একাত্তর আর ইসলাম জনপ্রিয় বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। এগুলো বেচা সহজ, ক্রেতার অভাব নেই। কোনোমতে দোকান খুলে বসলেই সাফল্য অনিবার্য—নির্বোধ জনগণ হা-করেই বসে আছে—আঙুল ফুলে কলাগাছ না, এক্কেবারে বটগাছ হয়ে যাবেন দ্রুত।
আমাদের রাজনীতি, আমাদের যাবতীয় মূল্যবোধ অর্থ-বিত্তের কাছে আত্মসমর্পণ করে বসেছে পুরোপুরি। রাজনীতি ‘জনসেবা’ নয়; ‘আত্মসেবা’ কিংবা ‘গোষ্ঠীসেবা’। ইতিহাসে দুই-একবার দেখা দিয়েছিলেন দুই-একজন জনসেবক বা প্রকৃত নেতা। তাঁদের নাম বাজারজাত করে বর্তমান নেতাদের প্রায় সবাই পুঁজিপতি, অথবা পুঁজিপতিরাই নেতা। তাদের কাছে রাজনীতিও চিনিকল, পাটকল কিংবা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি— বরং ফ্যাক্টরির অধিক লাভজনক কিছু— এখানে বিনিয়োগ করে পদে বসতে পারলেই হলো— উৎপাদনবিহীন কর্মঘণ্টা আর কাড়ি কাড়ি মুনাফা— মজা আর মজা। ছাত্ররাজনীতিও চলছে একই কায়দায়, পদে বসতে পারলেই হলো— ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার আগেই কোটিপতি! তো, পুঁজিপতি নেতাদের পোষ্য-শিষ্যরা ‘জীবনবৃক্ষের শাখায়’ ফুল ফোটাবে কেমন করে? তারা যা পারে, যা শেখে তা-ই তো করে— জীবনবৃক্ষের শেকড়ে বিষাক্ত হুল ফোটায়। এই হুল কখনো লুট, কখনো হত্যা কখনো ধর্ষণ, কখনো পাচার, কখনো আরো হিংস্র কোনোরূপে আত্মপ্রকাশ করে যা আমরা এখনো অনুমান করতেও পারি না! ধর্ষণ এখন আর ‘কাম’ নয়, রাজনীতি— শক্তিপ্রদর্শনের হাতিয়ার। ফেসবুকের প্রোফাইল কালো করে, পথেঘাটে স্লোগান দিয়ে তাই ধর্ষণ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। ধর্ষণ ক্ষমতার দাপট দেখানোর ধারাবাহিকতা মাত্র।
এদেশেরই একজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক লিখে গেছেন, ‘দেশ হয়ে উঠেছে অত্যাচারের স্বয়ংক্রিয় কারখানা। প্রতিহিংসার দানবকে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে দেশ জুড়ে। আরো ভয়াবহ হচ্ছে যে তরুণদের বিকৃত ক’রে ফেলা হচ্ছে; তারাও মুক্তচিন্তার প্রতি আগ্রহ বোধ করছে না; তারা অন্ধের মতো শ্লোগান দিচ্ছে নিজেদেরই ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে—নষ্টভ্রষ্ট নেতাদের নামে শ্লোগান দিয়ে, বইপুস্তক খাতাপত্র নর্দমায় ছুঁড়ে ফেলে, তারা নেতা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
একদিন তারা মন্ত্রী হবে, তাই এখনই তাদের সন্ত্রাস করার শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়; তাদের হওয়া দরকার সন্ত্রাসের ডক্টরেট, ডক্টর সন্ত্রাস। পিতামাতারা নষ্ট হয়ে গেছে, এখন তারা নষ্ট করে চলছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ, দেশের ভবিষ্যৎ।
স্বাধীন বাঙলাদেশ হয়ে উঠেছে একটি নির্মম হাজত।
এ-অবস্থায় আমি কী ক’রে বটছায়াতলে ব’সে ধ্যান করি?’ [দ্র. হুমায়ুন আজাদ/আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম?]
আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষ আর কী বলতে পারে?
খালেদ রাজ্জাক : কবি, শিক্ষক।
আরও পড়ুন: