ফুজেল আহমদ । কানাডা
বর্তমান বিশ্বের ফুটবল মাঠে হাই-প্রোফাইল কোচরা ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অসংখ্য কৌশল প্রয়োগ করেন। তাঁরা কখনো প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা বিচার করে কৌশলের রূপান্তর ঘটান, কখনো নিজেদের শক্তিকে আরও শাণিত করে প্রতিপক্ষকে কৌশল বদলাতে বাধ্য করেন।
ফুটবলের অনেক কৌশলই পুরনো, তবে বিশেষ কোনো কোচের হাতে সেগুলো নতুন মাত্রা পেয়ে আবারও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তেমনই একটি কৌশলের নাম গেগেনপ্রেসিং।
সাম্প্রতিক সময়ে বায়ার্ন মিউনিখ ও ডর্টমুন্ডের পর জার্মান কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ লিভারপুলকে নিয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগে এই কৌশলের অসাধারণ প্রদর্শনী ঘটান। তাঁর হাত ধরেই দীর্ঘদিন পর লিভারপুল ট্রফি খরা কাটাতে সক্ষম হয়।
গেগেনপ্রেসিং কী?
"গেগেনপ্রেসিং" (Gegenpressing) একটি জার্মান শব্দ, যার অর্থ "কাউন্টার-প্রেসিং" বা বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরা। সাধারণত কোনো দল বলের নিয়ন্ত্রণ হারালে রক্ষণাত্মক অবস্থানে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু গেগেনপ্রেসিংয়ের মূল নীতি হলো — বল হারানোর পর পিছিয়ে না গিয়ে ঠিক সেই মুহূর্তে এবং সেই স্থানেই তীব্র গতিতে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা এবং চার থেকে পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে বল পুনরুদ্ধার করা।
এই কৌশলের যুক্তি সহজ — প্রতিপক্ষ যখন বল দখল করে, তখন তারা নিজেদের রক্ষণভাগ গুছিয়ে নেওয়ার আগেই অপ্রস্তুত অবস্থায় থাকে। সেই মুহূর্তে তীব্র চাপ প্রয়োগ করলে বল কেড়ে নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।
কৌশলের জনক রালফ রাংনিক
জার্মান কোচ রালফ রাংনিককে (Ralf Rangnick) আধুনিক গেগেনপ্রেসিংয়ের প্রধান রূপকার বা "গডফাদার" বলা হয়। নব্বইয়ের দশকে তিনিই জার্মানিতে এই ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তবে এই কৌশলকে বৈশ্বিক ফুটবলে সবচেয়ে সফল ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করেছেন ক্লপ, যিনি একে "হেভি মেটাল ফুটবল" বলে অভিহিত করেছিলেন।
বিশ্বকাপে গেগেনপ্রেসিং
এবারের বিশ্বকাপে হাই-প্রোফাইল কোচরা এই কৌশল নিয়েই মাঠে নামছেন। জাতীয় দলের ক্ষেত্রে ক্লাবের মতো ধারাবাহিক অনুশীলনের সুযোগ কম থাকায় গেগেনপ্রেসিং প্রয়োগ করা কঠিন। তবুও কিছু দল এই আগ্রাসী কৌশলকেই তাদের মূল শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে।
জার্মানির কোচ নাগেলসম্যান রাংনিকের সরাসরি শিষ্য। তিনি জার্মান জাতীয় দলে অত্যন্ত হাই-প্রেসিং ও আগ্রাসী গেগেনপ্রেসিং ফুটবল প্রয়োগ করেন। রাংনিকের অধীনে অস্ট্রিয়া ইউরোপের অন্যতম সেরা ও ভয়ঙ্কর প্রেসিং দলে পরিণত হয়েছে।
গতকালের আর্জেন্টিনা বনাম অস্ট্রিয়া ম্যাচে এই কৌশলের স্পষ্ট প্রদর্শনী দেখা গেছে। ব্রাজিলের কোচ আনচেলত্তি আগেই বলেছিলেন, অস্ট্রিয়ার এই হাই-স্পিড ফুটবলে আর্জেন্টিনা টিকতে পারবে না। মেসির অসাধারণ ব্যক্তিগত দক্ষতায় আর্জেন্টিনা ম্যাচ জিতলেও, অস্ট্রিয়া গেগেনপ্রেসিংয়ের কার্যকারিতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে — আর্জেন্টিনা বল ধরে রাখতে হিমশিম খেয়েছে এবং ভুল পাস দিতে বাধ্য হয়েছে।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি সরাসরি গেগেনপ্রেসিং না খেলালেও তাঁদের খেলায় "মিড-ব্লক প্রেসিং" কৌশলের প্রয়োগ লক্ষণীয়। রদ্রিগো দে পল, ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনসো ফার্নান্দেজের সমন্বয়ে গঠিত মিডফিল্ড বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালায়, যা গেগেনপ্রেসিং কৌশলেরই একটি রূপ।
মেসি ও কৌশলের সীমাবদ্ধতা
ফুটবল কৌশলের পাশাপাশি ব্যক্তিগত দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিংবদন্তি কোচ মরিনহো সবসময় বলেন, মেসি "বার্ডস আই" দৃষ্টিতে মাঠ দেখেন — দুই থেকে তিন সেকেন্ড আগেই বুঝে নেন বল কোথায় আসবে এবং পজিশন কোথায় নিতে হবে। এ কারণেই একজন প্লেমেকার হয়েও তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলেন।
সহজ কথায়, যে দলগুলো বল হারানোর পর এক মুহূর্তও দেরি না করে প্রতিপক্ষের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে বল ফিরিয়ে আনতে চায়, তারাই গেগেনপ্রেসিং কৌশলের অনুসারী। ২০০২ বিশ্বকাপে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তুলনামূলক দুর্বল দল হয়েও এই প্রেসিং কৌশলের কারণে বড় দলগুলোর বিরুদ্ধে সাফল্য পেয়েছিল।
ফুজেল আহমদ: লেখক, ক্রীড়া বিশ্লেষক । টরেন্টো, কানাডা। ২৩ জুন ২০২৬
