ঢাকা ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
ঢাকা ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬

মালয়েশিয়ার মর্গে পড়ে বাংলাদেশির মরদেহ, স্বজনের খোঁজ মিলছে না

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৫ এএম

মালয়েশিয়ার মর্গে পড়ে বাংলাদেশির মরদেহ, স্বজনের খোঁজ মিলছে না
মালয়েশিয়ায় মারা যাওয়া দীন মোহাম্মদ

স্বজনের খোঁজ নেই, মালয়েশিয়ার মর্গে পড়ে আছে বাংলাদেশির মৃতদেহ

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের একটি হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে দীন মোহাম্মদের মরদেহ। তার সঙ্গে থাকা পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশি নাগরিক। বিষয়টি জানিয়েছে বিবিসি বাংলা

তবে বাংলাদেশে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েও তার কোনো স্বজন বা পরিবারের সদস্যের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফলে মৃত্যুর ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালের হিমঘর থেকে তার মরদেহ নেওয়া সম্ভব হয়নি। কুয়ালালামপুরে যে বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করতেন, সেখানকার কর্তৃপক্ষ মরদেহ গ্রহণের জন্য কোনো স্বজন খুঁজে বের করতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ঠিকানা মিলছে না, পরিচয় নিয়ে জটিলতা

পাসপোর্টে দীন মোহাম্মদের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে কুমিল্লার একটি এলাকার নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে সেই এলাকার চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, বহু খোঁজাখুঁজির পরও এই নামে কাউকে শনাক্ত করা যায়নি।

কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা মৃত্যুর খবর পেয়েছেন এবং তার স্বজনদের খুঁজে বের করতে উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নুর বলেছেন, স্বজনদের সন্ধান পাওয়া গেলে মরদেহ দেশে আনতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

পাসপোর্ট অনুযায়ী, দীন মোহাম্মদের বাবার নাম আব্দুল হক এবং মায়ের নাম সুক্কুরের নেসা। স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া আছে—রাজা বাড়ি, কুমিল্লা সদর, ব্রাহ্মণপাড়া, কুমিল্লা। জন্মতারিখ ২ মার্চ ১৯৭৫।

এলাকার চেয়ারম্যান ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘প্রশাসনের কাছ থেকে খবর পেয়ে ব্যাপক খোঁজ করেছি। আমি আমার এলাকার কমবেশি সবাইকে চিনি। আমার গ্রামের একটা পাড়ার নাম রাজাবাড়ি। কিন্তু দীন মোহাম্মদ, পিতা- আব্দুল হক এই নামে কাউকে পাইনি।

এমনকি আব্দুল হক নামে কোনো পিতার সন্তান দীন মোহাম্মদ এমন কাউকেও পাইনি।’

মৃত্যুর ঘটনা ও অনুসন্ধানের চেষ্টা

পাসপোর্টে জরুরি যোগাযোগ নম্বরের স্থানে শুধু ‘০০৮৮’ লেখা রয়েছে। সর্বশেষ পাসপোর্ট নবায়ন করা হয়েছে কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩।

প্রবাসীদের কয়েকজন জানান, ২০১১ সালে মালয়েশিয়ায় অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধ হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তখন অনেকেই নতুন পাসপোর্ট নিয়েছিলেন। দীন মোহাম্মদও সেই সময় পাসপোর্ট নিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হলেও এটি নিশ্চিত নয়।

তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় ছিলেন এবং নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বাংলাদেশি সুপারভাইজার মো. মোস্তফা আহমদ জানান, মৃত্যুর ১৯ দিন আগে তিনি তাদের প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন।

মোস্তফা বলেন, ‘তিনি নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। যে প্রজেক্টে তিনি কাজ করছিলেন তার সুপারভাইজার আমার বন্ধু। ২৫ জুলাই রাতে তিনি তার থাকার জায়গায় এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। পরে রাতে কোনো এক সময় গোসলখানায় গিয়েছিলেন। সেখানেই ভোরে তাকে পড়ে থাকতে দেখেন অন্যরা। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায় স্ট্রোকে মারা গিয়েছেন তিনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাসপোর্ট-ভিসা থাকায় ভাবলাম সহজেই মরদেহ দেশে পাঠানো যাবে। কিন্তু তার সহকর্মীদের মধ্যে তেমন কাউকে পেলাম না যিনি দীন মোহাম্মদকে ভালোভাবে চেনেন। পাসপোর্ট থেকে ফোন নম্বর নিতে গিয়ে দেখা গেল ফোন নাম্বার নেই। একজনের কাছ থেকে খবর পেলাম ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে কোনাপাড়া স্কুলের কাছে তাদের আত্মীয়-স্বজন আছে। সেখানে লোক পাঠিয়েও কারও হদিস পেলাম না।’

প্রশাসনের দৌড়ঝাঁপ, তবুও অজানা স্বজন

পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ মিশন, কুমিল্লার উপজেলা প্রশাসন এবং ঢাকার প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো স্বজনের খোঁজ মেলেনি।

মোস্তফা আহমদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কেউ দীন মোহাম্মদের পরিবার বা স্বজনের কোনো খোঁজ দিতে পারেনি। ওদিকে হাসপাতাল ও পুলিশ তাগাদা দিচ্ছে দ্রুত মরদেহ নেওয়ার জন্য।’

এদিকে পাসপোর্টে দেওয়া ব্যক্তিগত নম্বরটি কুমিল্লার অন্য এক ব্যক্তির নামে পাওয়া গেছে, যিনি জীবিত রয়েছেন।

মোস্তফা আহমদ জানান, ‘আমরা সেটি করতেও পারি না। কারণ দুই দিন পর তার পরিবারের কেউ এলে কী জবাব দেব। কিন্তু মরদেহ মর্গে রাখায় প্রতিদিন আমাকে ৭৫ রিঙ্গিত ফি দিতে হচ্ছে, আবার পুলিশও ডিস্টার্ব করছে।’

শেষ পরিণতি কি বেওয়ারিশ দাফন?

মালয়েশিয়ার নিয়ম অনুযায়ী, দীন মোহাম্মদকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করাও সহজ নয়। এদিকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা তার পরিচয় নিশ্চিত করতে কাজ করছেন।

হাইকমিশনের মিনিস্টার (লেবার) সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি বিভিন্ন সময়ে যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তাদের কাছে যাব। আশা করি, স্থায়ী ঠিকানার সন্ধান বের করতে পারবো।’

লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সাইফুল ইসলাম জানান, ‘সংশ্লিষ্ট জেলা উপজেলার প্রশাসনের মাধ্যমে সাধারণত পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়। সেভাবে পাওয়া না গেলে তার ছবি-পাসপোর্ট সামাজিক মাধ্যমে দিয়ে অনুসন্ধানের চেষ্টা করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সফল হই। এক্ষেত্রেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যাতে দীন মোহাম্মদের মরদেহ পরিবারের কাছে পাঠানো যায়।’

তবে শেষ পর্যন্ত যদি কোনো স্বজনের খোঁজ না মেলে, তাহলে হয়তো মালয়েশিয়ার মাটিতেই বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হতে পারে দীন মোহাম্মদের মরদেহ।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আসলে একেবারেই কাউকে না পাওয়া গেলে আর কি-ই বা করার থাকে। কাউকে না কাউকে তো মরদেহ গ্রহণ করার জন্য পেতে হবে।’