৫২বাংলা ডেস্ক
ঢাকায় সম্প্রতি চালু হওয়া নারী পরিচালিত 'পিংক বাস' সার্ভিস নতুন করে সামনে এনেছে একটি পুরোনো প্রশ্ন-কেন বাংলাদেশে অতীতে একাধিকবার নারী বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েও তা টিকে থাকেনি।
১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে এবং ২০০১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া সেবা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে কিছুদিনের মধ্যেই।২০০৯ সালে পুনরুজ্জীবনের চেষ্টাও ফল দেয়নি।
পরিবহন সেক্টর সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এই ব্যর্থতার পেছনে কেবল ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাই নয়, বরং সেক্টরের কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু সংকটও দায়ী।
রাজনীতির থাবা
বাংলাদেশের গণপরিবহন খাত বহু বছর ধরে সরকারদলীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকার অভিযোগ পরিবহন বিশ্লেষকদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে। রুট পারমিট বণ্টন থেকে শুরু করে বাস মালিক সমিতির নেতৃত্ব পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাব-বলয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ ধরনের কাঠামোয় নতুন কোনো সরকারি উদ্যোগ—যেমন নারী বাস সার্ভিস-বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষত যখন তা প্রচলিত মুনাফাভিত্তিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে পরিচালিত হয়।
নেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি কোর পরিকল্পনা প্রায়ই ধারাবাহিকতা হারায় বলে মনে করেন পরিবহনখাত বিশ্লেষকরা। একটি সরকারের সময় শুরু হওয়া প্রকল্প পরবর্তী প্রশাসনিক পরিবর্তনে গতি হারায় কিংবা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়-এমন নজির অতীতে একাধিকবার দেখা গেছে। ফলে স্বল্পমেয়াদি উদ্বোধনসর্বস্ব উদ্যোগ পরিণত হয় দীর্ঘস্থায়ী সেবায় রূপান্তরের বদলে সাময়িক প্রকল্পে।
শ্রমিক পক্ষের সম্পৃক্ততার অভাব
পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতিও অতীতে নারী বাস সার্ভিসের অন্যতম বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নতুন কোনো সার্ভিস চালুর ক্ষেত্রে চালক-শ্রমিক নিয়োগ, রুট বণ্টন কিংবা পরিচালন প্রক্রিয়ায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা অপরিহার্য হলেও প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নারী চালক-কন্ডাক্টর নিয়োগের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট মহলের আগ্রহ বা সক্রিয় সহযোগিতার ঘাটতি থাকার কথা বলে থাকেন সেক্টর পর্যবেক্ষকরা।
নতুন সার্ভিস, পুরোনো সিন্ডিকেট-ভীতি
বেসরকারি বাস মালিকদের একাংশের কাছে বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বী সার্ভিস মানেই যাত্রী ও রুট ভাগ হওয়ার শঙ্কা। নতুন কোনো সরকারি সার্ভিস বাজারে প্রতিষ্ঠিত সিন্ডিকেট কাঠামোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে-এই আশঙ্কা থেকেই এ ধরনের উদ্যোগে নীরব বা সক্রিয় প্রতিরোধ তৈরি হওয়ার নজির অতীতে দেখা গেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ফলে সীমিত সংখ্যক বাস দিয়ে শুরু হওয়া সেবা প্রয়োজনীয় সম্প্রসারণ ছাড়াই ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
শুধু উদ্বোধনেই সীমাবদ্ধ থাকে কেন
বাংলাদেশে সরকারি অনেক জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ হলো-উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জাঁকজমক যতটা থাকে, তার পরবর্তী বাস্তবায়ন ও তদারকি ততটা জোরালো থাকে না। সীমিত সংখ্যক যানবাহন দিয়ে সূচনা করে গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণের পর ধীরে ধীরে সেবার পরিধি সংকুচিত হয়ে যাওয়ার প্রবণতাও অতীতে একাধিক প্রকল্পে লক্ষ করা গেছে।
টিকে থাকতে হলে কী দরকার
বর্তমানে চালু হওয়া পিংক বাস সার্ভিস যাতে অতীতের ভাগ্য বরণ না করে, সে জন্য পরিবহন বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ে জোর দিচ্ছেন-রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন পরিচালনা কাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি বাজেট ও পরিকল্পনার নিশ্চয়তা, পরিবহন শ্রমিক সংগঠন ও বাস মালিকদের সঙ্গে সুস্পষ্ট নীতিগত সমন্বয়, এবং নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা যাতে সেবা কেবল উদ্বোধনেই সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ পায়।