উত্তর আমেরিকায় চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম হাইভোল্টেজ ও রোমাঞ্চকর সেমিফাইনাল লাইনআপ তৈরি হয়েছে। সব পূর্বাভাস ও হিসাব-নিকাশ ভেঙে দিয়ে ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষ চার পরাশক্তি—ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা—জায়গা করে নিয়েছে শেষ চারে। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি এক বিশাল ‘ব্লকবাস্টার’ সেমিফাইনাল আয়োজন।
এবারের সেমিফাইনাল যেন দুই প্রজন্মের তারকাদের মুখোমুখি সংঘর্ষ। একদিকে মেসি ও কেইনের মতো অভিজ্ঞ নেতারা, যারা ক্যারিয়ারের শেষভাগে নিজেদের উত্তরাধিকার আরও উজ্জ্বল করতে চান। অন্যদিকে এমবাপ্পে ও ইয়ামালের মতো তরুণ প্রতিভারা, যারা আগামী এক দশক বিশ্ব ফুটবল শাসনের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।
চারজনের লক্ষ্য এক—বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা। মেসি চান শেষ বিশ্বকাপে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় যোগ করতে। কেইন ইংল্যান্ডকে বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ জেতাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমবাপ্পে আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট ফিরিয়ে আনতে চান। আর ইয়ামাল স্বল্প বয়সেই বিশ্বমঞ্চে নিজের নাম স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চান।
বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি জয়ের এই লড়াইয়ে চার দলের চার সুপারস্টারই নজরে। গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল ও ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জয়ের দৌড়ে তাদের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করা হলো—
লিওনেল মেসি : ‘শেষ নৃত্যের’ জাদুকরী ছন্দ
২০০৬ সাল থেকে শুরু করে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন তিনি; ইতিহাসে আর দুজন—ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও ওচোয়া—এই কীর্তির অধিকারী। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ম্যাচ ও গোলের মালিক এই তারকা ২০১০ বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেন। তবে ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। ২৭ বছর বয়সী মেসি তখন ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে ছিলেন এবং টুর্নামেন্টে ৪ গোল করেন। শেষ ষোলোর ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ডি মারিয়ার জয়সূচক গোলে তার অসাধারণ অ্যাসিস্ট ছিল। মারাকানায় ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ ব্যবধানে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় তার।
২০২২ বিশ্বকাপ ছিল মেসির ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। সাত ম্যাচে ৭ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট করে তিনি দলকে শিরোপা জেতান। ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিটি পর্বে গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েন। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ম্যাচ টাইব্রেকারে নিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়। তিনি দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন বল জেতেন।
৩৯ বছর বয়সেও ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন মেসি প্রমাণ করছেন বয়স কেবল একটি সংখ্যা। চলতি আসরে গ্রুপপর্ব থেকে শুরু করে নকআউটের প্রতিটি ধাপেই গোল করেছেন। মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপে সর্বাধিক ২১ গোলের নতুন রেকর্ড গড়েছেন। পাশাপাশি ১০ অ্যাসিস্টও করেছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আলেক্সিস মাক আলিস্তেরের গোলের পেছনেও ছিল তার জাদুকরী অ্যাসিস্ট।
কিলিয়ান এমবাপ্পে : অপ্রতিরোধ্য গোলমেশিন
২০১৮ বিশ্বকাপে উদীয়মান তারকা হিসেবে আবির্ভূত হলেও ২০২২ সালে নিজেকে ‘বিগ-ম্যাচ প্লেয়ার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এমবাপ্পে। ১৯ বছর বয়সে ৪ গোল করে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নকআউটে জোড়া গোল ও ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল করেন। কিংবদন্তি পেলের পর দ্বিতীয় কিশোর হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোলের কীর্তি গড়েন।
২০২২ সালের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তার অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিক বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করে। যদিও ফ্রান্স রানার্সআপ হয়, তবুও তিনি গোল্ডেন বুট জেতেন।
২০২৬ বিশ্বকাপে ফরাসি অধিনায়ক আরও পরিণত। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে দলকে সেমিফাইনালে তোলেন। এখন পর্যন্ত ৮ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে আছেন। অ্যাসিস্টসহ মোট গোল অবদান ১১, যা এই আসরে সর্বোচ্চ।
হ্যারি কেইন : ইংল্যান্ডের সিংহ পুরুষ
তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলছেন কেইন। ২০১৮ সালে ৬ গোল করে ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে তুলে গোল্ডেন বুট জেতেন। ২০২২ সালে গোল করার পাশাপাশি প্লে-মেকিংয়েও মনোযোগী ছিলেন, যেখানে ২ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট করেন।
এবারের বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বে ইংল্যান্ড আবারও সেমিফাইনালে। রাউন্ড ৩২-এ কঙ্গোর বিপক্ষে জোড়া গোল এবং কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে দলের নাটকীয় জয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এখন পর্যন্ত ৬ গোল এবং মোট গোল কন্ট্রিবিউশন ৭।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালটি তার জন্য শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, বরং মেসির সঙ্গে গোল্ডেন বুটের ব্যবধান কমানোর সুযোগও।
লামিন ইয়ামাল : উইংয়ের গতিময় জাদু
কিশোর বয়সেই বিশ্ব ফুটবলে আলোড়ন তুলেছেন লামিন ইয়ামাল। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেওয়ার পর বিশ্বকাপেও স্পেনের অন্যতম ভরসার নাম হয়ে উঠেছেন। ডান প্রান্তে তার গতি, সৃজনশীলতা ও সাহসী ফুটবল স্পেনের আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অনেকেই তাকে ভবিষ্যতের ব্যালন ডি’অর জয়ী হিসেবে দেখছেন। সেমিফাইনালের আগে ইয়ামাল বলেছেন, ছোটবেলা থেকেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্ন দেখেছেন এবং এখন সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তবে এখানেই থামতে চান না, ফাইনালে উঠে দেশের জন্য শিরোপা জিততে চান।
২০২৪ ইউরো জয়ের নায়ক ইয়ামাল তার দুর্দান্ত ফর্ম ধরে রেখেছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয়ে তার গতি ও নিখুঁত ক্রসিং বড় ভূমিকা রাখে। গোল করার চেয়ে সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোতেই বেশি মনোযোগী এই তরুণ তারকা। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে তার ওপরই থাকবে স্পেনের আক্রমণের বড় দায়িত্ব।
-
১০ জনের সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা, এক লাল কার্ডে বদলে গেল ম্যাচের ভাগ্য—কী ঘটেছিল
-
বদলি নেমে ফের নায়ক মেরিনো, সেমিতে ফ্রান্সের মুখোমুখি স্পেন
-
আর্জেন্টিনার জয় নিয়ে মামদানি: ‘ডাকাতি’ করে মিসরকে হারানোর অভিযোগ
-
রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত দাবি মিশরের, আর্জেন্টিনা ম্যাচ ঘিরে নতুন বিতর্ক
-
বিশ্বকাপে এ কেমন রোনালদো?
আরও পড়ুন: