পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত পাঁচ বছর প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সক্রিয় থাকা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী এবার রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে উত্থান
৫৫ বছর বয়সী শুভেন্দু একসময় বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতার ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। কিন্তু ২০২০ সালের পর থেকেই তিনি তৃণমূল নেত্রীর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
পরপর দুই বিধানসভা নির্বাচনে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি সারা ভারতে ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে পরিচিতি পান। ফলে তার রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ইন্ডিয়া টুডের খবরে বলা হয়েছে, একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সেনাপতি শুভেন্দু অধিকারী শনিবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন। বিজেপির হয়ে বড় সাফল্য এনে দেওয়া এবং নিজের প্রাক্তন নেত্রীকে পুনরায় হারানোর মধ্য দিয়েই তার এই উত্থান।
রাজনৈতিক সফরের মাইলফলক
বামপন্থিদের বিরুদ্ধে রাজপথের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়া থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অন্যতম মুখ হয়ে ওঠা—শুভেন্দুর রাজনৈতিক যাত্রা এখন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে ‘হাই ভোল্টেজ’ লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর পর বিজেপির ভেতরে তার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। পাঁচ বছর পর ৪ মে তিনি আবারও সেই কৃতিত্ব দেখান।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে তিনি জয় পেয়েছেন ভবানীপুরে, যা মমতার সবচেয়ে নিরাপদ ‘রাজনৈতিক দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানে মমতাকে ১৫ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে তিনি একটি বড় ‘রাজনৈতিক অঘটন’ ঘটান।
দ্বিতীয় কেন্দ্র নন্দীগ্রামেও তৃণমূলের প্রভাবশালী প্রার্থী পবিত্র করকে সাড়ে ৯ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়েছেন শুভেন্দু। এই জয়গুলো তাকে বাংলায় বিজেপির সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
‘ট্রাবলশুটার’ থেকে ‘বেঙ্গল ফেইস’
ইন্ডিয়া টুডে শুভেন্দুকে মমতার ‘ট্রাবলশুটার’ থেকে বিজেপির ‘বেঙ্গল ফেইস’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি তৃণমূলের দ্বিতীয় প্রভাবশালী নেতা হিসেবে বিবেচিত ছিলেন।
মমতার ভাইয়ের ছেলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব বাড়তে থাকায় দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে শুভেন্দুর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মতবিরোধ তীব্র হলে ২০২০ সালের নভেম্বরে তিনি পরিবহন ও সেচ মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
বিজেপিতে যোগদান
এর কয়েক সপ্তাহ পরই তিনি বিজেপিতে যোগ দেন, যা ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে তৃণমূলের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।
২০২১ সালে বিজেপি ৭৭টি আসন পেলেও শুভেন্দু বিরোধী দলীয় নেতা হন। বিধানসভার ভেতরে ও বাইরে তিনি ছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ‘আক্রমণাত্মক কণ্ঠস্বর’।
রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান
পূর্ব মেদিনীপুরের এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম তার। রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন কংগ্রেসের মাধ্যমে এবং ১৯৯৫ সালে কাঁথি পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।
তৃণমূলে যোগদান
১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পর অধিকারী পরিবার এতে যোগ দেয়। তার বাবা শিশির অধিকারী তিনবারের বিধায়ক ছিলেন এবং ইউপিএ-২ সরকারের সময় কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তমলুক থেকে জয়ী হয়ে সিপিএম নেতা লক্ষ্মণ শেঠকে বড় ব্যবধানে হারান। ২০১৪ সালেও তিনি আসনটি ধরে রাখেন।
২০১৬ সালে বিধানসভায় প্রবেশ করে নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হন এবং মমতা সরকারের পরিবহন মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
নন্দীগ্রাম আন্দোলন ও উত্থান
২০০৭ সালে নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে তিনি রাজনৈতিকভাবে দ্রুত উত্থান ঘটান। এই আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং ২০১১ সালে বাম শাসনের অবসানে ভূমিকা রাখে বলে মনে করা হয়।
বিতর্কিত অধ্যায়
রাজনৈতিক জীবনে নানা বিতর্কেও জড়িয়েছেন শুভেন্দু। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ‘সারদা চিটফান্ড কাণ্ডে’ সিবিআই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন আক্রমণাত্মক মন্তব্য করে তিনি আবারও শিরোনামে আসেন।
আরও পড়ুন: