সিলেটজুড়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যা। সেপ্টেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেই বিভাগজুড়ে ১১টি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ-কোথাও গলায় ফাঁস, কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা, আবার কোথাও গলাকাটা বা ব্লেডের কাটা দাগ নিয়ে মিলেছে মরদেহ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এককভাবে কোনো একটি কারণে এই ঊর্ধ্বগতি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না; বরং সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনে ফাটল, প্রবাসমুখী হতাশা, ভূমি বিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামোগত দুর্বলতা-সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই ভয়াবহ চিত্র।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে জকিগঞ্জের বারহাল ইউনিয়নে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয় গর্ভবতী চম্পা রাণী দাশ (৩৫) ও তার পাঁচ বছরের মেয়ে হৃদি রাণী দাশের মরদেহ। একই দিন সিলেট মহানগরীর কান্দিগাঁও এলাকা থেকে উদ্ধার হয় যুবক আল-আমিনের (৩০) ঝুলন্ত লাশ।
এর আগের দিন শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) এয়ারপোর্ট থানাধীন কামারটিলা থেকে নাবিল হুসাইনের (২১) মরদেহ, দক্ষিণ সুরমার কদমতলী বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে এক যুবকের গলাকাটা লাশ এবং বিয়ানীবাজারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অর্জুন রবি দাসের (৩৭) মৃত্যু হয়।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দক্ষিণ সুরমায় ১৮ বছরের কিশোর আমিন এবং জকিগঞ্জে ১৫ বছরের মাসুদ আহমদের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হয়। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ব্যবসায়ী আহমদ আলী (২০), আর রাতে এয়ারপোর্ট থানাধীন পশ্চিম পাঠানগাঁওয়ে গলাকাটা অবস্থায় মেলে জমির আলীর (৪০) লাশ। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) জৈন্তাপুরের মিনাটিলা সীমান্ত ফাঁড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয় বিজিবি সদস্য জামিল আহমেদ শিষের (২০) মরদেহ।
কারণ কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে ঘটে যাওয়া একাধিক আলোচিত হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করছে না। বিশেষজ্ঞদের চিহ্নিত সামাজিক-পারিবারিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- পারিবারিক বন্ধনে ফাটল, চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান ও অর্থনৈতিক-সামাজিক বৈষম্য
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার
- বিদেশ যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থতাজনিত হতাশা, যা বিশেষত তরুণদের মানসিক সংকটকে আরও প্রকট করে তুলছে
- মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিস্তার, যা মানুষকে সর্বস্বান্ত ও মরিয়া করে তুলছে
- নৈতিক-ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরত্ব ও পারিবারিক দিকনির্দেশনার ঘাটতি
ভূমি ও সম্পত্তি বিরোধ
সিলেট বিভাগের একটি বড় অংশের জমি-সম্পত্তির মালিক প্রবাসী পরিবার-যাঁরা নিজে সরাসরি তদারকি করতে পারেন না। এই দূরত্বই স্থানীয় দালাল ও ভূমিদস্যুদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। একাধিক আলোচিত হত্যাকাণ্ডে (যেমন রায়নগরের ত্রিমুখী হত্যা) গ্রেপ্তার ব্যক্তির স্বীকারোক্তির পরও ভুক্তভোগী পরিবার দাবি করেছে, প্রকৃত কারণ ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ—যা সিলেটের প্রবাসবহুল এলাকাগুলোতে অপরাধের একটি বারবার ফিরে আসা প্যাটার্ন হিসেবে উঠে আসছে।
প্রশাসনিক দুর্বলতা ও মামলা বাণিজ্য
গত এক বছরে দেশজুড়ে পুলিশ বাহিনীতে যে ব্যাপক রদবদল, বদলি ও নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটেছে, তার প্রভাব সরাসরি পড়েছে মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, যে পুলিশ সদস্য একটি এলাকার অলিগলি, অপরাধীচক্র ও স্থানীয় সোর্সদের চিনতেন তিনি এখন অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন, ফলে তৈরি হয়েছে এক বিপরীত বাস্তবতা-পুলিশ অপরাধীদের চেনে না, কিন্তু অপরাধীরা পুলিশকে ঠিকই চিনে ফেলছে।
এই শূন্যতার সুযোগ নিচ্ছে চারটি পক্ষ: পেশাদার অপরাধীচক্র, ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং পুলিশের অসাধু সোর্সচক্র। সোর্সনির্ভরতার কারণে তথ্য যাচাই ছাড়াই অনেক সময় নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন, আবার প্রকৃত অপরাধীরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
থানায় সাধারণ ডায়েরি বা এজাহার লেখানো থেকে শুরু করে তদন্ত ও বিচার-প্রতিটি ধাপেই অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারীর দ্বারস্থ হতে হয় বলে অভিযোগ বহুদিনের। থানায় সরাসরি ন্যায্য প্রতিকার না মেলায় দালাল-নির্ভরতা বাড়ে, আর মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকাটাই হয়ে ওঠে কারও কারও আয়ের উৎস-এটিকেই স্থানীয়ভাবে বলা হয় "মামলা বাণিজ্য"। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গোয়াইনঘাটে বাবার ধর্ষণ-অভিযোগ নিয়ে থানায় যাওয়ার পথেই খুন হওয়ার ঘটনা-যা প্রশ্ন তুলেছে, আইনের আশ্রয় নিতে গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারই যদি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ কতটা সহজ থাকে।
বিশেষজ্ঞরা সমাধান হিসেবে বলছেন, প্রতিটি থানায় দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে-পরে হালনাগাদ "ক্রাইম প্রোফাইল" তৈরি, অপরাধী ডেটাবেজ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং নতুন কর্মকর্তাদের জন্য এলাকাভিত্তিক ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা জরুরি-যাতে সোর্স-নির্ভরতা কমিয়ে পুরো কমিউনিটিকে পুলিশের তথ্যভাণ্ডারে যুক্ত করা যায়।
সূত্র: বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ৫২বাংলার বিশেষ রিপোর্ট (দৈনিক শ্যামল সিলেট/সিলেটের বার্তা২৪, রূপালী বাংলাদেশ ও স্থানীয় সূত্র)।
-
কারাগারে ভিডিও কলে স্বজনের মুখ দেখার সুযোগ, তবে মাদক-দুর্নীতির পুরোনো অভিযোগ অমীমাংসিত
-
মন্ত্রী এলেই দৃশ্য বদলায় ওসমানী হাসপাতাল, বছরজুড়ে কেন ভোগান্তি: প্রশ্ন রোগীদের
-
মালয়েশিয়ার মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসার সুবিধা বাংলাদেশিদের জন্য সীমিত হলো
-
দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ইয়াসমিন
-
ঢাকায় গ্রেপ্তার বিয়ানীবাজার আওয়ামী লীগ নেতা পল্লব, নেওয়া হচ্ছে সিলেট আদালতে
আরও পড়ুন: