বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও মিয়ানমার-প্রত্যেকেরই বাংলাদেশকে ঘিরে নিজস্ব ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত স্বার্থ রয়েছে। শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনের পর ভারত ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, আর অন্যান্য দেশগুলো তুলনামূলক সতর্ক অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন-বিশেষত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও তারেক রহমানের সরকার গঠনের পর থেকে-প্রতিটি দেশই নিজেদের অবস্থান নতুন করে সাজিয়ে নিচ্ছে।
ভারত: প্রতিবেশী হিসেবে সবচেয়ে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা
শেখ হাসিনার নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত কৌশলগতভাবে নিজেদের সরাসরি দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা, সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সম্ভাব্য প্রভাব, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক প্রভাব বলয় ধরে রাখা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে সেই সম্পর্ক কীভাবে পুনর্গঠিত হয় তা নিয়েও দিল্লির মনোযোগ রয়েছে।
চীন: অর্থনৈতিক উপস্থিতি ও কৌশলগত ভারসাম্য
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নতুন গতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। চীন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়ে নতুন সরকারের প্রতি সমর্থনও ব্যক্ত করেছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ব্যাপক বিস্তৃত, এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানেও চীন সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বও স্পষ্ট করেছে যে, তারা চীনের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী, একই সঙ্গে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়-এই ভারসাম্যনীতি চীনের জন্য বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব মোকাবিলার প্রশ্নে।
যুক্তরাষ্ট্র: গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও বাণিজ্যিক স্বার্থ
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন স্পষ্ট করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের নির্বাচনে কোনো পক্ষ নেবে না এবং জনগণের নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। নির্বাচনের পর জুলাইয়ের শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন অত্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তবে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক কিছু সংগঠন ও সাবেক কূটনীতিক গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত অগ্রাধিকার তুলে ধরে-একদিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও মানবাধিকারের প্রশ্ন, অন্যদিকে পোশাকশিল্পকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক স্বার্থ ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান।
রাশিয়া: পুরনো মিত্রতা ধরে রাখার চেষ্টা
জুন মাসে মস্কোয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের বৈঠকে রাশিয়া বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিনের অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প রাশিয়ার জন্য বাংলাদেশে তাদের কৌশলগত উপস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রতীক, এবং জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখাই মস্কোর মূল আগ্রহের জায়গা। রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের পরও রাশিয়া সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে সচেষ্ট, তবে পশ্চিমা প্রভাব বাড়লে তাদের এই অবস্থান কতটা টিকে থাকে তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে।
মিয়ানমার: সীমান্ত অস্থিরতা ও রোহিঙ্গা সংকট
মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট ও সীমান্ত নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে, এবং সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তের ওপারে বিমান হামলার পর অনুপ্রবেশের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর (ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ) বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রত্যাবাসনকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে রেখেও বাংলাদেশের নতুন সরকারের আরও বাস্তবসম্মত অন্তর্বর্তীকালীন কৌশল প্রয়োজন। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার কার্যত রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক আলোচনার অংশীদার নির্ধারণ করাই একটি জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
পাকিস্তান: দূরত্ব ঘোচানোর সম্ভাবনা কী আছে?
তারেক রহমানের সরকার গঠনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন। পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক ডন-এর সাবেক সম্পাদক আব্বাস নাসিরের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে দুই দেশের সম্পর্কের সম্ভাব্য নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তুলনামূলক শীতল ছিল; বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে এই সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হলে তা ভারতের জন্য একটি নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মত।
সবমিলিয়ে চিত্র
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ছয়টি দেশের আগ্রহের ধরন ভিন্ন হলেও একটি বিষয়ে মিল রয়েছে-প্রত্যেকেই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থের নিরিখে পুনর্মূল্যায়ন করছে। ভারত সরাসরি প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে থাকলেও চীন ও রাশিয়া অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত, যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও বাণিজ্যের ভারসাম্য খুঁজছে, পাকিস্তান নতুন সম্ভাবনা দেখছে, আর মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এই ছয় শক্তির স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করেই এগোতে হবে।
সূত্র: প্রথম আলো, ইত্তেফাক, যুগান্তর, আইটিভি বিডি, দেশ রূপান্তর, বাসস, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ঢাকা পোস্ট, ডেইলি স্টার, প্রথম আলো (মতামত বিভাগ), ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ, চ্যানেল ২৪, বিডি জার্নাল