বিশ্বের মানবিক ও সেবাবান্ধব যুক্তরাজ্যের চেনা শহরগুলো যেন দিন দিন অচেনা হয়ে উঠছে। মাস শেষে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জিত বেতনের টাকা কখন যে চোখের পলকে হাওয়া হয়ে যায়, তা হিসাব মেলাতেই হিমশিম খাচ্ছেন হাজারো মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ। প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের সুখ বিসর্জন দেওয়া এই মানুষগুলোর জীবন এখন আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়ের (Cost of Living) যাঁতাকলে পিষ্ট। এই কঠিন সময়ে আয়ের চাকা সচল রাখা যতটা কঠিন, তার চেয়েও বড় শিল্প হলো ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরা। যুক্তরাজ্যের শীর্ষ আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, এই দুঃসময়ে কীভাবে প্রতিটি পাউন্ড বাঁচিয়ে পরিবারকে সুরক্ষিত রাখবেন, তার কিছু কার্যকর উপায় নিয়ে এই বিশেষ আয়োজন।
মার্টিন লুইসের 'সোশ্যাল ট্যারিফ' ও বিল কমানোর উপায়
যুক্তরাজ্যের অর্থ সাশ্রয় সংক্রান্ত শীর্ষ গবেষণা পোর্টাল 'মানিসেইভিংএক্সপার্ট' (MoneySavingExpert)-এর প্রতিষ্ঠাতা মার্টিন লুইসের মতে, কঠিন সময়ে টিকে থাকার প্রথম সূত্র হলো স্থায়ী খরচ বা ফিক্সড ডিলগুলো পুনর্বিবেচনা করা।
সোশ্যাল ট্যারিফ: আপনি যদি ইউনিভার্সাল ক্রেডিট (Universal Credit) বা অন্য কোনো সরকারি ভাতা পান, তবে ব্রডব্যান্ড এবং মোবাইল কোম্পানিগুলোকে সরাসরি জানাতে পারেন। Onetel, EE, Sky-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সাধারণ প্যাকেজের দাম যেখানে মাসে ৩০ থেকে ৪০ পাউন্ড, সেখানে সোশ্যাল ট্যারিফের আওতায় মাত্র ১২ থেকে ১৫ পাউন্ডে একই ইন্টারনেট পাওয়া সম্ভব।
মোবাইল বিলের ফাঁদ: নামী ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তিতে দামি ফোন নেওয়ার অভ্যাস সাময়িকভাবে বন্ধ করুন। বিদ্যমান ফোনটি ভালো থাকলে Lyca, Lebara, Giffgaff-এর মতো সাশ্রয়ী 'সিম অনলি' (SIM-Only) ডিলে চলে যাওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত হতে পারে, যা প্রতি মাসে অন্তত ২০ থেকে ৩০ পাউন্ড বাঁচাবে।
সুপারমার্কেট ডাউনগ্রেড ও খাবারের সাশ্রয়
যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ডেটা অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান 'কানতার' (Kantar)-এর এক বাজার সমীক্ষায় দেখা গেছে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের একজন মানুষ শুধু সুপারমার্কেট পরিবর্তন করে মাসিক গ্রোসারি বা বাজারের খরচের অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাঁচাতে পারেন।
দামি ব্র্যান্ড বর্জন করুন: মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার (M&S), সেইন্সবারি কিংবা টেসকোর প্রিমিয়াম পণ্য বাদ দিয়ে Aldi এবং Lidl-এর মতো ডিসকাউন্ট সুপারমার্কেটে বাজার করার অভ্যাস করুন। এক্ষেত্রে সংকোচ মাথা থেকে সরিয়ে নিন -সস্তা হলেও এসব দোকানের পণ্যের গুণগত মান কোনো অংশে কম নয়।
"টু গুড টু গো" (Too Good To Go) অ্যাপ: মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি একটি কার্যকর সমাধান। এই অ্যাপের মাধ্যমে আপনার এলাকার বিভিন্ন নামী রেস্তোরাঁ, Greggs বা সুপারমার্কেটের অবিক্রিত কিন্তু সম্পূর্ণ ভালো ও তাজা খাবার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মূল্যে (Magic Bag হিসেবে) কিনে নেওয়া যায়।
রান্নাঘরের পরিকল্পনা ও 'ক্যাশ অনলি' পলিসি
ব্রিটেনের দাতব্য সংস্থা 'সিটিজেন্স অ্যাডভাইস' (Citizens Advice) তাদের এক গবেষণায় জানিয়েছে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের খরচের একটি বড় অংশ নষ্ট হয় অপরিকল্পিতভাবে রেস্তোরাঁর খাবার অর্ডার করা এবং সুপারমার্কেটে কার্ড দিয়ে যথেচ্ছ কেনাকাটার কারণে।
মিল প্রিপারেশন (Meal Prep): কাজের ব্যস্ততায় প্রতিদিন বাইরে খাওয়া বা অর্ডার করার চেয়ে সপ্তাহে এক বা দুদিন সময় নিয়ে একসঙ্গে পুরো সপ্তাহের খাবার রান্না করে ফ্রিজে বক্সে রেখে দিন। এতে সময় ও টাকা দুটোই বাঁচবে।
কার্ডের বদলে ক্যাশ: যখনই বাজারে যাবেন, হিসাব করে যতটুকু দরকার ততটুকু নগদ (Cash) টাকা ব্যাংক থেকে তুলে পকেটে নিয়ে যান এবং ব্যাংক কার্ডটি ঘরে রেখে যান। কার্ড দিয়ে স্পর্শহীন (Contactless) পেমেন্ট করার সময় মানুষ মনের অজান্তেই বেশি খরচ করে ফেলে, যা নগদ টাকা খরচের সময় মনস্তাত্ত্বিকভাবে বাধা পায়।
কাউন্সিল ট্যাক্স রিডাকশন এবং 'হিডেন বেনিফিট'
যুক্তরাজ্যের সামাজিক কল্যাণ সংস্থা 'টার্নটুআস' (Turn2us)-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সঠিক তথ্যের অভাবে ব্রিটেনে প্রতি বছর কোটি কোটি পাউন্ডের সরকারি সাহায্য মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ দাবি করেন না।
কাউন্সিল ট্যাক্স ছাড়: আপনার ঘরে যদি আপনি একা উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হন, তবে কাউন্সিল ট্যাক্সে সরাসরি ২৫ শতাংশ সিঙ্গেল পারসন ডিসকাউন্ট (Single Person Discount) পাবেন। আবার আয় যদি অনেক কম হয় বা চাকরি চলে যায়, তবে স্থানীয় কাউন্সিলে 'Council Tax Reduction'-এর আবেদন করলে এই ট্যাক্স সম্পূর্ণ মাফও হতে পারে।
বেনিফিট ক্যালকুলেটর: দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে 'Entitledto' বা 'Turn2us' ওয়েবসাইটে গিয়ে মাত্র ৫ মিনিট সময় খরচ করে আপনার বর্তমান আয়ের তথ্য দিন। হয়তো আপনি এমন কোনো সরকারি ভাতার যোগ্য, যা কঠিন সময়ে প্রতি মাসে বড় একটি আর্থিক ব্যাকআপ দিতে পারে।
মধ্যবিত্ত কৃপণ নয় তবে…
বিশ্লেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, আগামী দিনগুলো আরও কঠিন হবে। সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কমার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। বিশ্বজুড়ে কর্পোরেট আধিপত্যের বিস্তার নিয়ে মানবাধিকার বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন — পৃথিবীতে এমন দিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়, যেখানে 'মধ্যবিত্ত শ্রেণি' বলে আর কোনো সামাজিক স্তর থাকবে না। এবং ধনী ও সাধারণ -এই দুই শ্রেণিতেই বিভক্ত হয়ে যাবে সমাজ।
এই বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে পাউন্ড বাঁচানোর এই নীরব লড়াইকে কৃপণতা ভাবার দিন শেষ। বরং এটি কঠিন সময়ে পরিবার ও নিজের ভবিষ্যৎকে টিকিয়ে রাখার বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল।
একটু ত্যাগ স্বীকার করে আজ যে পাউন্ডটি আপনি অপ্রয়োজনীয় কফি, ওটিটি সাবস্ক্রিপশন বা বিলাসী আড্ডা থেকে বাঁচাবেন, তা-ই আগামী দিনে আপনার বাবা-মা কিংবা সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে কাজে লাগবে। সুদিন আসবেই — যদি এই দুঃসময়ে হিসেবি হওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়।
সূত্র: মানিসেইভিংএক্সপার্ট, সিটিজেন্স অ্যাডভাইস ব্যুরো, কানতার ওয়ার্ল্ডপ্যানেল এবং টার্নটুআস রিসার্চ রিপোর্ট।
আনোয়ারুল ইসলাম অভি, কবি, সাংবাদিক, লন্ডন