ভূমধ্যসাগরে মাইক্রোঅ্যালগি বা ক্ষুদ্র শৈবালের অস্বাভাবিক বিস্তারে ইসরায়েলের ছয়টি ডেসালিনেশন প্ল্যান্টের মধ্যে পাঁচটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটিকে শুরুতে নিছক একটি "বিরল প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা" হিসেবে তুলে ধরা হলেও, একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিজ্ঞানী ও মানবাধিকার সংগঠনের পর্যবেক্ষণ বলছে-এই সংকটের শিকড় লুকিয়ে আছে গাজায় চলা যুদ্ধের পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে।
- যুদ্ধ যেভাবে সমুদ্রে ফিরে এসেছে
গাজার পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামো ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলাফল-প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্যপানি সরাসরি ভূমধ্যসাগরে গিয়ে মিশছে।
আল জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা ইসরায়েলের সঙ্গে ভূমধ্যসাগর, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র ও উপকূলীয় জলাধার ভাগাভাগি করে, এবং গাজার বিদ্যুৎ ও পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামোর ধ্বংসের ফলে এক লাখেরও বেশি ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্যপানি প্রতিদিন ভূমধ্যসাগরে বা মাটিতে গিয়ে মিশছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দক্ষিণ ইসরায়েলের আশকেলন ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট গাজার বর্জ্যপানি থেকে উচ্চমাত্রার ব্যাকটেরিয়া দূষণের কারণে একাধিকবার বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, এবং অপরিশোধিত বর্জ্যপানি বিষাক্ত শৈবাল বিস্তার ঘটিয়ে শোধনাগারের ফিল্টার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করছে, পাশাপাশি মাছ ধরার এলাকাগুলোতে "মৃত অঞ্চল" তৈরি করছে।
সামুদ্রিক স্রোত রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না উল্লেখ করে একই প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বর্জ্যপানির বিষাক্ত পদার্থ, ভারী ধাতু ও রোগজীবাণু স্থানীয় সামুদ্রিক প্রাণীর দেহে জমা হয়, এবং মাছ যেহেতু সামুদ্রিক সীমান্ত পেরিয়ে চলাচল করে, তাই দূষিত সামুদ্রিক খাবার ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি উভয় ভোক্তার জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
- বিজ্ঞানীরা কী বলছেন
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মূল শৈবাল স্রোতকে মিশরের নীল নদের বদ্বীপ থেকে আসা বলে চিহ্নিত করলেও, তারা সতর্ক করেছেন যে গাজায় যেখানে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ছয়টি বর্জ্যপানি শোধনাগারই ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করে দিয়েছে, সেখান থেকে আসা অপরিশোধিত বর্জ্যপানি পরিস্থিতি আরও খারাপ করে থাকতে পারে।
ইসরায়েলি পরিবেশ সংস্থা জালুলের প্রধান নির্বাহী নোগা আরমি বলেছেন, নীল নদ থেকে শৈবাল উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় গাজা থেকে সাগরে ফেলা অপরিশোধিত বর্জ্যপানি মাইক্রোঅ্যালগির বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাচ্ছে, যা সম্ভবত এই বিস্তারকে আরও তীব্র করেছে।
তিনি আরও বলেন, এই বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক সুপ্রতিষ্ঠিত এবং গাজার বর্জ্যপানি এই ঘটনার অন্যতম কারণ।
বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন গবেষণাগারের প্রধান অ্যাভনার গ্রসের বরাত দিয়ে হেডলাইনসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ৪০ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্যপানি সাগরে গিয়ে মিশছে বলে ইনেত ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। গ্রস বলেন, দক্ষিণ গাজার দূষণ উৎস ছাড়া তিনি এই ঘটনার আর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছেন না।
- মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ: এটি কি "ইকোসাইড"?
দ্য প্রগ্রেসিভ পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে কোডপিংক ও কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের মতো মানবাধিকার সংস্থা এবং ফরেনসিক আর্কিটেকচারের মতো পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ইসরায়েলের গাজা-বিরোধী সহিংসতাকে কেবল গণহত্যা নয়, বরং পরিবেশের ইচ্ছাকৃত ও তীব্র ক্ষতিসাধন অর্থাৎ "ইকোসাইড" হিসেবেও সংজ্ঞায়িত করার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট দূষণ প্রথমে গাজার মানুষের ওপর আঘাত হানে, কিন্তু সামুদ্রিক স্রোত সেই বিষাক্ত পদার্থ ইসরায়েল, তুরস্ক, সাইপ্রাসসহ প্রতিবেশী উপকূলীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে দেয়।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর এক প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধ অঞ্চলটির পানি লবণমুক্তকরণ ও বর্জ্যপানি শোধন অবকাঠামোর উন্নয়নে অর্জিত সীমিত অগ্রগতি দ্রুত বিপরীতমুখী করে দিয়েছে, পাশাপাশি ওয়াদি গাজা উপকূলীয় জলাভূমি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা ও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনায় বিনিয়োগও ব্যাহত হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, বিস্ফোরক অস্ত্র থেকে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টন ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়েছে, অর্থাৎ গাজা ভূখণ্ডের প্রতি বর্গমিটারে গড়ে ১০৭ কিলোগ্রামেরও বেশি ধ্বংসাবশেষ জমা হয়েছে-যা ২০১৭ সালে ইরাকের মসুল যুদ্ধের তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি। ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসনের ভাষ্যে, এসব ধ্বংসযজ্ঞ মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও গাজার সহনশীলতার ওপর গভীরভাবে আঘাত হানছে।
- পানি এখন যুদ্ধেরও অস্ত্র
হারেৎজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার যুদ্ধ-বিধ্বস্ত পানি অবকাঠামো থেকে সৃষ্ট মাইক্রোঅ্যালগি বিস্তারে ইসরায়েলি ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট বিপর্যস্ত হওয়ার পরপরই ইসরায়েল গাজায় পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, যার ফলে জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফের তথ্যমতে প্রায় দশ লাখ ফিলিস্তিনি পানি সংকটে পড়েন। অর্থাৎ, একদিকে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত সংকট ইসরায়েলকেই বিপাকে ফেলেছে, অন্যদিকে সেই সংকট মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপ গাজার সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে-যুদ্ধ ও সহিংসতার পরিবেশগত মূল্য কোনো একক দেশ বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইউনিভার্সিটি অব ইউটার মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লোর ভাষ্যে, এই ঘটনা ডেসালিনেশন-নির্ভর পানি ব্যবস্থার ঝুঁকি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে-ভবিষ্যতে তেল দূষণ, সাইবার হামলা, সামরিক সংঘাত কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগও একই ধরনের অবকাঠামোকে বিপদে ফেলতে পারে।
প্রকৃতিও প্রতিশোধ নেয়, মনে রাখে। ভূমধ্যসাগরের এই শৈবাল-সংকট সেই স্মৃতিরই একটি অধ্যায়-যেখানে যুদ্ধ, সহিংসতা ও পরিবেশ ধ্বংসের প্রতিক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কারো জন্যই সীমান্তের বেড়াজালে আটকে থাকেনি।
সূত্র: The Washington Post, Al Jazeera, Haaretz, The Progressive, UNEP - এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ৫২বাংলার রিপোর্ট।
-
সৌদি আরবে ধরপাকড়: আটক ১৪ হাজারের মধ্যে ১২ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে ফেরত
-
ভিসাহীন বাংলাদেশিদের মালয়েশিয়া ছাড়তে বললো হাই কমিশন
-
রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ল অ্যামাজনের বিমান: মায়ামিতে প্রাণ গেল ৫ জনের
-
কেপ ভার্দেতে স্কুল বাস খাদে পড়ে নিহত অন্তত ২৫ শিক্ষার্থী, জাতীয় শোক ঘোষণা
-
ইতালির নাপোলিতে সড়ক দুর্ঘটনায় মাদারীপুরের তরুণ শরিফুলের মৃত্যু