যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া নতুন এই যুদ্ধের মাত্র তিন দিন পার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব দেশগুলোর ওপর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলার যে সিদ্ধান্ত ইরান নিয়েছে, তাতে ইতোমধ্যেই এটি একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
এরইমধ্যে যুক্তরাজ্য তাদের অবস্থান পাল্টে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।
এখনো এই যুদ্ধ তীব্রতর হচ্ছে এবং আমার ফোনে একের পর এক জরুরি খবরের সতর্কবার্তা আসছে।
আমি এইমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পড়লাম।
এটিতে বলা হয়েছে, কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুলিতে তিনটি ইউএস এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে।
এই ঘটনাকে "ভুল বোঝাবুঝি" বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
আমার এই লেখাটি শেষ হওয়ার আগেই হয়তো আরো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হবে এবং খুব সম্ভবত যারা এখনো জীবিত আছেন তাদের কেউ কেউ হয়তো মারা যাবে।
এই যুদ্ধ কখন বা কীভাবে শেষ হবে সে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য এখনো সময় আসেনি। কারণ যুদ্ধ একবার শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কীভাবে এর সমাপ্তি দেখতে চায় তার কয়েকটি দিক এখানে তুলে ধরা হলো।
যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই আমেরিকার শক্তি নিয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো বাসভবনে ধারণ করা একটি ভিডিও বার্তায় মি. ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর কথা জানান।
অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট হলে হয়তো বা ওভাল অফিসের রেজোলিউট ডেস্কে বসে গাম্ভীর্যপূণ ভাষণের মাধ্যমে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়ার কথা চিন্তা করতেন।
ভিডিওটিতে ট্রাম্পকে খোলা গলার শার্ট পরিহিত এবং সাদা বেসবল ক্যাপ পরা দেখা যায়, যেটা তার চোখের ওপর নামানো ছিল।
অভিযোগের দীর্ঘ তালিকা তুলে ধরে মি. ট্রাম্প যুক্তি দেন যে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে পড়েছিল।
ট্রাম্প সবসময়ই তার মত পরিবর্তন করতে পারেন কিন্তু সেই বক্তব্যে তিনি তার বিজয়ের ধারণার সংজ্ঞা দিয়েছেন।
"আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করবো এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প একেবারে গোঁড়া থেকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হবে। এটা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে। আমরা তাদের নৌবাহিনী ধ্বংস করবো। আমরা নিশ্চিত করবো যে, সন্ত্রাসীরা এই অঞ্চল বা বিশ্বে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারবে না এবং আমাদের বাহিনীর ওপর হামলা করতে পারবে না" বলেন ট্রাম্প।
"একইসাথে তারা আর ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) অথবা রাস্তার পাশে বোমা স্থাপন করতে পারবে না আর এর মাধ্যমে তারা আর হাজার হাজার মানুষকে আহত বা হত্যা করতে পারবে না, বিশেষ করে অনেক আমেরিকানদের" নিজ বক্তব্যে বিজয়ের এমন ধারণা দেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে যেটা যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে। যদিও তার এমন স্টেটমেন্ট বা বিবৃতি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার যে মূল্যায়ন তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
ট্রাম্প এমন দাবিও করেছেন যে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ইরান।
কিন্তু তার এমন দাবি আবার গত গ্রীষ্মে দেওয়া ট্রাম্পেরই নিজের আরেকটি বিবৃতির সাথে বিরোধপূর্ণ।
ওই বক্তব্যে তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে তেহরানের এই শাসনব্যবস্থাকে অক্ষম করে দিতে পারে।
ট্রাম্প মনে করেন, যদি সরকার আত্মসমর্পণ না করে তাহলে এতোটাই দুর্বল হয়ে যাবে যে, ইরানি জনগণের জন্য সবচেয়ে ভালো সুযোগ হবে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার জন্য রাজপথে নেমে আসা।
"যখন আমরা আমাদের কাজ শেষ করবো তখন আপনারা আপনাদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেবেন। আপনারা এই অধিকার পাবেন। সম্ভবত আপনাদের এই প্রজন্মের জন্য এটাই একমাত্র সুযোগ। অনেক বছর ধরেই আপনারা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছেন কিন্তু কখনও আপনারা তা পাননি" বলেন তিনি।
"আমি আজ রাতে যা করতে চাই আর কোনো প্রেসিডেন্ট সেটি করতে রাজী হয়নি। এখন আপনারা এমন এক প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন যিনি আপনারা যা চাইছেন তাই দিচ্ছে। চলুন দেখা যাক, আপনারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান" বলেন মি. ট্রাম্প।
ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দায়িত্ব সেদেশের জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়া- এমনকি ট্রাম্প নিজেও তাদেরকে এই কর্মকাণ্ডে সরাসরি যেভাবে উৎসাহিত করছেন, তা তাকে ভবিষ্যতে পরিত্রাণের অজুহাত তৈরি করে দিতে পারে।
অর্থাৎ যদি বর্তমান এই সরকার টিকে যায় তাহলে তিনি দায় এড়াতে পারবেন।
কিন্তু এই পুরো কাজটা সম্পন্ন করা যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
যদিও এক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন থেকেই যায় যে, এমন নৈতিকতা ঠিক কীভাবে বা কতটা একজন প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করবে যিনি বিশ্বাস করেন, যে কোনো সমস্যারই সবসময়ই কোনো না কোনো সমাধান করা সম্ভব।
শুধুমাত্র বিমান হামলার মাধ্যমে সুসজ্জিত কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় বা কোনো দেশের শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ফেলার মতো কোনো নজির ইতিহাসে নেই।
সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যসহ তাদের মিত্র দেশগুলো ইরাকে বিশাল স্থলবাহিনী পাঠায়।
লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ২০১১ সালে যে বিদ্রোহী গোষ্ঠী উৎখাত করে তাদেরকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছিল নেটো এবং উপসাগরীয় দেশগুলো। একইসাথে সুরক্ষাও দিয়েছিল বিমান বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আশা করছেন, ইরানের জনগণ নিজেরাই হয়তো এই পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হবে।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা বিশাল এক জুয়া। কারণ শুধুমাত্র বোমা হামলা করে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
তবে কি পশ্চিমা ঘেঁষা অভ্যন্তরীণ কোনো অভ্যুত্থান হতে পারে? যুদ্ধের তৃতীয় দিনে দাঁড়িয়ে বিষয়টি অসম্ভব না হলেও ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম।
বরং এর চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা হলো, যারা বর্তমানে ক্ষমতায় আছেন তারা আরো শক্ত অবস্থানে চলে যাবেন এবং আরো বেশি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবেন।
তারা এই আদর্শ এবং দৃঢ় বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত যে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল অথবা আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি কষ্ট বা প্রতিকূলতা সহ্য করতে সক্ষম তারা।
এই যন্ত্রণার অধিকাংশই ভোগ করতে হবে দীর্ঘদিন ধরে কষ্টে থাকা সাধারণ ইরানি জনগণকে।অথচ এই বিষয়ে তাদের মতামত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
নেতানিয়াহু'র পরিকল্পনা ও লক্ষ্য
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বিবৃতি দিয়ে, ইরানের মানুষদেরকে নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্তু যদি তারা এই সরকারের কঠোর নিরাপত্তা বাহিনীকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নেতানিয়াহুর অগ্রাধিকার হবে ইরানের সামরিক ক্ষমতাকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং মিলিশিয়া বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর পুনর্গঠনের সক্ষমতা ধ্বংস করা, যাতে তারা এই অঞ্চলে ইসরায়েলের জন্য হুমকি হতে না পারে।
গত কয়েক দশক ধরে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানকে ইসরায়েলে সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তিনি বিশ্বাস করেন, ইরানের শাসকরা ইহুদি রাষ্ট্র ধ্বংস করতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায়।
যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন, রোববার, তেল আভিভের ঠিক প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সম্ভবত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহু এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ করতে চান সে বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, "৪০ বছর ধরে আমি যা অর্জন করতে চেয়েছি তা হলো সন্ত্রাসবাদী এই শাসন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া", যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল একসঙ্গে মিলে তা করতে সক্ষম হবে''।
এটিকে প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করে এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি বদ্ধপরিকর বলে জানান।
যে কোনো যুদ্ধের সঙ্গে সবসময়ই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হিসাব-নিকাশ থাকে।
ট্রাম্পের মতো নেতানিয়াহুকেও এই বছরের শেষের দিকে নির্বাচনে লড়তে হবে। তবে ট্রাম্পের তুলনায় নেতানিয়াহুর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বেশি ঝুঁকিতে।
অনেক ইসরায়েলিই ২০২৩ সালের সাতই অক্টোবর হামাসের হামলার পেছনে নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটিকে দায়ী করেন।
যদি তিনি যদি ইরানকে পরাজিত করে ইসরায়েলকে চূড়ান্ত বিজয় এনে দিতে পারেন তবে বড় ধরনের নির্বাচনী ক্ষমা পেতে পারেন নেতানিয়াহু। এমনকি অপ্রতিদ্বন্দ্বীও হয়ে উঠতে পারেন তিনি।
টিকে থাকাই বিজয়?
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং শীর্ষস্থানীয় সামরিক নেতাদের হত্যাকাণ্ড দেশটির বর্তমান শাসনামলের জন্য ভয়াবহ ধরনের আঘাত।
কিন্তু এর মানে এই নয় যে, পুরো শাসন ব্যবস্থা এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
প্রায় ৫০ বছর আগে আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এবং অন্য প্রতিষ্ঠাতারা দেশটিকে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যাতে যুদ্ধ ও গুপ্তহত্যার বিরুদ্ধেও তা টিকে থাকতে পারে। এই শাসন ব্যবস্থা কেবল কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
সিরিয়ার বাশার আল আসাদ অথবা লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসন ব্যবস্থা অনেকটাই পরিবারকেন্দ্রিক।
যখন এই পরিবারগুলোকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়, তখন গাদ্দাফি নিহত হয়েছিলেন এবং বাশার দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তখন দেশগুলোর পুরো শাসন ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছিল।
ইরানের শাসন ব্যবস্থা একটি স্টেট সিস্টেম বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এক জটিল ও শক্তিশালী নেটওয়ার্কের ওপর দাঁড়িয়ে, যেখানে একেকটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আরেকটির সঙ্গে জড়িত।
যুদ্ধ এবং গুপ্তহত্যার মত বিপর্যয় মোকাবেলা করার জন্যই ইরানের শাসন ব্যবস্থায় এমন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
তবে তার মানে এই না যে, দেশটি টিকে যাবে। ইরান এখন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই তারা এই মুহূর্তের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে।
ইরানের এই শাসন ব্যবস্থার কাছে বিজয় অর্থ হলো যে কোনো মূল্যে টিকে থাকা। সেই লক্ষ্যে তারা নিজেদের চারপাশে দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে।
দেশটির সরকারের রয়েছে শক্তিশালী এবং কঠোর নিরাপত্তা বাহিনী, যারা দমন-পীড়ন ও বলপ্রয়োগে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রাস্তায় ছিল, যাদের হাজারো বিক্ষোভকারীকে হত্যার আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
এখন পর্যন্ত, আমার এই প্রতিবেদন লেখার সময় যুদ্ধের মাত্র তৃতীয় দিন চলছে, সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে ভাঙনের এখনো কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোরের কাজ কী?
ইরানের প্রচলিত সামরিক বাহিনী এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি দেশে ও দেশের বাইরে এই শাসন ব্যবস্থাকে রক্ষা করার জন্য রয়েছে ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।
মূলত 'ভেলায়েত ই ফাকিহ' বা ধর্মীয় নেতৃত্বের শাসন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখাই এই বাহিনীর দায়িত্ব। এটাই ইরানে ইসলামি বিপ্লবের মূল মতবাদ যার মাধ্যমে শিয়া ধর্মীয় নেতাদের শাসনকে বৈধতা দেয়া হয়।
আইআরজিসির প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার সক্রিয় সদস্য এবং ছয় লাখের মতো সংরক্ষিত বা রিজার্ভ সদস্য রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ধর্মীয় আদর্শের বাইরে এই বাহিনীর শীর্ষ নেতাদের শাসন ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক কারণও।
এই ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোর এর পেছনে শক্তি হিসেবে কাজ করে বাসিজ নামে একটি আধা সামরিক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী।
এদের সদস্য সংখ্যা প্রায় চার লাখ ৫০ হাজার বলে ধারণা করা হয়।
দেশটির শাসন ব্যবস্থা বা সরকারের প্রতি আনুগত্য এবং কঠোর আচরণের জন্য এই বাহিনী পরিচিত।
২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর তেহরানে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল সেখানে এই বাসিজ বাহিনীকে অ্যাকশনে বা মাঠে দেখেছি আমি।
সেসময় তারা শাসনব্যবস্থা রক্ষার প্রথম সারিতে থাকা বাহিনী হিসেবে কাজ করেছে।
ওই বাহিনীর রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের হুমকি-ধামকি ও পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার দৃশ্য ছিল ভয়াবহ।
তাদের পেছনের সারিতে ছিল সশস্ত্র পুলিশ এবং ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোরের সদস্যরা।
এছাড়া এই বাসিজ বাহিনীর ফ্লাইং স্কোয়াডের সদস্যরা মোটরবাইকে করে পুরো শহরে ঘুরে বিক্ষোভকারীদের দমন করতেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইআরজিসি এবং বাসিজ বাহিনীর সদস্যদের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, তারা যদি অস্ত্রসমর্পণ না করে তাহলে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত, পরিণতি "ভালো হবে না।"
তবে তার এই হুমকি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে কতটা পরিবর্তন আনবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
ইরান এবং শিয়ারা শাহাদাত বা অমরত্বের ধারণায় উদ্বুদ্ধ।
রোববার ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সরকারিভাবে যখন দাবি করা হচ্ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সুস্থ ও নিরাপদে আছেন। কিন্তু পরে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সংবাদ পাঠক কাঁদতে কাঁদতে তার মৃত্যুর খবর দিয়েছেন এবং তিনি বলেছিলেন, খামেনি শাহাদাতের পবিত্র সুধা পান করেছেন।
ইরান বিষয়ে কয়েকজন বিশ্লেষকের ধারণা, যখন পুরো বিশ্বের অনেকেই ইরানে আসন্ন হামলার শঙ্কা করছিল, তখনও আয়াতুল্লাহ তেহরানে নিজের কম্পাউন্ডে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক চালিয়ে গেছেন, এর কারণ তিনি নিজেই শাহাদাত বরণ করতে চেয়েছিলেন।
ইরানি শাসনব্যবস্থার প্রতি অনুগত এমন বেসামরিক সমর্থকদের সংখ্যাও রয়েছে।
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর পাওয়ার সাথে সাথে তেহরানের পথে নেমে আসেন হাজার হাজার মানুষ। দেশটিতে ঘোষিত ৪০ দিনের শোক পালনের প্রথমদিনেই তারা বিভিন্ন চত্বরে জড়ো হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় আকাশজুড়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলির মধ্যেই ইরানের মানুষ হাতে মোমবাতি আর মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
নিকৃষ্ট যেসব উদাহরণ
আমেরিকানরা বিশ্বাস করে, এবার তাদের এবং ইসরায়েলের সম্মিলিত শক্তি কোনো ধরনের বিপর্যয় ছাড়াই শত্রুর শাসন ব্যবস্থা বদলে দিতে সক্ষম হবে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো নয়।
২০০৩ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের পর দেশটি ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। দেশটিতে দীর্ঘসময় ধরে চলা যুদ্ধের পরে উগ্রবাদী জিহাদী গোষ্ঠির জন্ম হয়েছে যারা এখনও সক্রিয়।
লিবিয়ারও একই ধরনের অবস্থা।
এই দেশটির স্বল্প সংখ্যক জনসংখ্যার অনায়াসেই পশ্চিমা বিশ্বের মতো উন্নত জীবন কাটানোর মত যথেষ্ট পরিমাণের সম্পদ ছিল যেমন: তেল।
কিন্তু মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ১৫ বছর পর লিবিয়া এখনও একটি বিধ্বস্ত ও দরিদ্র দেশ, এক কথায় একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র।
পশ্চিমা দেশগুলোর যারা একসময় গাদ্দাফির পতনের পর উৎসব করেছিল তারা লিবিয়া ভেঙে পড়ার পর দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে একপ্রকার হাত ধুয়ে ফেলেছে।
ইরাকের তুলনায় ইরান প্রায় তিনগুণ বড় একটি দেশ। এই দেশটিতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ৯০ মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস করে।
যদি ইরানের বর্তমান সরকার বা শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটে তাহলে দেশটিতে দুঃস্বপ্নের মতো বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত শুরু হতে পারে, যা সিরিয়া ও ইরাকের গৃহযুদ্ধকেও হার মানাতে পারে। সেই যুদ্ধগুলোতে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।
যদি কোনোভাবে ইরানের বর্তমান এই সরকার টিকে যায় তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
ইরানের এই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটলে দেশটির অনেক মানুষ সম্ভবত অধিকাংশ মানুষই উল্লাস করবে।
কিন্তু বলপ্রয়োগে একটি সরকারকে হটিয়ে সেখানে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই বাজি ধরেছেন যে, এটা সম্ভব, এই যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্য আরো উন্নত ও নিরাপদ স্থানে পরিণত হবে। তবে বাস্তবে তা কতটুকু হবে সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে।