদীর উজানের দিকে। পাহাড়, অরণ্য আর পাথরের গা চুষে বের হওয়া পিয়াইনের জল স্ফটিকের মত স্বচ্ছ। নদীর বেশ গভীরেও তলদেশে নানা রংয়ের পাথরগুলো পরিষ্কার দেখা যায়। সেই দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম, হঠাৎ রুপালী ঝিলিক! চমকে ওঠে ভাল করে তাকাই। মাছের একটি ঝাঁক পাথরের গায়ে লেগে থাকা শ্যাওলা খেতে এসেছে। উল্টেপাল্টে পাথরের এপাশ-ওপাশ হওয়ার সময় তাদের শরীরে আলোর প্রতিফলন পড়ছে। মনে হচ্ছে যেন কয়েক টুকরো রুপো পাথরে লেপ্টে আছে! নদীর উজানে সামনে ডাউকি ব্রীজ হয়ে চলে যাচ্ছে সুমো জীপ আর ট্রাক। এ রকম বাহনই তামাবিলে দেখেছিলাম। এবার আমরা যাব সংগ্রামপুঞ্জির ঝর্ণায়। তার আগে নদী পার হতে হবে। দামাদামি করে আমরা একটা ইঞ্জিন লাগানো বারকি নাও ভাড়া করলাম। পিয়াইনের জলে আলোড়ন তুলে ছুটে চলল আমাদের জলমঁয়ূর। নদীর মাঝ বরাবর প্রবল স্রোতে। মাঝি এবার নদী ছেড়ে বাঁয়ে মোড় নিল। ডানপাশে পাথুরে মেঘালয় পাহাড়। মাঝি নাও ভেড়ালে নেমে পড়ি তার পাদদেশে। আকাশে মেঘ আর রোদের লুকোচুরি খেলা চলছে। পান্নার মত সবুজ জলের দুনিয়া। তার কিনারা ছুঁয়ে হাঁটছি পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে। দূর থেকে ঝর্ণার জোরালো শব্দ কানে আসে। আর সেই সম্মোহনী শব্দে শরীরের মধ্যে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়! দৌড়ে এক ছুটে গিয়ে থামলাম ঝর্ণার নিচে। চোখে-মুখে ভর করেছে আনন্দ আর পুলকের ঘোর। দুর্দান্ত প্রতাপে পাহাড়ের চূঁড়া থেকে নেমে আসছে ঝর্ণার প্রবল প্রবাহ। ঝর্ণার গায়ে বড় বড় প্রাচীন গাছ, বিশালাকার পাথর আর আছড়ে পড়া প্রবল জল স্রোতের রাতের অপূর্ব মেলবন্ধন। বেশ কয়েকটি ধারায় নেমে আসছে ঝর্ণার স্রোত। পাথরের ধাপগুলো বেয়ে একবারে নীচে এসে সৃষ্টি হয়েছে একটি প্রাকৃতিক ক্যাসকেড। কয়েক জন তরুণকে দেখলাম পাথরের গা বেয়ে ওপরে উঠতে। পাথরগুলো পিচ্ছিল। তাই উঠবো কি না প্রথমে ইতস্তত করলেও শেষতক ইচ্ছের প্রবলতার কাছে তা আর ধোপে ঠিকল না! ঝর্ণার পাশ দিয়ে পাথর বেয়ে উঠতে থাকি। বেশ সাবধানে। থামি দুই ধাপ উঠার পর। পাথরের গায়ে পিঠ আর মাথা ঠেকিয়ে হেলান দেই। ঝর্ণার হিম ঠান্ডা পানিতে চোখ মুখ পুলকিত হয়ে ওঠে। মাথার ওপর পাথরের গায়ে জন্মেছে পাহাড়ী কাঁশের ঝোঁপ। ঝর্ণার নীচে হাজার বছর ধরে দাড়িয়ে থাকা উষর পাথর। তার গায়ে এক বিন্দু ও মাটি নেই। অথচ সেখানেই ঝোপটি গেঁথেছে শেঁকড়। টিকে আছে দিব্যি। আধঘন্টার মত ঝর্ণায় ভিজে তারপর সাবধানে নীচে নেমে আসি। ঝর্ণার নীচের ডোবায় নামতেই তলিয়ে যাই বুক অবধি। ছোটখাটো ডোবাটির তিন দিকেই বড় বড় পাথরের দেয়াল। ডুব আর জলকেলি চলে কয়েক মুহূর্ত। এবার তাহলে ফেরা দরকার। শেষবার চোখ জুড়িয়ে দেখি বিশালাকার ঝর্ণার মায়াবী রুপ। নদী আর বালুচর পেরিয়ে ওপাশে সংগ্রামপুঞ্জি। পুঞ্জির নামেই ঝর্ণা। অনেকে আবার আদর করে ডাকে ‘মায়াবতী ঝর্ণা’ নামে। খাসিয়াদের বসবাস পুঞ্জিতে। বালুর ঢিবি ডান পাশে রেখে হাঁটতে থাকি। থামি গিয়ে পুঞ্জির একদম শেষ মাথায়। এরপর আর সামনে যাওয়ার সুযোগ নেই। ঘন ঝোঁপঝাড় আর নেমে যাওয়া খাদ পথ আটকে দিয়েছে। এখান থেকে পুঞ্জির ভেতরে চলে গেছে চিকন একটি রাস্তা। কয়েক পা ফেলতেই সামনে থকথকে কাদা দেখে থামতে হয়। কী করব, ভাবতে থাকি। দুইটি পথের একটি বেছে নিতে হবে। হাঁটু অবধি কাদা মাড়িয়ে যাওয়া। অথবা, পান বাগানের ভেতর দিয়ে যেতে হবে কাটাতাঁর আর কাটাঝোঁপ মাড়িয়ে। দ্বিতীয় পথটি বেছে নেই। কাটাতাঁরের ফাঁক গলে পান বাগান ধরে এগোই। পা টিপে টিপে সাবধানে। ঝোপজঙ্গলে সাপ বিচ্ছু থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাছাড়া খাসিয়াদের কেউ দেখে ফেললে কী মনে করে কে জানে! কয়েক মিনিট হাঁটার পর দেখি রাস্তার কাদা আর নেই। আবার কাটাতাঁর মাড়িয়ে রাস্তায় নেমে আসি। মাত্র তিন-চার ফুট প্রস্থের চিকন রাস্তা। দুই পাশে পান বাগান। পানের ভারে ন্যূজ গাছেরা হেলে এসেছে রাস্তার ওপর। অর্কিড লতার মত ঝুলে আছে ঝুপি ঝুপি পান পাতারা। পান বাগানের মাঝে মাঝে কাঠ দিয়ে বানানো ছোট ছোট কুটির। মাঁচার ওপর খাসিয়াদের কুটির গুলো বেশ মনোমুগ্ধকর। কুটিরের উঠোন জুড়ে পরিচ্ছন্নতার ছাপ। তবে কোথাও কারো দেখা নেই। ব্যাপার কী! উঁকিঝুকি মেরে দেখি। অবশেষে প্রবীণ একজন মহিলাকে পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। তাকে বললাম, পানের ছবি তুলতে চাইছি। তিনি সারল্য ভরা মুচকি হাসি দিয়ে মাথা নাড়েন। তার সাথে ঢুকে পড়ি একটি বাড়িতে। বাড়িটি যেন পান আর সুপারি গাছের এক দুনিয়া! পুঞ্জির ভেতর থেকে ফেরার পথে চোখে পড়ে খাসিয়াদের দৈনন্দিন জীবনের গোছানো ছাপ। পুঞ্জির পথের শেষে ছোটখাটো এক হাঠ বসেছে। কয়েকটি মাত্র দোকান। খাসিয়া মহিলারা তাদের চাষ করা তরিতরকারি আর ফলমূলের পসরা সাজিয়ে বসেছে। পুঞ্জির বৃষ্টি ভেজা পরিচ্ছন্ন পথ ধরে হাঁটি আর দেখি খাসিয়াদের নীরব কর্মচাঞ্চল্য। তারপর ফিরে আসি পিয়াইনের তীরে। ফেরার জন্য এবার বারকি নায়ের অপেক্ষা। কিভাবে যাবেনঃ সিলেটের কদমতলী থেকে জাফলংয়ের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া পড়বে সত্তর টাকা। ঝর্ণায় যেতে রিজার্ভে ইঞ্জিন নৌকা পাবেন। ভাড়া নির্ভর করবে কতক্ষণ থাকবেন, তার ওপর। দেখেশুনে দামদর করে ভাড়া ঠিক করে নিবেন। রাতে থাকার জন্য জাফলংয়ে কিছু হোটেল আছে। তবে দিনে দিনেই সিলেট ফিরতে পারবেন। ছবিঃ লেখক লেখক : ভ্রমণ ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক এবং ব্যাংক কর্মকর্তা।