সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
https://blu-ray.world/ download movies
সর্বশেষ সংবাদ
প্রধানমন্ত্রীর সাথে আবরারের পরিবারের সদস্যরা  » «   প্রবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র সরবরাহের কাজ শুরু হচ্ছে শিঘ্রই  » «   গ্রীসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে মতবিনিময়  » «   আবরার হত্যায় ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের বিস্ময় ও দুঃখপ্রকাশ  » «   বুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদকের কক্ষ সিলগালা  » «   মিলানে দূতাবাসের উদ্যোগে বাউল সংগীতের অনুষ্ঠান  » «   জন্মস্থান থেকে ‘রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ফাউন্ডেশনে’র যাত্রা শুরু  » «   নর্থ ওয়েষ্ট ইংল্যান্ডে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন  » «   ঢাকায় কাব্যকলার আয়োজনে কেন্দ্রীয় পাঠক সমাবেশে কবিতা ও আড্ডা  » «   পিঠা মেলা সফল করতে লন্ডনে প্রস্তুতি সভা  » «   আমিরাতে কমলগঞ্জ প্রবাসী কল্যাণ সমিতির মতবিনিময়  » «   লন্ডনে বঙ্গবন্ধু কাপ ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত  » «   সাবেক অতিরিক্ত সচিবকে জিএমবিএ’র উদ্যোগে সংবর্ধনা  » «   আবরার হত্যার আগে ম্যাসেঞ্জারে ছাত্রলীগ নেতার নির্দেশনা  » «   আওয়ামী লীগ সাউথ লন্ডন শাখার সম্মেলন অনুষ্ঠিত  » «  

আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম:এক শব্দসৈনিক নিয়ে দু’টি কথা



আমার একটা লেখা ফেইসবুকে পোস্ট করার পর খালেদ জাফরীর স্ট্যাটাস থেকে জানতে পারলাম আগস্টের দুই তারিখ নিভৃতচারী শব্দসৈনিক, কথা সাহিত্যিক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলামের প্রয়াণ দিবস। পুরনো দিনের কথা লিখতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে তার কথা কিঞ্চিত উল্লেখ করেছিলাম। আজ মনে হচ্ছে এই গুণী ব্যক্তির সাথে আমার যে সামান্য স্মৃতি আছে, তা উল্লেখ করে তাকে স্মরণ করা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কেননা মুক্তবুদ্ধি-সম্পন্ন ধীমান কারো স্মৃতি হাতড়ালে অবশ্যই কিছু হীরে-রত্ন মিলবে, যা সত্যসন্ধ পাঠককে পথের দিশা পেতে সাহায্য করলে করতেও পারে। আমরা যে অন্ধকার গুহার ভিতর দিয়ে যাচ্ছি, তা থেকে মুক্তির উপায়ও হয়তোবা মিলে যেতে পারে।

অনেকেই জানেন আবার অনেকেই হয়তো জানেন না যে, আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম শুধু গল্পকার এবং উপন্যাস লেখকই ছিলেন না, ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের করিমগঞ্জে গিয়ে পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের জুগিয়েছেন নিরন্তর প্রেরণা। স্বপ্ন দেখেছেন বাঙালির একটি নিজস্ব দেশ হবে। সেই দেশে থাকবে না শোষণ-বঞ্চনা-নিপীড়ন। সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ-সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। পশ্চিমা শাসকদের হটিয়ে যদি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ করা যায়, তবে সাধারণ বঞ্চিত মানুষের মুক্তি নিশ্চিত হবে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি রাজনীতিতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। বিয়ানীবাজার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক-সভাপতি হয়েছেন। তিনি ছিলেন রাজনীতির মানুষ। সাহিত্যের মানুষ। সিলেটে তখন সাহিত্যচর্চার দুটো ধারা গড়ে ওঠে। একটি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষের এবং অপরটি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের। আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম এই দুটি ধারার কোনোটিতেই যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু স্বপ্নে-ধ্যানে মনে প্রাণে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীলতার পক্ষের মানুষ।এ ক্ষেত্রে তার কোনো কক্ষচ্যুতি ছিল না।মিশতেন সবার সাথেই অবলীলায়। হাঁস যেমন পানিতে সারাদিন সাঁতার কেটে ডাঙায় উঠে পালক ঝাড়া দিলেই শুকিয়ে যায়, তিনি ছিলেন সেই চরিত্রের লোক।

সিলেটের সাহিত্যচর্চার সুবাদে আকাদ্দস সিরাজুল ইসলামের সাথে আমার সাক্ষাত হয়েছে। তার গুরুতুল্য আদেশ-নির্দেশ-সদুপদেশে ধন্য হয়েছি। বলতে দ্বিধা নেই, আমার আধুনিক মুক্তবুদ্ধির আলোকে স্নাত মনোজগত নির্মাণে তার অল্পাধিক অবদান রয়েছে বৈ কি। খুব মনে পড়ছে, সিলেটে সাহিত্য সম্মেলন ৮১ এর কথা। ঐ সম্মেলনকে ঘিরে সিলেটের কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক ও সাহিত্যামোদীদের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। ঐ সম্মেলনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন যথাক্রমে এডভোকেট সয়ফুল আলম খান ও সাংবাদিক তবারক হোসেইন। আমি ঐ সম্মেলন কমিটিতে দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পাই। আমাদের অস্থায়ী কার্যালয় ছিল জিন্দাবাজারস্থ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। প্রতিদিনই সন্ধ্যায় আমরা আমাদের অফিসে সম্মেলনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বৈঠকে বসতাম। বিভিন্ন উপকমিটির বৈঠক বসতো অফিসে। সাহিত্যের এক মহাকর্মযজ্ঞ চলছিল। আকাদ্দস সিরাজুল ইসলামও একটি উপকমিটির সদস্য ছিলেন। নিয়মিত না হলেও সাহিত্যের টানে মাঝে মধ্যে অফিসে এসে অনেকক্ষণ কাটিয়ে যেতেন। অগ্রগতির খোঁজ খবর নিতেন।

এরই মধ্যে ৩০ মে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই শোনা গেল, প্রেসিডেণ্ট জিয়া চট্টগ্রামে নির্মমভাবে নিহত হন। দেশ জুড়ে শুরু হয়ে গেল অনিশ্চয়তা।কি হবে কি হবে – এরকম উৎকণ্ঠা সবার মধ্যে। অফিসে আমরা এসে জড়ো হয়েছি। সম্মেলন হবে কি না – তা নিয়ে সবার উদ্বেগ। এত টাকা পয়সা খরচ করে এত প্ল্যান পরিকল্পনা সেরে শেষ পর্যন্ত যদি সম্মেলন না হয়? দপ্তর সম্পাদক হিসেবে আমার কাজটি তখন শুধু আঙুল কামড়ানো আর বসে বসে অনিশ্চয়তার ঢেউগুলো গোণা। দেখি, অন্যান্য দিনের মতো ধীরে সুস্থে আকাদ্দস ভাই অফিসের দিকে এগিয়ে আসছেন। মুখটা গম্ভীর। ঘটনা কি? আকাদ্দস ভাই জিয়ার রাজনীতি করেন না। তার মুখ গম্ভীর হবে কেন? নাকি সম্মেলনটা হবে না ভেবে মন খারাপ?

বললাম, জিয়া মারা গেছেন, শুনেছেন আকাদ্দস ভাই? তিনি মাথা নাড়লেন। চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, জিয়া মারা যান নাই, নিহত হয়েছেন। এরপর অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, এক মুক্তিযোদ্ধা আরেকজন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছে। আকাদ্দস ভাই জিয়ার রাজনীতি করেন না। জিয়া তার পছন্দের লোকও নন, কিন্তু একটা জায়গায় জিয়ার সাথে তার মিল, জিয়াও মুক্তিযোদ্ধা, তিনিও। রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করে তোলেন জিয়া। স্বাধীনতা-বিরোধী মৌলবাদী শক্তিগুলোকে রাজনীতিতে পুণর্বাসন করেন জিয়া – সে জিয়ার জন্য দুঃখবোধ না করলেও মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার জিয়ার মৃত্যুতে ব্যথিত হন আকাদ্দস ভাই। মুক্তিযুদ্ধের আরেক সেনানায়কের হাতেই যখন তাকে অসহায় প্রাণ দিতে হয় – তখন সে ব্যথার রূপ আরো প্রকট হয়। বললেন, হত্যার রাজনীতি একটি দেশে শুরু হলে তা চলতেই থাকে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে তো এমনটা হবার কথা ছিল না। বাঙালি সেনা অফিসারদের রয়েছে নিকট অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা। পাকিস্তানের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ফল বাঙালি অফিসাররা তো প্রত্যক্ষ করেছে। তা থেকে শিক্ষা না নিয়ে বরং একই পথ ধরে তারাও চলতে শুরু করেছে।

অসহায় এক মুক্তিযোদ্ধা লেখকের এই দীর্ঘশ্বাসভরা উক্তিটি আমি আজো ভুলে যাইনি। জিয়ার মৃত্যুতে সাহিত্য সম্মেলনটি পিছিয়ে যায় প্রায় একবছর। অনুষ্ঠিত হয় বিরাশি সালে। সেদিন আকাদ্দস ভাই যে কথাটি বলেছিলেন, তা আমাকে এখনো ভাবায়। তিনি বলেছিলেন, আমাদের উচিত হয়নি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে নিয়ে নেওয়া।এটি একটি বড় ভুল। যারা একবার যুদ্ধ করে ফেলে অর্থাৎ যাদের অস্ত্র থেকে গুলি একবার বের হয়ে যায়, তাদের মধ্যে আর শৃঙ্খলা থাকে না। আমাদের উচিত ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আলাদা বাহিনী গঠন করা।

কি বলছেন আকাদ্দস ভাই! আমাকে চমকে দিয়ে বললেন, দ্যাখো, এখন পর্যন্ত যারা ক্যু কিংবা পাল্টা ক্যু তে মারা গেছে, তাদের সবাই মুক্তিযোদ্ধা। পঁচাত্তরের আগস্টে জাতির জনক মারা গেলেন। তিনি ছিলেন বাংলার স্থপতি। তাকে যারা মারলো, তারা মুক্তিযোদ্ধা।নভেম্বরের কাউন্টার ক্যু তে প্রাণ দিলেন খালেদ মোশাররফ। এরপর ফাঁসির দড়িতে ঝুললেন কর্ণেল তাহের। এখন গেলেন জিয়া। তাকে মারলো মঞ্জুর। ওরা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা। শুধু মুক্তিযোদ্ধাই নন, একেকজন সেক্টর কমান্ডার। বলো এ পর্যন্ত পাকিস্তান ফেরত কোনো সেনা অফিসার মারা গেছে? একটাও না।

আমার চমক লাগলো। হ্যা তাই তো! উদাস চোখের এই দূরদর্শী মানুষটি যেন এক ভবিষ্যতবক্তা। বললেন, দ্যাখো, মুক্তিযোদ্ধাদের আরো গর্দিশ রয়েছে সামনে। জিয়া হত্যার বিচারে যারা দোষী সাব্যস্ত হয়ে চরম দণ্ডে দণ্ডিত হবেন, তারা আর কেউ নন, মুক্তিযোদ্ধাই। এটি একটি পাতানো খেলা। ঠাণ্ডা মাথায় মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীবিরোধীরা মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের দিয়ে এই নিষ্ঠুর খেলা খেলিয়ে নিচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মাথা গরম। উচ্চাভিলাষ তাদের পেয়ে বসেছে।

আকাদ্দস ভাইয়ের এই ভবিষ্যতবাণী শুনে আমি তো রীতিমতো হতবাক। সত্যিই তো! কী গভীর দূরদৃষ্টি থাকলে তা বলে দেওয়া যায়। যেন তিনি এক ধ্যানমৌন ঋষি। যেন জিয়া হত্যার পর জেনারেল মঞ্জুরের সকরুণ পরিণতি এবং পরবর্তীতে জিয়া হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছেন। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, তিনি যেন ব্যাঘ্রের মুখে ক্ষত-বিক্ষত এক নিরীহ শাবকের অসহায় জননী হরিণ। দূরে তাকিয়ে আছেন। যেনবা নির্বাক তাকিয়ে দেখছেন, একদিন যারা দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে লড়াই করেছেন – তাদের করুণ পরিণতি।

নুরুজ্জামান মনি:কবি, কথাসাহিত্যিক