যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump বলেছেন যে "যুদ্ধবিরতি বহাল আছে"।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রথম বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করে। সেখানে ঘটনাটিকে ইরানি বাহিনী ও তাদের ভাষায় "শত্রুপক্ষের" মধ্যে "গুলিবিনিময়" হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
সংঘর্ষের সূচনা নিয়ে ইরানের দাবি
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এক অজ্ঞাত সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানায়, একটি ইরানি ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত হামলার পর এই সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে।
তাদের দাবি, প্রণালিতে অবস্থানরত "শত্রুপক্ষের ইউনিটগুলোকে" লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকমের বিবৃতি
এক বিবৃতিতে United States Central Command জানায়, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে ওমান উপসাগরের দিকে যাওয়ার সময় মার্কিন নৌবাহিনীর মিসাইল ধ্বংসকারী যুদ্ধজাহাজ "উসকানিবিহীন ইরানি হামলার" মুখে পড়ে।
সেন্টকমের দাবি, যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ট্রাকস্টন, ইউএসএস রাফায়েল পেরাল্টা এবং ইউএসএস ম্যাসনের ওপর ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌযান দিয়ে হামলা চালায়। তবে কোনো মার্কিন সামরিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলেও দাবি করেছে তারা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মার্কিন বাহিনী হামলাগুলো প্রতিহত করার পাশাপাশি "আত্মরক্ষামূলক হামলা" চালিয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, কমান্ড সেন্টার এবং নজরদারি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। "সেন্টকম উত্তেজনা বাড়াতে চায় না, তবে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষিত রাখতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে"।
যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ
অন্যদিকে, ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়া একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের কাছে আরেকটি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
এতে আরও দাবি করা হয়, বান্দার খামির, সিরিক ও কেশম দ্বীপের উপকূলীয় এলাকায় আকাশপথে হামলা চালানো হয়েছে। এর জবাবে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী মার্কিন সামরিক জাহাজে হামলা চালিয়ে "উল্লেখযোগ্য ক্ষতি" করেছে।
আইআরজিসির বক্তব্য
পরবর্তী সময়ে Islamic Revolutionary Guard Corps-এর নৌবাহিনীও একই অভিযোগ তোলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায়, জাস্ক বন্দরের কাছে একটি ইরানি ট্যাংকারের ওপর হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানি নৌবাহিনী "তীব্র বিস্ফোরক ওয়ারহেড" ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে এবং "শত্রুপক্ষের তিনটি অনুপ্রবেশকারী জাহাজ দ্রুত হরমুজ প্রণালি এলাকা ত্যাগ করেছে"।
বিস্ফোরণের খবর
ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম বন্দর আব্বাস, কেশম দ্বীপ ও তেহরানে বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করেছে। আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স ও তাসনিম জানিয়েছে, একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, তবে এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।
পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক প্রতিবেদক জানান, বন্দর আব্বাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় কোনো হতাহত বা আহতের ঘটনা ঘটেনি এবং "জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে"। এদিকে, পাল্টাপাল্টি হামলার খবর আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump দাবি করেছেন, যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল রয়েছে।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
"যুদ্ধবিরতি চলছে। এটি কার্যকর আছে," এবিসি নিউজকে বলেন তিনি। আর সংঘর্ষের ঘটনাকে "কেবল হালকা ধাক্কা" বলে বর্ণনা করেন ট্রাম্প।
সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া আরেক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ হামলার মুখে পড়লেও সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ইরানি বাহিনীর "বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি" করা হয়েছে বলেও লেখেন তিনি।
"এই নৌযানগুলো খুব দ্রুত ও কার্যকরভাবে সমুদ্রের তলদেশে পাঠানো হয়েছে। আমাদের বিধ্বংসীগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল, কিন্তু সহজেই সেগুলো প্রতিহত করা হয়েছে"।
ট্রাম্প আবারও জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনও ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেবে না। একইসঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
"আমরা ইরানিদের সঙ্গে আলোচনা করছি," বৃহস্পতিবার রাতে সাংবাদিকদের বলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, দাবি করেন আলোচনা "খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে"।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, "আলোচনা খুব ভালো চলছে, কিন্তু তাদের বুঝতে হবে—যদি চুক্তি স্বাক্ষর না হয়, তাহলে তাদের অনেক কষ্ট ভোগ করতে হবে"।
১৪ দফা সমঝোতা প্রসঙ্গ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump সম্প্রতি একটি ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছেন। এতে ভবিষ্যৎ পারমাণবিক আলোচনার কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে ইরানের পার্লামেন্টের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য এটিকে "ইচ্ছার তালিকা" বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
দেশটির প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian সম্প্রতি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি "অবিশ্বাস" থাকা সত্ত্বেও তেহরান কূটনীতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
তবে ইরানের সরকারের প্রকৃত ক্ষমতা কতটা, আর আইআরজিসি ও ইরানের সমান্তরাল ক্ষমতাকাঠামোর প্রভাব কতখানি—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব দেশটির সর্বোচ্চ নেতা Mojtaba Khamenei-এর হাতে। দুই মাস আগে তিনি তার বাবার স্থলাভিষিক্ত হন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে উপস্থিত না হলেও তার নামে প্রচারিত বার্তাগুলো থেকে বোঝা যায় যে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একইসাথে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনাও অব্যাহত রেখেছেন।
পূর্বের উত্তেজনা
সাম্প্রতিক এই সংঘর্ষের আগে থেকেই অঞ্চলটিতে উত্তেজনা বাড়ছিল।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, "প্রজেক্ট ফ্রিডম"-এর অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় মার্কিন বিধ্বংসীগুলো আগে থেকেই ইরানের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট নৌযানের হামলার মুখে পড়েছিল।
ইরান এর আগে অঞ্চলটিতে মার্কিন জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছিল এবং নিয়ম না মানা জাহাজের বিরুদ্ধে "চূড়ান্ত ব্যবস্থা" নেওয়ার সতর্কবার্তাও দিয়েছিল।
অবরোধ পরিস্থিতি
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধও অব্যাহত রয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানের তেল রপ্তানি সীমিত করতে তারা ইতোমধ্যে বহু জাহাজকে আটকে দিয়েছে বা ফিরিয়ে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর বিশ্ববাজারে তেলের দামও বেড়েছে। বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দুই দশমিক তিন শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ৪০ ডলারে পৌঁছেছে। আর মার্কিন ক্রুডের দাম দুই দশমিক এক শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬ দশমিক ৮০ ডলারে।