স্পেনে হঠাৎ করে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসীর প্রবেশ ইউরোপজুড়ে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছে। গণজোয়ারের মতো এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্পেনের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করেছে ইউরোপের অন্যান্য দেশ। অভিবাসীরা যাতে ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার মরক্কোর উপকূলে অবস্থিত স্প্যানিশ শহর সেউতায় স্থল ও সমুদ্রপথে বিপুল সংখ্যক অভিবাসী ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্প্যানিশ সেনাবাহিনীকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়।
ইইউ-তে এক দিনে অবৈধ অভিবাসীদের সর্বকালের বৃহত্তম এই অনুপ্রবেশের পর কনজারভেটিভ এবং Reform UK ব্রিটেনের সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ব্রিটেনের ছায়া ফরেন সেক্রেটারি প্রীতি প্যাটেল বলেন, ‘‘সীমান্ত অতিক্রমকারীদের মধ্যে অনেকেই অনিবার্যভাবেই যুক্তরাজ্যে যাওয়ার চেষ্টা করবে।’
Reform নেতা নাইজেল ফারাজ সতর্ক করে বলেন, ‘‘হাজার হাজার তরুণ, যাদের অনেকেই বিপজ্জনক, তারা ক্যালে এবং আমাদের দেশের দিকে এগিয়ে আসবে। এখন জেগে ওঠার সময়। এটি আমাদের সভ্যতার লড়াই।’
অ্যান্ডি বার্নহাম পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে জানান, স্প্যানিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহযোগিতার পথ খোঁজা হচ্ছে এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি লুইস হাই বলেন, ‘‘সেউতার ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে এটি কোনও আক্রমণকারী বাহিনী নয়, বরং বিপুল সংখ্যক মানুষের সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা। আমাদের এই মানুষদের অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করা থেকে থামাতে হবে।’
সেউতার এই ঘটনা ইউরোপজুড়ে আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে এবং EU সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়িয়েছে।
ফিনল্যান্ডের সমর্থনে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্পেনকে Schengen এলাকা থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে ইতালি একতরফাভাবে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তি স্থগিত করে।
EU প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেন, ‘‘সেউতায় অভিবাসীদের এই ঢল অগ্রহণযোগ্য। আমাদের নিয়ম না মেনে কাউকে ইউনিয়নে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। বিপজ্জনক সীমান্ত পারাপার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।’
ফ্রান্স জানায়, তারা স্পেন সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে।
পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, ‘‘অবৈধ অভিবাসীদের হাত থেকে ইউরোপকে রক্ষা করতে আমরা বেলারুশ সীমান্তে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছি। শেনজেন টিকিয়ে রাখতে হলে স্পেনকেও একই পথ অনুসরণ করতে হবে।’
অন্যদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতালি, গ্রিস ও পশ্চিম বলকান অঞ্চলের মাধ্যমেও বিপুল সংখ্যক অভিবাসী EU-তে প্রবেশ করেছে।
সেউতা সফরকালে তিনি এই ঘটনাকে স্পেনের ওপর ‘হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করে জানান, তার সরকার আগত হাজার হাজার অভিবাসীকে মরক্কোতে ফেরত পাঠাতে কাজ করছে।
এদিকে জল্পনা-কল্পনা চলছে, মরক্কো কূটনৈতিক চাপ তৈরির উদ্দেশ্যে এই অনুপ্রবেশে ভূমিকা রেখেছে। মাদ্রিদের Center for Contemporary Arab Studies-এর পরিচালক হাইজাম আমিরা ফার্নান্দেজ বলেন, মরক্কোর কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এত বড় আকারের মানুষের স্থানচ্যুতি সম্ভব নয়।
বৃহস্পতিবার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়লে হাজার হাজার যুবক সাঁতরে সেউতায় প্রবেশ করে এবং অনেকে বেড়া ভেঙে ঢুকে পড়ে।
গত মাসে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের পর এই ঘটনা ঘটে, যেখানে বলা হয়—সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছানোর সময় সমুদ্রে আটক অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না।
সেউতার বিশৃঙ্খলা দ্রুত মেলিলাতেও ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার সেখানে ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশের চেষ্টা চলাকালে সীমান্তের উভয় পাশ থেকে সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া হয় বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র সচিব শাবানা মাহমুদ পররাষ্ট্র সচিব এড মিলিব্যান্ডকে লেখা এক চিঠিতে ইংলিশ চ্যানেল ও জিব্রাল্টারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
ডেম প্রীতি সতর্ক করে বলেন, ‘‘স্পেনের সাধারণ ক্ষমা অভিবাসীদের জন্য বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।’
গত বছরের শেষ নাগাদ অন্তত পাঁচ মাস ধরে দেশে বসবাসকারী অনথিভুক্ত অভিবাসীদের জন্য চালু এই প্রকল্পে প্রায় ১২ লাখ আবেদন জমা পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘‘স্পেনের কাছ থেকে সাধারণ ক্ষমা পাওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি মানুষকে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে উৎসাহিত করছে।’
নাইজেল ফারাজ বলেন, ‘‘স্পেন প্রায় পাঁচ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে সাধারণ ক্ষমা দিয়েছে। বার্তাটি পরিষ্কার—দেশে ঢুকলে থাকতে দেওয়া হবে। শেনজেন চুক্তি তাদের সহজেই ক্যালেতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিচ্ছে, এবং কয়েক মাসের মধ্যেই তারা ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার চেষ্টা করবে।’
সেউতা জিব্রাল্টার প্রণালীর মাধ্যমে স্পেনের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি অঞ্চল।