৩৯ বছর শিক্ষকতা শেষে অবসর নিয়েছেন মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বেলা রানি দেব। তার বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে সাবেক শিক্ষার্থীরা ফুল দিয়ে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে তাকে রাজকীয় সংবর্ধনা জানিয়েছেন।
গতকাল সোমবার বিকেলে স্কুল প্রাঙ্গণে বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, সহকর্মী এবং স্থানীয় লোকজন চোখের জলে তাকে বিদায় জানান।
একই স্কুলে কেটেছে ৩৯ বছরের কর্মজীবন
১৯৮৭ সালের ৮ নভেম্বর বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন বেলা রানি দেব। ৩৯ বছরের পুরো কর্মজীবন তিনি একই প্রতিষ্ঠানে কাটিয়েছেন। প্রতিদিন চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এই স্কুলে আসতেন। বাড়ির কাছে আরও কয়েকটি সরকারি স্কুল থাকলেও বদলির জন্য তিনি আবেদন করেননি।
বেলা রানি দেবের সাবেক ছাত্র ও বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘উনি যখন স্কুলে যোগ দেন, তখন আমি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। তিনি কঠিন পড়াগুলো গল্পের মতো করে ঝিয়ে দিতেন। তার মাধ্যমে আমরা নিজেদের অজান্তেই পড়াশোনাকে ভালোবাসতে শুরু করি।’
বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত তুহিন জুবায়ের জানান, ম্যাডাম তার আন্তরিকতা ও বন্ধুসুলভ আচরণের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। শিক্ষার্থীরা তাকে ভয় পেত না। আমরা পড়ালেখা বা বাড়ির সমস্যা নিয়ে নির্ভয়ে তার কাছে যেতে পারতাম।’
প্রিয় শিক্ষকের বিদায়ে আবেগঘন আয়োজন
সাবেক শিক্ষার্থীরা জানান, বেলা রানির কাছে পড়াশোনা করা গ্রামের প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন এখন বিদেশে বসবাস করেন। তাদের অনেকেই প্রিয় শিক্ষকের বিদায় উপলক্ষে বার্তা ও ভিডিও পাঠিয়েছেন।
আরেক সাবেক ছাত্র শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ম্যাডাম আমাদের শুধু পাঠ্যবই পড়াননি, কীভাবে মানুষকে সম্মান করতে হয়—সেটাও শিখিয়েছেন। তাকে বিদায় জানানোটা আমাদের শৈশবের একটা অংশ হারিয়ে ফেলার মতো।’
ঘোড়ার গাড়িতে বসে আবেগাপ্লুত বেলা রানি দেব বলেন, ‘আমি ৩৯ বছর ধরে শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি। কখনো ভাবিনি যে অসাধারণ কোনো কাজ করেছি। সবার ভালোবাসা দেখে মনে হচ্ছে, আমি যা দিয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছি।’
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল শিকদার বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য সাবেক শিক্ষার্থীদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে শিক্ষকদের সম্মান করতে অনুপ্রাণিত করবে।