রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় সিঙ্গাপুরে বসবাসরত ১৫ বাংলাদেশি প্রবাসীকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম তাদের হাতে পুরস্কার ও স্মারক ক্রেস্ট তুলে দেন।
সোমবার সিঙ্গাপুরে ‘বাংলাদেশ রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা দৈনিক বণিক বার্তা ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক ঠাকরাল গ্রুপ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা এবং সিঙ্গাপুরে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শামা ওবায়েদ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নে প্রবাসীদের অবদানের জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মান জানান।
তিনি বলেন, “কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশিদের অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সরকার কাজ করছে। বর্তমানে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের কারণে অনেক সম্ভাব্য অভিবাসীকে ১০ লাখ থেকে ১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা জমিজমা বিক্রি করেও এ অর্থ জোগাড় করেন।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অভিবাসন ব্যয় সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে।”
শামা ওবায়েদ বলেন, “প্রবাসী বাংলাদেশিরা বাংলাদেশের গর্ব ও শক্তি। তাদের কঠোর পরিশ্রম যেমন পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নত করছে, তেমনি আমাদের অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করছে।”
বর্তমানে সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশি কাজ করছেন। প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে প্রায় ৪৭৫ দশমিক ০৩ মিলিয়ন ডলার।
তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এবং ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে সরকার নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কাজ করছে।”
শামা ওবায়েদ বলেন, “অভিবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত সমাধান এবং তাদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মতো একটি পৃথক মাইগ্রেশন উইং প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ উইং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে কাজ করছে।”
তিনি বলেন, “জনশক্তি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়ছে। দক্ষতা উন্নয়ন, পুনরায় কর্মসংস্থান, আন্তঃকোম্পানি বদলি এবং ন্যায্য কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।”
সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রতি পাঁচটি অনুরোধ জানান পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী।
তিনি প্রবাসীদের হুন্ডি এড়িয়ে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরের আইন, বিধিবিধান ও কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখাতে বলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে দায়িত্বশীল হওয়ার পাশাপাশি উগ্রবাদী বা বিদ্বেষমূলক প্রচার থেকে বিরত থাকারও আহ্বান জানান তিনি।
এ ছাড়া বিভিন্ন ভাষা ও ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান দেখিয়ে পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান শামা ওবায়েদ।
নতুন প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা ও ভাষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিয়মিত নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শও দেন তিনি।
সিঙ্গাপুরে সম্প্রতি বেতন না পাওয়া এবং চাকরি হারানোর সমস্যায় পড়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের সহযোগিতা করায় দেশটির কূটনীতিক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যেই অবদান সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান শামা ওবায়েদ।
তিনি বলেন, “সরকার স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করছে এবং এক জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় সব সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
বিদেশে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা বাংলাদেশিদের দেশে বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “তাদের বিনিয়োগ দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুরে কর্মরত ১৫ জন অসাধারণ বাংলাদেশি প্রবাসী ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’কে সম্মাননা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া সিঙ্গাপুরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বাংলাদেশভিত্তিক ব্যাংকের চারটি প্রতিষ্ঠান, দুইজন সিআইপি এবং তিনটি শীর্ষস্থানীয় এক্সচেঞ্জ হাউসকেও বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
শামা ওবায়েদ সম্মাননাপ্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার ও স্মারক ক্রেস্ট তুলে দেন।