সোমবার, ২৭ জুন ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
https://blu-ray.world/ download movies
সর্বশেষ সংবাদ
যুক্তরাজ্যে ঈদের ছুটির দাবীতে  আলতাব আলী পার্কে সমাবেশ অনুষ্ঠিত  » «   পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে স্পেনে দূতাবাসের বিশেষ আয়োজন  » «   পদ্মা সেতুর স্মারক নোট বাজারে আসবে রবিবার  » «   পদ্মা সেতুর জন্য অভিনন্দন বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধির  » «   অদম্য বাংলাদেশ, খুলল পদ্মার দ্বার  » «   আছে শুধু ভালোবাসা, দিয়ে গেলাম তাই: প্রধানমন্ত্রী  » «   রেমিটেন্স প্রেরণে উদ্বুদ্ধকরণে মাদ্রিদে মতবিনিময় সভা’ অনুষ্ঠিত  » «   বিশ্বনাথে মায়ের কোল থেকে ভেসে গেল শিশু, ৫ জনের মৃত্যু  » «   লন্ডনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ইউকের বিশ বছরপূর্তি উদযাপন  » «   মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবাদ এবং সাধারণ জনগণ  » «   স্পেনে ঢাকা ফ্রুতাস (Frutas) এর ১৬ বছর পূর্তি উৎসব অনুষ্ঠিত  » «   সিলেটে বন্যা : বৃষ্টি হয়েছে নদ-নদীর পানি কমেছে  » «   সিলেটে রানওয়েতে বন্যার পানি, বন্ধ বিমানের ফ্লাইট  » «   যুক্তরাজ্যে ঈদে ছুটির দাবীতে আলতাব আলী পার্কে সমাবেশ ২২শে জুন  » «   বিয়ানীবাজারে বিদ্রোহী প্রার্থী ও গোলাপগন্জে নৌকা বিজয়ী  » «  
সাবস্ক্রাইব করুন
পেইজে লাইক দিন


ডিজনি ওয়ার্ল্ড: ফ্লোরিডায় স্বপ্নীল বিশ্ব



সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সময়টা ছিলো ২০১৪ সালের গ্রীস্মকাল। এর তিন বছর আগেও আমেরিকা গেছি। ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্টে একে একে নিজেদের ইমিগ্রেশন শেষ করছি তখন কোনপ্রকার  হ্যাসল বা ঝামেলা ছাড়াই। সেসময় শংকিত ছিলাম, কারণ জেনেছি আমেরিকার ইমিগ্রেশন অভিজ্ঞতা অনেকেরই সুখকর নয়। কিন্তু গেলোবার কেন জানি কিছুই হয়নি। না ম্যানচেস্টারে, না জন এফ কেনেডী এয়ারপোর্টে। এবারেও স্বাভাবিকভাবে আমি আরো কনফিডেন্স। আমাদের পাঁচজনের পরিবারসহ আরো ৯ জন একসাথে যাত্রী হয়েছি ফ্লোরিডা। প্রভা-আরীবা-লিয়ানার সাথে তাদের মা হেলেন এবং আরও নয়জন সহ আমাদের পরিবারের চৌদ্দজনের মোটামোটি এক বিশাল বহর। ভার্জিন আটলান্টিকের টিকেট আমাদের। স্বাভাবিকভাবেই এই এয়ারলাইন্সের মাধ্যমেই ইমেগ্রেশন,লাগেজ চেকিং সবকিছুই গেলো ঠিকঠাক। হঠাৎ করে আমার জন্যে ইমিগ্রেশন অফিসার কিছুটা হলেও ধীর গতি হয়ে গেলেন। মুখায়বে সামান্য পরিবর্তন এনে মহিলা বললেন, কিছু না, আমেরিকা থেকে এই নামটার জন্যে শুধুমাত্র একটা ক্লিয়ারেন্স আসছে। হয়ে যাবে দু-তিন মিনিটের মধ্যেই। আমার বুঝতে আর বাকী থাকলো না,কেন-ইবা এই ক্লিয়ারেন্স। তবুও কিছু বলি না।

ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্ট হিথ্রোর পরেই সিকিউরিটি চেকের জন্যে সুখ্যাতি আছে। তাছাড়া আমেরিকার ক্লিয়ারেন্স, কোন অত্যুক্তি করলে পাছে আবার যদি তেরোজন মানুষের জন্যে আমি একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াই । সেজন্যে আর কিছু বলছি না। শুধুমাত্র হালকা একটা আওয়াজ দিলাম-নামের প্রথমে মোহাম্মদ এবং শেষে আহমদ এই কি ক্লিয়ারেন্সের কারণ। বিনয়ী মহিলাটি শুধু হাসলেন, যা বোঝানোর তা বুঝিয়ে দিলেন। অবশ্য পরক্ষণেই বললেন -‘দু:খিত দেরী হবার জন্যে । সবকিছু ঠিক আছে। যেতে পারেন।’

এখানেইতো শেষ হবার কথা । দ্বিতীয় ধাপ শেষে তৃতীয় চেকিং এর সময় একে একে সবাই চলে গেলেন আমার গ্রুপের। সেই আমি-একজন এসে বললো, একটা স্পেশাল নিরাপত্তা চেক লাগাবে। আমাকে ব্যালান্স করার জন্যে আরেকজন শেতাঙ্গ মানুষকেও সাথে নিলো সেই একই বিশেষ সিকিউরিটি চেকিংএ। কিছুই না। শরীরের চারদিকে বৃত্তাকারে বিশেষ যন্ত্রের ঘোরাঘোরি এবং এক মিনিটের দাঁড় করানো, তারপর সবার সাথে আবারও যোগ দিলাম। হাঁটতে থাকলাম আমরা সবাই আবারো। চেকিং এর শেষ নেই। হ্যান্ডব্যগে এমনিতেই কিছু আমরা বহন করছি না। কারণ সবকিছুতেই একটা নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা। এমনকি পানিও নেয়া নিষিদ্ধ। পারফিউম কিংবা শ্যাম্পু প্রভৃতি বহন করতে হলেও ১০০ মিলিলিটারের নীচে নিয়ে যেতে হবে। এগুলো নতুন কোন নিয়ম না যদিও,তবুও অনেক যাত্রীই নিয়ে আসেন এসব এবং শেষপর্যন্ত ফেলে যেতে হয় বিমানবন্দরের নির্ধারিত জায়গায়ই। কিন্তু বিধি বাম। সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেজন্যেই হয়ত বেল্টে রাখা বেল্ট,মানি ব্যাগ, মোবাইল প্রভৃতি আসলেও আরিভার আইপ্যাড একটা কার্ডিগান এবং তারই একটা ছোট্ট হ্যান্ডব্যাগটা বেল্টের নিয়ন্ত্রিত জায়গাটিতেই চলে যায়। তারপর আবারও ব্যাগ দেখা, আইপ্যাড উল্টানো-পাল্টানো এবং মিনিটের মধ্যেই ক্লিয়ারেন্স। সুতরাং মন ভেঙ্গে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। আপাতত রণে ভঙ্গ দিয়ে মোটামোটি চেকিং এর পালা শেষ করে এগুতে থাকি। স্যান্ডুচ কিনি, বাচ্চাদের ড্রিংক তিনগুন দাম দিয়ে সবকিছু কিনে আবার এগুতে থাকি । ওয়েটিং এ অপেক্ষার পালা।

এর আগে ডেলটা এয়ারলাইন্সে হয়েছে আমাদের আমেরিকা ভ্রমণ। সে অভিজ্ঞতাটা আমাদের ভালো নয়। কাস্টমার সার্ভিস বলতে যা বোঝায়, তার কিছুই সেখানেই নেই। এবং সে হিসেবে আমেরিকার ভ্রমণের সময় খুব একটা সার্ভিস পাবো তা অবশ্য আর মাথায়ও নেই। তাছাড়া একধরণের আতংক কাজ করেছিলো ফ্লোরিডায় নামার পর, আবার কি কোন বিশেষ চেকআপ অপেক্ষা করে আমার জন্যে। সেজন্যে কিছুটা অস্বস্থিও লাগছে। কিন্তু না, বিমানে উঠার পর মনে হলো সব কিছু পাল্টে যাচ্ছে। মনে হলো ভার্জিন আটলান্টিক বলতে গেলে সম্পূর্ণ বিপরীত। সবসময় একটা হাসি যেন লেগেই আছে বিমানবালাদের, সেটা কৃত্রিম হতেই পারে। তা শতভাগ না হলেও জবের জন্যে একদম খাঁটি।

ম্যানচেস্টারের বাসা থেকে বেরুচ্ছি যখন, তখন চশমার গায়ে এসে পড়ছে দু এক ফোটা বৃষ্টি কনা। ধারণায় ছিলো মেঘে ঢাকা থাকবে আকাশ। কিন্তু যখন ফ্লাইট ছাড়লো ব্রিটেনের আকাশটা তখন একদম সাদা না হলেও ছিলো বৃষ্টিহীন। রোদ উকিঝুকি মারছে একটু পরপর। মনে হলো প্রসন্ন যাত্রা। যাচ্ছি আমরা ফ্লোরিডা। ভার্জিন আটলান্টিক ল্যান্ড করবে ওরলান্ডো এয়ারপোর্টে। ওরালান্ডো হলে ফ্লোরিডার এক প্রধান শহর। ফ্লোরিডা শহরের কেন্দ্রস্থলে যার অবস্থান। । উড়োজাহাজ যাচ্ছে সেদিকেই। দ্রুত আরও দ্রুত চলছে জাহাজটি। কখনো হয়ত নীল আকাশ, কখনোবা মেঘ ঢাকা আকাশ,একমনকি বিমানটাও যেন মাঝে মাঝে ঢেকে যাচ্ছে ঘন মেঘের আড়ালে। আবার কখনো হয়ত মেঘ ছিড়ে ছিড়ে যাচ্ছে বিমান,ঢুকে যাচ্ছে মেঘের ভেতরেই। সৈয়দ মুজতবা আলী‘র সাদা মেঘগুলোতে মনে হয় কেউ ঝাপ দিলেও আটকে যাবে, ভাসতে থাকবে মেঘের ভেলায়। সেজন্যে যখনই আকাশ প্রতিকুলে যাচ্ছে বিমানের ঝাকুনি তখন বাড়ে। স্বচ্ছ শূন্যতায় তখন বুকে বিদ্ধ হয় অদৃশ্য পিন। এমনিতেই ঘুম আসেনা আমার বিমানে কিংবা এমনকি লং যাত্রার কোচ এ। তাছাড়া এর কিছুদিন আগে মালোয়েশিয়ার বিমান নিখোঁজ, ইউক্রেনের বিমান বিধ্বস্থ প্রভৃতি বারে বারে আমাকে শংকিত করে তুলছে। মনে হয়, কিউবার রাষ্ট্রনায়ক ফিদেল ক্যষ্ট্রোর মতো ফ্লাইট ইনজিনিয়ারকে বলি, কেন জাহাজ হঠাৎ করে কেঁপে উঠে ? কি অবস্থায় দুর্যোগে পড়ে একটা বিমান। প্রশ্নবাণে  উদ্বেগ কাটিয়ে উঠি। ভয় আর উদ্বেগ কাটাতে একথাগুলো বলার ইচ্ছে হয়, কিন্তু আমিতো এক সাধারণ মানুষ, এ কথার উত্তর কে দেবে আমাকে। আমি কোন নাস্তিক নই কিংবা খুব ধর্মপ্রাণ মানুষও নই, তবুও এসময়গুলোতে আল্লাহকে ডেকেছি বার বার। এই-ই আমাদের বাস্তবতা। জীবন সংকটে আমরা বড় বেশী অসহায় হয়ে পড়ি। তখন আমরা সেই যেন পেছনের দিকেই ফিরে তাকাই। আমাদের অন্তত আমার বংশপরম্পরায় পাওয়া সেই ধর্মীয় ডাককেই সম্বল করে পাড়ি দিতে থাকি নয় ঘণ্টার নিরন্তর জার্নি। কি অদ্ভুদ বৈপরীত্ব । নিজেকে হালকা করে তুলতে ছবি দেখি ‘গুন্ডে’।ছবিটায় খুঁজতে থাকি বাংলাদেশকে নিয়ে কটাক্ষ। কিন্তু যে ভাব নিয়ে আমাদের গণমাধ্যম দাঁড়িয়েছিলো গুণ্ডে‘র বিপরীতে এত বড় কিছু পাইনি। আমার সীমাবদ্ধতাকে অবশ্য আমি স্বীকার করছি।

 

বিশাল ডানাগুলো নিয়ে আকাশের বিরাট হাসটি  অর্থাৎ ভার্জিন আটলান্টিকের বিমানটি নামে ওরলান্ডো এয়ারপোর্ট এ । একটা দারুণ অনুভূতি আমাকে ধাক্কা দেয়। সুন্দর সকাল। রানওয়েতে গতি মন্থর হতে থাকে। বিমান থেকেই দেখা যায় ঘাসগুলোতে শিশির। সামান্য আগে হয়ত বৃষ্টি হয়েছে। একটা নালায় স্থির স্বচ্ছ পানি। অন্য একটা খাল থেকে গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টির পানি। দূরে গাছগাছালির আহবান। যেদিকে তাকাই যেন ছিমছাম একটা সবুজ চারদিক। আমার ভাবনায় একটা ছেদ পড়লো। এর আগে জেনেছি ৯৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস । অতএব প্রচন্ড গরম। কিন্তু আপাত যেন তা নয়। এয়ারপোর্টে নেমে ধুরু ধুরু বুক নিয়ে আগাই। ১৪ জনের বহরে মূলত আমরা চারটি পরিবার। তিনটা গ্রুপে তিনটা লাইনে দাঁড়াই। প্রভা আরিভা আর তাদের মা লিয়ানাকে কোলে নিয়ে অফিসারের সামনে দাড়ায়। হাসি নেই। কিন্তু তারপর কেন জানি শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় কাজ যেমন ছবি তোলা, ফিঙ্গার প্রিন্ট আমাদের দুজনের (প্রাপ্ত বয়স্ক) তারপর যাচ্ছ কোথায় এই প্রশ্নের পরই স্ট্যাম্পটা মেরেই হাসিমুখে বলে উঠে ‘হ্যাভ এ নাইস হলিডে। ‘থ্যান্ক ইউ’ বলে বেরিয়ে আসি আমরাও হাসিমুখে। আমিতো অবাক। নিমিষেই কেটে যায় দশ ঘন্টা আগের ম্যানচেস্টা এয়ারপোর্র্টের উদ্বেগ।

এয়ারপোর্টে নেমে সরাসরি লাগেজ পাবার কোন সুযোগ নেই । নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের উঠতে হলো একটা ট্রেনে। মাত্র দু-তিন মিনিটের ট্রেন জার্নি। ভালেই লাগলো । তারপর নেমে দেখি অপেক্ষায় শাহেদ,জেনী তাদের দু’মেয়ে সারিয়া আর সাব্রিয়া। উষ্ণতায় জড়িয়ে ধরে তারা এক অপরকে । শুধু বোনদের ছড়াছড়ি। সারিয়া-সাব্রিয়া,নিশাত-নওরিন, প্রভা-আরিভা-লিয়ানা আমাদের তিন ভায়রা ভাই কিংবা তিন বোনের ঐ সাতটা মেয়ে যেন ভাসতে থাকলো আনন্দের এক নির্মল জগতে, এয়ারপোর্টের মধ্যেই। আর আমরা শাহেদের সাথে হাঁটতে থাকি লাগেজগুলো পেতে। অপেক্ষা করি বেল্টের ঘূর্ণনের।

জেনী ,আমার স্ত্রী হেলেনের  একদম ছোটবোন আর জেনীর স্বামী শাহেদ আমরা একই থানার অর্থাৎ বিয়ানীবাজারের মানুষ। তারা দুজন নিউইয়র্কের সফটওয়ার ডেভোলাপার ব্যবসায়ী ‘এসজে ইনোভেশন‘ নামের একটা কেম্পানী তাদের নিয়ে এসেছে সাফল্যের এই একটি প্রান্তে। একজন ম্যানচেস্টারে গ্রাজুয়েট, অন্যজন নিউইয়র্কের। দুজনই পড়াশুনা করেছেন কম্পিউটার নিয়ে। তারুণ্যেই তারা সফলতার একটা প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। কম সময়ে নিউইয়র্কের মতো জায়গায় নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থান এত শক্ত করেছে যে, তা রীতিমত বিস্ময়ের। এর বেশী আমাকে লিখতে নিষেধ করেছে, সেজন্যে ডিটেইলসএ আর যাচ্ছি না।

যদিও এর আগে গত বছর তাদেরকে নিয়ে প্রথম আলোয় একটা রিপোর্ট করেছেন হাসান ফেরদৌাস, কালের কন্ঠ কিংবা তাঁর নিজস্ব এলাকায় স্থানীয় পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে হয়েছে প্রতিবেদন। ফ্লোরিডা দেখানোটা মূলত তাদেরই আইডিয়া। তারা এর আগেও সেখানে গিয়েছে তাদের মেয়েগুলো নিয়ে। এবারে মূলত জেনীর বোনদের মেয়েগুলোকে অর্থাৎ আমাদের তিন মেয়েসহ তার বড় বোনের দু‘মেয়েদের নিয়ে মূলত ডিজনির পৃথিবী দেখাতে জেনী-শাহেদের এ প্রয়াস। চৌদ্দজনের চৌদ্দটি লাগেজ নিয়ে ঢাকার মতো কোন এক বড় ট্রলিচালক হাঁটতে থাকেন আমাদের আগে আগে। আরও পাঁচ মিনিটের পথ। কারপার্কে এসে তো আমি অবাক। একদম লেটেস্ট মডেলের দুটো ঢাউশ সাইজ জীপ তারা ভাড়া করেছে। দশ দিনের জন্যে। লাগেজ উঠিয়ে তারপর যাত্রা শুরু। ওরলান্ডো এয়ারপোর্ট থেকে বের হয় আমাদের গাড়ী। প্রচন্ড গরম হলেও গাড়ীর ভেতরে হয়ত তা আঁচ করা যায় না। গাড়ী চলতে থাকে। সামনে বসে আছেন আলমগীর ভাই। বলে উঠেন দেশে আসলাম না-কি। এসময় ফেইসবুকে একটা ম্যাসেজ আসে আমার এক ভাইয়ের, ট্যানেসী থেকে লিখেছে ‘ওয়েলকাম টু বাংলাদেশ’। সত্যিই তো। দুদিকে জঙ্গল,দূরে বন-সবুজের সমারোহ। দেখে মনে হয় ঝোপ-জঙ্গলের আড়ালে হয়ত লুকিয়ে আছে আমাদের সেই স্বপ্নের গ্রাম। তবে না। প্রশস্থ রাস্তা। সারি সারি গাড়ি। কোন ট্র্যাফিক-জ্যাম নেই, রিক্সা নেই এমনকি হাঁটতে দেখিছি না কোন মানুষকেও। প্রতিটি গাড়ির দিকে তাকাই। লেইটেস্ট মডেলের প্রায় প্রত্যেকটি গাড়িই যেন মনে হয় রেন্ট নিয়ে চালাচ্ছে মানুষ। গাড়ি দেখলেই বুঝতে অসুবিধা হয়না এ যে এক টুরিষ্টদের শহর।  ম্যানচেষ্টারে বেড়ে উঠা জেনী ফ্লোরিডায় মাইলের পর মাইল প্রায় এক ঘন্টা ড্রাইভ করে । আমাদের গাড়ীচালক শাহেদ-প্রায় ঘন্টা দেড়েক ড্রাইভ করার পর আমরা আসি আমাদের ভিলেজে ‘কিসিমি’ যার নাম। আমাদের নির্ধারিত জায়গায়। এমির‌্যাল্ড আইল্যান্ড ।

বিশাল একটা গেইটের কাছে গাড়ী থামে, তারপর নিয়মিত স্যিকিউরিটি চেক করে দুটো গাড়ীর নাম্বার তাদের পরিচয় সবকিছু লিখে রেখে দ্বার উন্মোক্ত করা হয়। গাড়ী দুটো আবার চলতে থাকে। দুদিকে রিসোর্ট। মূলত হলিডে হোম। ছবির মতো মনে হয়। আমি ব্রিটেনে এরকম রিসোর্ট হোম দেখিনি। ছিমছাম। একটা বিরাট বাড়ীর সামনে ড্রাইভওয়েতে গাড়ী দুটো পার্ক করে তারা। আমার তো চক্ষু চড়ক গাছ। একটা বিরাট ডিটাচট হাউস। দুটো ডাইনিং একটা কিচেন আট বেডরুম, সাতটা বাথরুম, একটা গেমরুম, বাসার সাথেই বাইরে সুইমংপুল, রেলিং দিয়ে আলগা করে রাখা। সুইমিং পুল পাশাপাশি জিকুজি সব মিলে এ রাজষিক ব্যাপার । ব্রিটেনের ব্যস্ত গত একটা বছরে কোথাও বেড়িয়ে আসার কোন ফুসরতই পাইনি আমরা। যেন হাফ ছেড়ে বাঁচা। আমার মেঝো মেয়েটা যেন ডিজনিওয়ার্ল্ড খুঁজে পায় সুইমিং পুলেই। বিকেলের পড়ন্ত রোদের সাথে সে-ও সুইমিং পুলে ঝাপ দেয় আর সাঁতরাতে থাকে। যেন কতদিন পর ডাঙ্গার রাজহাঁস পানি পেয়েছে ।

 

আগস্টের প্রথম দিনটাতে সকাল ১০টায় বেরিয়েছিলাম ম্যানচেস্টারের বাসা থেকে। ফ্লোরিডায় রিসোর্টে গিয়ে পৌছতে পৌছতে অন্তত তেরো ঘন্টার দীর্ঘ ক্লান্ত শরীর। রিসোর্টে রান্না-বান্নার আয়োজন নিজেদের। এর আগের দিন জেনী-শাহেদ ফ্লেরিডায় আসায় খাবারের আয়োজনটা নিজের বাড়ীর মতোই করে রেখেছে তারা। তাছাড়া যেহেতু ম্যানেচষ্টোর থেকে জয়েন্ট হয়েছেন জেনীর আরও তিন বোন। সব মিলে হলিডে হলেও যে খাবারের জন্যে শুধুমাত্র ম্যাকডোনাল্ড কিংবা পিজজা কিংবা ফাস্ট ফুডের উপর নির্ভর করতে হবে না, তা প্রথমেই বোঝে নিতে পারি আমরা। চার বোনের ক্লান্তিহীন আড্ডার মাঝে রান্না হয়ে যাবে ভালো ভালো খাবার, তা আঁচ করতে পেরেছে সবাই। অবশ্য এরই মাঝে তারা জানিয়ে দিয়েছে বাঙালীদের রেষ্টুরেন্টও আছে, যা আমরা চালাই ব্রিটেনে ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্ট হিসেবে। সুতরাং দেশীয় ঘরানার খাবার এমনকি হালাল খাবারের ব্যাপারটাও নিশ্চিত হয়ে যায় সবাই।

 

২ আগস্ট মূলত কিছুই হয়নি। বেরিয়ে যাওয়া হয়নি কোন থীম পার্কের উদ্দেশ্যে। তবুও বিকেল যখন অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে, আমাদের রিসোর্টে পাশের বাড়িগুলোর অনেকগুলোতেই আলো জ্বলছে না। এক অদ্ভুদ নিরবতা গোটা রিসোর্ট জুড়ে। কারণ কেউ নেই হয়ত। ভ্রমন বিলাসী মানুষগুলো এখানে এসেছ, বসে থাকার জন্যেতো নয়। তারা বেরিয়ে গেছে কোথাও না কোথাও। এখানে যাবার জায়গার শেষ নেই। অন্তত বাচ্চাদের নিয়ে যাবার জায়গা এখানে যেন চারদিকেই। সেকারনেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই আমরা বেরিয়ে পড়ি। শাহেদ আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, বিমান-ভ্রমণে ক্লান্তি কাটাতে আর কোথাও বের হওয়া যাবে না। তবুও শাহেদই আমাদের নিয়ে বেরিয়ে যায়। ডাউন-টাউন ডিজনীর উদ্দেশ্যে। যত এগুতে থাকি, ততই মনে হয় যেন জেগে উঠছে শহর। প্রায় আধা ঘন্টা গাড়ি ড্রাইভের পর ক্রমেই গাড়ির গতি মন্থর হতে থাকে। জ্যাম লেগে যাচ্ছে সব জায়গায়। অন্তত ৪৫ মিনিটের ড্রাইভের পর দেখি রাস্তায় মানুষের মিছিল। মূলত অধিকাংশই শিশু-কিশোর আর কিশোরী। শত সহস্র গাড়ি পার্কিং এর জায়গা আছে, তবুও যেন কোথাও কোন ঠাঁই নেই। দু‘একবার ঘুরতে থাকেন আমাদের শাহেদ, তারপর এক জায়গায় এসে ডানে মোড়। এবং অবশেষে পার্কিং। প্রশস্ত রাস্তা। দুই দিকে দিয়ে অন্তত আটটা গাড়ি একসাথে যাচ্ছে কিংবা আসছে।  ট্রাফিক লাইটে পার হতে গিয়েও যেন জ্যাম । গন্তব্য সবার ডাউন-টাউন ডিজনী। ঘড়িতে সময় তখন সাড়ে নটা। এ জায়গাটি বন্ধ হয়ে যাবে এগারোটায়। কিন্তু মানুষ যতজন বেরুচ্ছে, মনে হয় ততজনই যেন ঢুকছে। আমরা যাচ্ছি। বামদিকে একটা দোকান। ঢুকি। খেলনা, টিশার্ট প্রভৃতি দিয়ে সাজানো । বেরিয়ে যাই। সামনে আগাতে থাকি। হাঁটছে মানুষ। ডিজনীর থীম। আগুন বেরুচ্ছে কোন দৈত্যের মুখ থেকে। গান বাজছে জোরে। আরিভা যেন হাটতে হাটতে ঘুমুচ্ছে। বড্ড ক্লান্ত হয়ে আছে সে। নিশাত নওরীন প্রভা যেন চোখে দেখছে স্বপ্নীল এক জগৎ। লেকের ধারে বসি আমরা। ঝরছে ঘাম। আইসক্রিম খাচ্ছে সবাই। মেয়েগুলোর সাথে আমরাও। আইসক্রিম-ই মেল্ট হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। দূরে চেয়ে দেখি বিশাল দৈত্যের চোখ থেকে ঝরছে অশ্রুরধারা। অর্থাৎ লাল রং এর যেন দৈত্যের এক স্ট্যেচু। স্ট্যেচুর চোখ থেকে ঝরছে পানির ধারা। মেয়েগুলো বিস্ময়ে বিষ্ফোরিত করে চোখ। হাটতে থাকে দৈত্যের অশ্রু দেখতে। মাঝপথে ঢুকি একটা দোকানে। লতা-পাতা দিয়ে জঙ্গলের একটা আবহ সৃষ্টি করা হয়েছে। গর্জন করছে কোন জন্তু। গাছের পাতা, পাখির কিচির-মিচির, কিংবা অজানা কোন পশুর কল্পনীয় মায়াময় চেহারার দিকে আগায় আমাদের মেয়েগুলো। বাদুরের ডানা ঝাপটানো কিংবা কৃত্রিম ভাবে বসে থাকা কোন সবুজ সাপ।ছবি তুলি আমরা সবাই। কোথায়, কখন যে ১১টা ছুঁই ছুঁই করে ঘড়ির কাটায়, বুঝেই উঠতে পারিনি আমরা। অতএব  ঘরে ফেরার পালা। অথচ দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া, তাই ফিরে আসতে হবে আবারও ডাউন টাউন ডিজনীতে, আগামী নয়দিনের যে কোন এক সময়।

ইউনিভার্সাল স্টুডিও : ৩ আগষ্ট আমাদের প্রথম দেখার পালা এই ষ্টুডিও। বিশ্বখ্যাত লেখক জে কে রাউলিং এর দুনিয়াজোড়া বহুল পরিচিত এবং প্রচারিত কিংবা বিক্রিত বই হ্যারিপটারের থীম দিয়ে তৈরী। শুধু কি বই, এমনকি ফিল্মি দুনিয়ায় এক বিশাল ব্যবসা সফল এই হ্যারি পটারের থীম দিয়ে সাজানো হয়েছে ইউনিভর্সাল ষ্টুডিও‘র একটা অংশ। হ্যারী পটারের লেখিকা পৃথিবীর সম্ভবত একমাত্র লেখক কিংবা লেখিকা যিনি শূন্য থেকে বিলিয়নার হয়েছেন এই সিরিজ দিয়ে। সিঙ্গল মাতা হিসেবে যিনি ব্রিটিশ সরকারের অনুদানের উপর নির্ভরশীল ছিলেন,সেই রাউলিং পৃথিবীর সেরা একশত ধনীদের একজন হতে পেরেছিলেন শুধুমাত্র তার বই বিক্রি করেই। আমি নিশ্চিত ফ্লোরিডায় এই ইউনিভার্সাল ষ্টুডিও তৈরীতে রাউলিংকে হয়ত দিতে হয়েছে আরও মিলিয়ন পাউন্ড, শুধুমাত্র তার থীম বা বই‘র ধারণাকে এখানে জীবন্ত করে তুলতে। এই থীমেও যে আছে ব্যবসা। পৃথিবীর অগণিত শিশু-কিশোর কিংবা কিশোরী আর যুবক-মধ্যবয়সীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে অর্থাৎ কর্পোরেট বিশ্বের একটা বড় ধরণের বাজার কিংবা পণ্যের স্থান তৈরীতে তার থীম যে কত জনপ্রিয় হয়েছে, তা না দেখলে বিশ্বাসই করা যায়না।

 

আমরা যখন এই ষ্টুডিওতে ঢুকি, তখন চড়চড়ে রোদ। হাঁটছি আমরা হ্যারী পটার গ্রন্থের স্বপ্নিল একটা গ্রামের দিকে ‘হগস্মিড’। যেখানে বরফে ঢেকে আছে পশ্চিমের বাড়িগুলো। আমরা হাটছি ৯৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায়, অথচ দেখছি  দুধসাদা বরফ ঢাকা সাদা ছাউনি। অদ্ভুদ নির্মাণ। মনে হয় এইমাত্র মাইনাস আবহাওয়ায় সারা গ্রাম ডুবে আছে বরফের মাঝে। আইসক্রিম খাচ্ছে মানুষ। একের পর এক পানির বোতল শেষ হচ্ছে আমাদের। আরিভা সাথে নেই। নিশাত এবার ইংলিশ সাহিত্যে লেস্টার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হচ্ছে। সে প্রায় সব কটা হ্যারি পটার ইতিমধ্যে শেষ করে নিয়েছে। তার গল্প বলার ভঙ্গিটা দারুন। প্রভা নওরীন ইয়ার নাইনে পড়ে। নিশাতের গল্পে বিমোহিত। প্রভা, নওরিন, নিশাত ছুটছে,সামনে জীবন্ত হ্যারিপটার,তার কিংবা তাদের চোখে বিস্ময়। সাথে আমরাও । একটা আস্ত গ্রাম তারা দেখবে বলে। যেখানে আছে একটা স্কুল ‘হগসওয়াটস্’। হ্যারী পটারের সেই কিশোর যেখানে সে যাদুর মন্ত্র শিখেছে। পেয়েছে অসংখ্য যাদুর কাঠি তার যাদুর মন্ত্র নিতে ঢোকে পড়ে সেই স্কুলে। অন্ধকার একটা কক্ষে ঠাসাঠাসি মানুষ। প্রতি দশজন দশজন করে ঢুকছে। যাদুকরের পোষাক পরে কাঠি হাতে দাড়িয়ে সাতফুট লম্বা পুরুষ(উইজারড)। তাকে সহযোগিতায় দাঁড়িয়ে আছে আরেক তরুনী। বাতি জ্বলে উঠে। বিদ্যুৎ খেলে যায় ঘরময়। যাদুর আবহ সৃষ্ঠি হয়। ওয়েলকাম বলে একটু ঘুরে দাড়ায় যাদুকর। তারপর দর্শকদের থেকে এক মেয়েকে নিয়ে সারি সারি যাদুর দন্ড থেকে একটি নিতে বলে। মেয়েটি যেন স্বপ্নের দেখা পায়। মুহূর্তেই হয়ে যায় হ্যারী পটারের সেই কিশোর কিংবা কোন বালিকা। যাদুকর যাদুর কাঠিটি দিয়ে উপরের দিক থেকে ঘুরিয়ে আনে, অপূর্ব সম্মোহন লাগে ঘরময়। ঘরের একটা কোণে বাতি জ্বলে আধো আলোয় দেখা যায় একটা কাঠ ভেঙ্গে শব্দ হয় ‘মড়াৎ’। কিশোর কিশোরীরা যেন হ্যারি পটারের স্কুলের যাদু দেখে। বালিকা মন নিমিষেই যেন একেকটা কাঠির জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠে। এমনি সময় বাতি জ্বলে উঠে। ঘরময় কিশোর আর কিশোরীদের উৎফুল্ল হাটাহাটি। ব্যবসায় লেগে যায় যাদুকর। নিশাত নওরীন দুটো যাদুর কাঠি কিনে ৯০ ডলার দিয়ে। আমি প্রভাকে বলি কিনবে কিছু ? অদ্ভুদ উচ্চারণ করে বলে এত দাম দিয়ে একটা কাঠি ! আমি হাসতে থাকি। মনে মনে বলি বাঁচলো অন্তত ৪৫টা ডলার।

 

তারপর আবার হাঁটতে থাকি। এখন রাইডে উঠার পালা। আগেই বলে রাখি ১১২ ডলারের একটি টিকেটের মাঝেই অন্তর্ভুক্ত হ্যারি পটারের (ইউনিভার্সাল স্টুডিও) সকল রাইড। অর্থাৎ যে কোন কিছুতে আর কোন অর্থ পরিশোধ করতে হয় না। হগসওয়াটস ম্যাজিক স্কুলেরই ভেতরেই ‘সিমুলেইটার’। এ রাইডের নামটি জেনেই প্রভা নওরীন নিশাত এবং তাদের মামী ব্রিটেনে বেড়ে ওঠা এবং মেডিকেল সাইন্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করা চাকুরীজীবী তরুনীও দেয় ছোট। সাথে সাথে আমরাও। লম্বা লাইন। স্ক্রীনে দেখলাম লাইনে দাড়াতে হবে ৪৫ মিনিট। তবুও নীচ থেকে উপরে উঠতে হবে। যেন একটা টিলার উপর একটা ক্যাসল এবং এই ক্যাসেলের ভেতরেই সিমুলেইটার। হাটছি আর দেখছি হ্যারী পটারের নানা চরিত্র। জায়গায় জায়গায় রাখা আছে ঐসব পর্দা। অন্ধকারে ভুতুড়ে অবস্থায় ম্যাজিকের কারসাজি। ফোরডি’তে (4D)সিনেমার খন্ড খন্ড অংশ। এসব দেখতে দেখতেই আমরা এসে গেলাম চূড়ায়। তারপর সিমুলেইটারে। পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যেই আধো অন্ধকারে একে এক উঠতে হবে চলন্ত একটা চেয়ারে। একের পর এক চেয়ার যাচ্ছে। কোলাহল চারদিকে। উঠলাম সবাই। যার যার চেয়ারে । শুরু হলো চেয়ারের গতিময় যাত্রা। মনে হয় ১০০ মাইল গতিতে চলছে কোন গাড়ি। হেলছে-দুলছে। চারদিকে শিশু-কিশোর-কিশোরী-তরুণ-তরুনীদের চিৎকার-হাসাহাসি। আমি ভয়ার্ত বয়সী এক মানুষ। মনে হয় কোন গুহার মধ্যি দিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। হ্যারিপটারের বিশাল বহর খোঁজছে আমায়,তলোয়ার হাতে। আতংকে আমি চোখ বোজি। দেখি – হাঙ্গরের গর্জন। হাঙ্গর এগিয়ে আসে, তার জিহবা দেখায়। ফুস করে লালা ছাড়ে। পানির ছোয়ার ভিজে যায় কাপড়। টেকনলজি কোথায় নিয়ে গেছে সবকিছু। আমরাতো মূলত বসে আছি। কিন্তু টেকনলজি গতি দিয়েছে । শুধুমাত্র উপরে নিচে যাচ্ছে চেয়ার। মূলত ফোরডি’তে  (4D) কারসাজি ও-গুলো। ছবিগুলো প্রজেক্টেড, জীবন্ত। পাঁচ মিনিটের এই যাত্রা যখন থামে, আমার মনে হয় গুহার অভ্যন্তরের এক শিল্পময় আতংক থেকে আমি পৃথিবীতে এসেছি। মেয়েগুলোর চোখে বিস্ময়। চোখ ছানাবাড়া। যেহেতু ফ্রি, অতএব তাদের যেতে হবে আবারও সিমোলেইটরে। এরই মাঝে বিভিন্ন রাইডে উঠে তারা সবাই। সিমুলেইটারের ক্যাসলের নিচে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। উপরে একটা রাইডে গেছে সবাই। পেছনে একটা ষ্টেইজ। দেখলাম স্ক্রিনে ভাসছে বিকেল ৩ টায় হ্যারি পটারের উপর শো হবে। শিশু-কিশোর-কিশোরী যুবক-যুবতী-পেরেন্টস জমতে থাকলো। সময়ের আগেই সম্মুখ লোকে লোকারণ্য। সময়ের সাথে সাথেই আসেন রাজা। আসেন প্রিন্সেস। যাত্রার পালার মতো তারা বিস্ময় জাগিয়ে দর্শকদের আনন্দ দিয়ে আবারও চলে গেলো কিশোর কিশোরীর দল।

হঠাৎ করে অন্ধকারে ঢেকে যায় হ্যারিপটার ল্যান্ড, কিন্তু গরমতো থামে না। বৃষ্ঠিতে ভিজিয়ে দেয় সারা হ্যারিপটার। যে যেখানে পারে আশ্রয় নেয়। যেখানেই আশ্রয়, সেখানেই বিস্ময়। কোলাহল। নানারকমের ইতিহাস খোঁজা। হ্যারিপটার বইয়ের কিংবা ফিল্মের। যেখানে আশ্রয় নিলাম, দেখি পুরনো বাড়ি। বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় বসে আছে পেঁচা কিংবা অন্য কোন পাখি। নিচে হারিকেন জ্বলছে। একটা ভূতুড়ে অবস্থা তৈরী করা হয়েছে। যদিও মানুষের সমাগমে ভূত পালিয়েছে হয়ত সেই কবে। সুইট দোকানগুলো বিস্ময় কাড়ে মেয়েগুলোর। বার বার উচ্চারিত এই দোকনগুলোতে তারা যেন হ্যারী পটারের সুইট খাবার দৃশ্য দেখে। রাউলিং এর আরেক সৃষ্টি ‘বাটার বিয়ার’ । বইয়ে উল্লেখিত এ বিয়ারটি নন-এলকোহলিক। এই পানীয়টি পান করলে কিশোর মন উদ্বেলিত হয়ে উঠে। সতেজ হয় প্রাণ, প্রফুল্ল হয়ে উঠে হৃদয়। তাইতো ওদের বিয়ার কিনে পান করা। দেখি নওরীন যেন সত্যি সত্যিই সতেজ হয়ে উঠেছে। নিশাত প্রভাকে পান করায়। আমরাও শুধু হাসতেই থাকি। মনে মনে বলি কিভাবে হলিডে কিংবা একটা ব্রেক জীবনের সজ্ঞাটি পর্যন্ত বদলে দেয় ঐ কিশোরী আর তরুনীদের।

 

সবকিছুর ফাঁকে ফাঁকে আমরা খেয়েছি। স্যান্ডউইচ, কলা, ভিন্ন জাতের পানীয় । আমাদের ঘাড়ের ভারী ব্যাগগুলো (রুকসাক)আস্তে আস্তে হালকা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ক্ষুধার্ত নই, তবুও ক্লান্ত আমি, আর হাঁটতে ভালো লাগে না। নির্ধারিত একটা শো দেখতে আলমগীর ভাই চলে যান। আমি দাঁড়িয়ে থাকি আর দেখতে থাকি মানুষের কোলাহল। একসময় আবারও জড়ো হই সবাই। একটা কাঠের সেতু পেরুতে থাকি আমরা। এই সেতু পাড়ি দিলেই ইউনিভার্সাল স্টুডিও‘র অন্য অংশ জুরাসিক পার্ক।  রাস্তার দু-ধারে ঘন জঙ্গল। প্রশস্ত রাস্তা। বাঁশঝাড় আর গাছ-গাছালি থেকে ঝটকা বাতাসে পানি ঝরে ভিজিয়ে দিচ্ছে কাপড়। ফোটা ফোটা বৃষ্টির মাঝ দিয়ে হাঁটছি সবাই। সময় আমাদের বেশি নেই। সেই ১০টায় টা টা রোদ মাথায় নিয়ে ঢুকেছি, হ্যারী পটার ল্যান্ডেই চলে গেছে সকল সময়। ক্লান্ত সবাই। তবুও জুরাসিক পার্কের ডাইনোসরগুলো টানছে সবাইকে। নব্বই’র দশকের দুনিয়াজোড়া সাড়া জাগানো জুরাসিক পার্ক ছবিটির সেই বিস্ময় জাগানো জুরাসিক পিরিয়ডের অর্থাৎ ডাইনোসর সময়কালীন অনেক কিছু বানিয়ে রাখা হয়েছে। যে গাড়িটি ব্যবহৃত হয়েছিলো জুরাসিক পার্ক ছবি তৈরীতে, সেই আদলে নির্মিত হবহু গাড়িটি রাখা হয়েছে। জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে একটা ডাইনোসর মাথা বের করেছে। সেখানেই ছবি তুলি আমরা সবাই। তারপর আবারও হাটা। একটা বিশাল দালানে ঢুকি আমরা।  দুটো স্থরে বানিয়ে রাখা হয়েছে বিশাল বিশাল ডাইনোসর। উপরের স্তরে অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট বাচ্চা ডাইনোসরগুলো, নীচে বিশাল সব ডাইনোসর। একটা ডাইনোসোর উপরের তলায় এসে লেগেছে তার মাথা। ফিল্মের ডাইনোসরগুলোর মতোই এরা ঘাড় নাড়ায়, গর্জন করে উঠে। নিশাত নওরীন প্রভা আমি আলমগীর ভাই, সাজু ভাই, ভাবী, বাবলা ভাই, নেলী আপা, শিরীন আপা আমরা ক্যামেরায় বন্দী হই একে একে। তারপর মাইকে ঘোষনা আসে ডিম থেকে বেরোবে এখন ডাইনোসরের বাচ্চা। লোকজনের ভিড় বাড়ে। আমরাও এগিয়ে যাই। দেখি একটা জীবন্ত বাচ্চা ডিম থেকে বেরুয়। জানি না কি করে এটা হয়। উপরে উঠি আবারও। দেখি একদম উপরের তলায় ডাইনোসরের কংকাল বানিয়ে রাখা হয়েছে, তা-ও এক বিশাল আকারের। পেছনের গেইট দিয়ে বেরোই। যেন ছায়ায় ঘিরে আছে গোটা বিরাট প্রাসাদকে। লম্বা লম্বা গাছ, ছবির মতো দাঁড়িয়ে আছে।  প্রাসাদের নীচে থোকা থোকা ফুল। সিড়ি দিয়ে নীচে নামি। বিরাট দিঘীতে দেখি হাসগুলো খেলা করে।

ডিজনি ওয়ার্ল্ড-সে যেন এক বিস্ময়। মেয়েদের নিয়ে ব্রিটেনের থীম পার্কগুলোতে গিয়েছি অনেক। ব্ল্যাকপুল সি বিচ, ওয়ারিংটরন থীম পার্ক, ড্রেইটন ম্যানর, ওয়েলস এর বিভিন্ন সমুদ্র সৈকত পাশাপাশি থীম পার্ক কখনো পরিবার নিয়ে কখনো-বা আমার প্রজেক্টের শিশু-কিশোর-তরুন কিংবা এদের পেরেন্টসদের নিয়ে। শিশু-কিশোর-তরুন-তরুনীদের কোলাহলে প্রতিটি থীম পার্ক যেমন জীবন্ত হয়ে উঠে, তেমনি বড়রাও যেন এসকল থীমপার্কে এসে ক্লান্তির অবসাদ ঘটায়। কিন্তু ডিজনির থীম ! বিশেষত শিশু-কিশোর কিংবা তরুন-তরূনীদের কাছে এ এক স্বপ্নের ভ্রমণ। ১৯৭১ সালের ৭ অক্টোবর এ রিসোর্ট উদ্বোধন হবার পর থেকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী ভ্রমণ পিপাসু মানুষের আনাগোনা এই ডিজনীওয়ার্ল্ডেই হয়। আমেরীকা তথা বিশ্বের বিখ্যাত ব্যবসায়িক ম্যাগাজিন ‘ফার্বে’র মতে অন্তত ৫২.৫ মিলিয়ন দর্শনার্থী প্রতিবছর এই ডিজনিওয়ার্ল্ড ভ্রমণ করে। ২৭,২৫১ একর জমির উপর নির্মিত পৃথিবী বিখ্যাত নয়নাভিরাম এই রিসোর্টটি যেন আসলেই এক বিস্ময়।  ডিজনির আদলে নির্মিত ২৭টি হোটেল, চারটা থীম পার্ক, দুটো ওয়াটার পার্ক, চারটা গলফ কোর্ট, একটা ক্যাম্পিং রিসোর্ট, একটা আবাসিক এলাকাসহ রিক্রেশন এবং এন্টারটেইন জন্যে আরও কত কি। সারা বছরের জন্যে এ ডিজনী ওয়াল্ড দর্শনার্থী থাকলেও কখনো কখনো আবহাওয়া বৈরী হয়। আর সেজন্যেই বিশেষত গ্রীষ্মের দু-তিনটি মাস যেন উপচে পড়ে দর্শনার্থি। না দেখলে বিশ্বাস করার সাধ্য নেই কত লাখ মানুষ আসে প্রতিদিন এই সময়টাতে।

আমাদের রিসোর্ট থেকে মাত্র বিশ মিনিটের রাস্তা। সাহেদের গাড়িতে আমরা। স্থানে স্থানে ডিজনী’র থীম নিয়ে বানিয়ে রাখা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সাইনবোর্ডের মতো করে। আমাদের শিশু কিশোরীরা এসব দেখে দেখে চিৎকার করে করেই এগুচ্ছে। শিহরিত হচ্ছে তারা ক্রমেই। মনে হচ্ছে তাদের এ যেন এক দীর্ঘ যাত্রা। একটা খোলা জায়গায় এসে গাড়ি পার্ক করেন শাহেদ। পার্কিং বে-তেই। শাহেদের কথা আমি আপনাদের এখানে ড্রপ করে চলে যাবো । এদিকে জেনী তার গাড়িতে করে বাকী সবাইকে নিয়ে এসেছ। শাহেদ চলে গেলে জেনীই আমাদের নেত্রী। ডিজনী ওয়ার্ল্ডেরও টিকেটও আগেই কেটে রাখা হয়েছে, শাহেদ-জেনীই এর ব্যবস্থা করেছে। যেখানে কার পার্কিং করা হয়েছে, তার পাশ ঘেষেই একটা বিশাল লেক বা হৃদ তৈরী করা হয়েছে। শুরু থেকেই যেন এক বিস্ময়। কৃত্রিমভাবে নির্মাণ করা হয়েছে এই হৃদটি ডিজনি ওয়ার্ল্ডকে মাঝখানে রেখে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এ হৃদ। ডিজনি ওয়ার্ল্ডে ঢুকতে হলে এই হৃদ অতিক্রম করেই যেতে হবে। আমার মনে হলো, ডিজনি ওয়ার্ল্ড কর্তৃপক্ষ একসাথে দুটো কাজ করেছে। একদিকে নয়নাভিরাম একটা দৃশ্য বানিয়েছে, অন্যদিকে সারা ডিজনি ওয়ার্ল্ডকে তার নিরাপদ একটা দ্বীপ বানিয়ে নিয়েছে। সেখানে ঢুকার পথ দুটো। একটা ট্রেন, অন্যটা বিশাল ফেরী। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম। ট্রেনেই যাবো। শাহেদ আগেই বলেছেন, দিনের আলোতে ডিজনির এ প্রকৃতি আরেক জগত। আমরা ট্রেনেই উঠলাম। হৃদ থেকে অন্তত একশত ফুট উপর দিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। মনে হয় আমরা পাড়ি দিচ্ছি ভৈরব। চেখে পড়ে পানির মাঝেই যেন জেগে উঠেছে কোন শৈল্পিক গাছ-গাছালি। ডানে-বামে সবদিকেই থৈ থৈ পানি। তৈরী করা হয়েছে ছোট্ট ছোট্ট দ্বীপ। থোকা থোকা বন, ঝুপ-ঝাড়। মনে হয় দূরে। পাচ মিনিটের মধ্যেই আমাদের ট্রেন প্রবেশ করে ডিজনি ওয়ার্ল্ডে। ট্রেন থেকে নামি। শুরু হয় জনতার কোলাহল। সামনে বিরাট তোরণ লিখা আছে -Magic Kingdom

যথারীতি ব্যাগগুলো স্ক্যান করা হলো। শরীরে আবারও মেশিনের এক্স-রে। তবে খুব তাড়াতাড়ি আমরা প্রবেশ করলাম ডিজনি ওয়ার্ল্ড নামক শিশু-কিশোর-কিশোরীদের স্বপ্নের পৃথিবীতে।

বাসায় বসে মেয়েগুলো ‘ডিজনী জুনিয়র’ চ্যানেল দেখে। এদের কাছে মিকি মাউস, মিনি মাউস, টিংকা বেল,সফিয়া,ডনাল্ড, ডেইজি, প্রভৃতি চরিত্রগুলো যেন স্বপ্নের রাজ্যে বিচরণ করার মতো। সেই চরিত্রগুলো তাদের সামনে দাঁড়িয়ে। প্রথমে ঢুকেই দেখেছে তারা মিকি, অপেক্ষা করছে দর্শকদের জন্যে। আমার নয় বছরের আরিভার চোখে বিস্ময়। বার বার লিয়ানাকে বলছে ‘ডু ইউ ওয়ান্ট টু সী মিকি’ উৎফুল্ল লিয়ানার যেন আর থর সহ্য হয় না। মিকির সাথে সাক্ষাৎ করতে সময় লাগবে আধা ঘন্টা, স্ক্রীনে সেই বার্তাটাই এসেছে। এর কিছু পরেই সারা ডিজনি ওয়ার্ল্ড ঘুরবে একটা প্যারেড। ডিজনি জুনিয়র এ দেখা বিভিন্ন ফিল্ম এর পাত্র-পাত্রীদের নিয়ে প্রায় এক ঘন্টার এক কারুকার্যময় র‌্যালী (প্যারেড) হবে। জেনীর কথা হলো -প্যারেড এক বিস্ময়। জোয়ান-বুড়া সকলের জন্যে। তবুও আমরা লাইনে দাঁড়াই। মিকির সাথে সাক্ষাৎ করতেই হবে। সামান্যতেই ধৈর্যহারা হয় আমার যে মেয়েটি সেই আরীভা দীর্ঘ আধা ঘন্টার লম্বা কিউ এ দাঁড়িয়ে টু শব্দটি পর্যন্ত করলো না। এগুতেই থাকলো। আধা ঘন্টা পেরিয়ে ৪০ মিনিটের মোড়ে আমরা ঢুকি মিকি দেখার কক্ষটিতে। এখানে দাঁড়িয়ে আছেন অন্তত তিনজন সিকিউরিটি। এদের দুজনই তরুনী। তারা তেরো জনের একটা একটা প্রুপ পাঠাচ্ছে মিকি‘র সাথে দেখা করতে। অথচ আমরা পনেরো জন। নিয়ম ভেঙ্গেই গ্রুপকে একসাথে দিয়ে দিল তারা। লিয়ানা আর আরিভার চোখে যেন ধাঁধাঁ লেগেছে। বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা। মিকি বলে উঠে ‘হ্যালো’। ছবি তোলার জন্যে মিকি মাঝখানে এসে দাঁড়ায়। একটা কিশোরী কিংবা তরুণী মূলত। মিকির এপ্রোন পরে সাজিয়ে নিয়েছে নিজেকে। বাচ্চারা মনে করছে তাদের সেই চির পরিচিত মিকি তাদের হাতের নাগালে। তাইতো ছবি তুলি আমরাও। আরিভা তার অটোগ্রাফ বইটি বাড়িয়ে দেয়। মিকি বলে- ‘শ্যাল আই গিভ ইউ অটোগ্রাফ’। ‘ইয়েস প্লিজ’ বললেই আরীভার বইটি নিয়ে অটোগ্রাফ দেয় মিকি।

ছবি তোলার পালা শেষ হয় মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই।  আয়োজন শেষ হয়। বেরিয়ে আসি আমরা। তাগদা দেয় জেনী। সাড়ে তিনটার সময় এই জায়গাটিতে আসবে প্যারেড। সময় হয়ে গেছে। বাইরে বেরিয়ে দেখি রাস্তার দুধারে মানুষের সারি। কোথাও জায়গা নেই। কোনরকম ঠাসাঠাসি করে জায়গা করে নিলাম আমরা। আসলেও বিস্ময়। নাচে-গানে মিউজিকের তালে তালে । আমি চিনি না, তবে আরিভাই যেন সব জানিয়ে দিয়ে যায়। টিংকাল বেল আসছে। চিৎকার শুরু হয়। তারপর লাল আর কালো হলুদ রংএর বাহারী কাপড় পরে প্রিন্সেস এর মতো করে আসছে মিকি তার দলবল নিয়ে।  ক্যাপ্টেন হুক ডিজনির একটা ভিলেন চরিত্র । এই চরিত্রটি ফ্লউট এর একদম উপরে উঠে তার ভিলেনী প্রদর্শন করতে থাকে, হুক নির্মিত হাত দিয়ে। ফ্রউজেন ফিল্মের  এলসা-আনা, ট্যাংগোড ফিল্মে রুপানজল ও ফ্লিন রাইডার কিংবা স্নো হোয়াইট সেভেন ডুয়ারভস, সিনডারেলা প্রভৃতি চরিত্র গুলো তাদের ঝিকিমিকি কাপড়ের বৈচিত্রময় পেখম তোলে আমাদের সামনে দিয়ে হেটে যায়, গান গায়  ফ্লউড এর উপর থেকে। সৎমা’র কুপানলে পড়ে স্লিপিং বিউটি (অরোরা) ফ্লউটে বসে বসে স্বপ্নে জাল বুনে ডুওরভসের সাথে স্বপ্নীল দিন কাটাতে। একটা ঘন্টা কেটে যায় কোনদিকে , বাচ্চারাতো বুঝে-ইনি, এমনকি আমিও বুঝিনি।

উৎফুল্ল সবাই তবুও যেন ক্লান্ত । হালকা খাবার খেয়ে আবারও নতুন কিছুর জন্যে ছুটে যাওয়া। যেখানেই যাওয়া, সেখানেই লম্বা লাইন। এবারের জায়গাটি ‘দ্যা হ্যপিয়েষ্ট ক্রুজ অব ইওর লাইফ’। আস্তে আস্তে আমরা এই এলাকাটার মধ্যে ঢুকি। দুদিকে রেলিং মাঝখান দিয়ে হাঁটছে মানুষ । আমরাও হাটছি পিছু পিছু। নিচে শান্ত ধীর জল। বামদিকে চেয়ে দেখি কয়েনে ভরে গেছে । চিক চিক করছে শান্ত জল। এ এক প্রচলিত ধারণা, বিশেষত শিশু-কিশোরদের। কোনো ফোয়ারায় কিংবা শান্ত জলের মাঝে একটা এক পেনি, দুই পেন্স, দশ পেন্স কিংবা পাউন্ড কয়েন পর্যন্ত ছুড়ে মারে, আর উইশ করে অর্থাৎ অদৃশ্য কারো কাছে এরা কিছু প্রার্থনা করে। এই উইশ পেছনে ফেলে আমরা সামান্য হেটেই আরেকটা কিউ এর মাঝে আটকে পড়ি।

নৌকা আসছে একের পর এক। একেকটা নৌকায় আটজন করে মানুষ বসছে। সাথে সাথে খুব ধীর গতির রাতের সাথে ভাসছে নৌকা। আমরাও ভাসতে থাকি। সুরের সম্মোহনী এক টান, যন্ত্রের হালকা টুংটাং। যেদিকে তাকাই শুধুই বিভিন্ন আদলে অতি আদর নিয়ে নির্মিত ভিন্ন ভিন্ন প্যার্টানে পুতুলগুলো নাচছে। শিশু-কিশোররা তো দেখছেই ,বিস্ময় বিস্ফোরিত চোখে,এমনকি আমিও যেন হারিয়ে যাই। দেখি আমার পাশে বসা হেলেন তার কোলে বসা লিয়ানা কখনো চিৎকার করছে,কখনো বসে আছে চোখ মেলে, দেখি হেলেনও যেন আরেক জগতে পাড়ি দিয়েছে। আমি ধাক্কা দেই তাকে। নৌকা যতই আগায় নতুন নতুন বিস্ময়। পুতুলগুলো নেচে যাচ্ছে অবিরাম,শত শত বললে ভুল হবে হাজার হাজার পুতুল। পুতুলগুলোতে যেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ফোটে উঠছে নিরন্তর। কখনো দেখা যাচ্ছে জাপানীজ পুরুশ কিংবা মেয়েরা নাচছে এবং সেই সাথে তাদের গান, মধ্যপ্রাচ্যের জোব্বাপরা পুরুষের আদলে নির্মিত পুতুলে তাদের সেই আরবীয় নৃত্য।

ডিজনি ওয়ার্ল্ড’র ছোট্ট পৃথিবীর ধারণাটা ছিল সারা পৃথিবীর বাচ্চাদের নিজস্ব ভাষার জাতীয় সঙ্গীত থাকবে সেখানে। কিন্তু পরে তা এককভাবে ‘ইট্স্ এ স্মল ওয়ার্ল্ড’ গানটি দিয়ে মূলত সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং সূরের ধ্বনিরই বার্তা সারা পৃথিবীর শিশুদের মাঝে পৌছে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। ইংরেজীর পাশাপাশি ফ্রেন্চ, ইটালিয়ান, স্পেনিশ এবং জাপানিজ এই চারটি ভাষায় সম্ভবত গাওয়া হয়েছে এই গানটি। বাজছে এই গান,তবুও বিভিন্ন দেশের কিংবা উপমহাদেশ কিংবা দেশের  সংস্কৃতিকে তোলে ধরার চেষ্টা আছে এতে। তাইতো ভারতীদের (হয়ত বাংলাদেশও)শাড়ি থেকে স্কটিশদের ট্যাডিশনাল ড্রেস সবগুলোই যেন শোভা পাচ্ছে এই ছোট্ট পৃথিবীতে। আছে পাকিস্থান কিংবা আফগানিস্থানের পোষাক পরা পুতুল, বাজছে সঙ্গীতের সুর। সব মিলিয়ে স্ক্যান্ডিনিভিয়ান, ব্রিটিশ দ্বিপপুঞ্জ, ইষ্টার্ন ইউরোপ, ওয়েষ্টার্ন ইউরোপ, মধ্যপ্রাাচ্য, এশিয়া, আফ্রিকা, এন্টার্কটিকা, দক্ষিণ আমেরীকা, অষ্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিন প্যাসিফিক দ্বীপপুঞ্জের সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে শিশু-কিশোরদের জন্যে।

এই দেশ কিংবা উপমহাদেশ কিংবা মহাদেশগুলোর সংস্কৃতির প্রতীক পুতুলগুলো তাকিয়ে আছে জলের দিকে। নৌকার মানুষগুলোকে যেন টিপ্পনি দিচ্ছে চোখ দিয়ে। চারদিকে সুরের ঝংকার। উপরে নীচে যেন শুধুই পুতুল, সামনে দেখি নির্মাণ করা হয়েছে যেন খড়ের ছাউনি দিয়ে একটা কিছু। শাপলা নয়, তবে শাপলার আদলে সবুজ আর লালের মিশ্রণে ফুল ফোটে আছে পানির উপর। জলজ উদ্ভিদগুলো মনে হয় গজিয়ে উঠছে নিচ বহু নিচু থেকে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার নয়, তবে বাঘের চেহারায় দেয়া হয়েছে এক মায়াবী রং, যেখানে বাঘের হিংস্রতার বদলে প্রকাশ পেয়েছে নরম কোন প্রাণীর অবয়ব। ব্যাঙের মতো প্রাণীগুলো একবার সামনে একবার পেছনে গিয়ে যেন প্রার্থনায় রত মিউজিকের তালে তালে। নৌকার দু‘ধারে সামান্য উপরে নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন রাইড। এই রাইডগুলোতেও তৈরী করা হয়েছে পুতুল। ঘুরছে রাইডগুলো। নৃত্যরত পুতুল। বাজছে গান। একটা জায়গায় এমনভাবে কিছু লম্বা আলোর রশ্নি ঝালরের মতো ফেলে দেয়া হয়েছে উপর থেকে, এতে আছে আলোর বিচ্ছুরণ, মনে হয় যেন এক জীবন্ত জলপ্রপাত। বাঁশী বাজাচ্ছে একটা শাড়িপরা নারী ,সাপ বেরিয়ে আসছে কোন এক মটকার ভেতর থেকে। আরো অসংখ্য-অগণন আকর্ষণ। সুরের মুর্ছনার সাথে আলোর  বৈচিত্র অদ্ভুদ-স্বচ্ছ জলের মাঝে নানা রং এর আলোর বিচ্ছুরণ। আবার কখনো ঘুরছে আলোগুলো।

এক অনবদ্য মোহনীয়তার মাঝে যেন হারিয়ে যায় শিশু কিশোর, তরুন-তরুনীতো বটেই এমনকি যে কোন বয়সী মানুষগুলোও। এরই মাঝে প্রায় ১০ মিনিটের এই নৌকাভ্রমন আমাদের শেষ হয়। দেখি সম্মুখে ঝুলছে লেখা গুডবাই। আরও বিভিন্নভাষায় উচ্চারিত এই গুডবাই। আমি না বুঝলেও ঠিকই স্প্যনিশ গুডবাই টি বুঝে নিলো মেয়েগুলো।

নৌকা থেকে বেরিয়ে এসে ধাক্কা দেয় আবার ভ্যাপসা গরম। আইসক্রিমের খুঁজে আমরা যাই। আইসক্রিম খেতে খেতে যেন বিকেলের মিষ্টি রোদ আমাদের কিছুটা ক্লান্ত করে। গরম অল্প কমে যায়। নতুন কিছু সন্ধানে উঠতে হবে।

এসময় জেনীর মোবাইলে ফোন আসে। শাহেদ আসছেন খাবার নিয়ে। এ এক বড় ব্যাপার। শাহেদের জানা আছে, এখানে খাবার পাবে না মেয়েগুলো, তাইতো এক ঘন্টার মধ্যে শাহেদ আসেন। ফিস বার্গার আর ফ্রাইজ একে একে শেষ করে সবাই। তারপর আবারও শুরু সারা ম্যাজিক কিংডম ঘুরে দেখা একটা মাত্র ট্রেন ভ্রমণে। এখন থেকে শাহেদও আমাদের সাথে। ট্রেনে উঠি। ট্রেনের নামটা দিয়েছে তারা ‘দ্যা ব্রিটিশ রেল’। এই ব্রিটিশ রেলে উঠলাম আমরা সবাই। মেয়েগুলো তাদের দেশের ট্রেন পেলো ‘ব্রিটিশ রেল’। ভেঁপু বাজিয়ে যাত্রা শুরু হলো ট্রেনের। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। ডানে-বামে গ্রাম। দূরে বানিয়ে রাখা হয়েছে পুকুর। পুকুরের পার ঘেষে চরছে গরু। বাঁশঝাড়ের পাশে অন্ধকারে হারিকেন নিয়ে দাড়িয়ে আছে কোন ব্রিটিশ পুরুষ, পাশে দাঁড়িয়ে তারই প্রেমিকা কিংবা জীবনসঙ্গীনী আরেক শেতাঙ্গ মহিলা। কিংবা কোথাও গুহার মতো কিছু দেখছে অন্য কোন ময়লা পোষাকের কোন সাদা মানুষ। কখনো হরিণ, কখনো সাপের,মূলত সবগুলোই প্রতিকৃতি। সিংহ যেন দাঁড়িয়ে আছে ঠায়। একসময় ট্রেন থামে আমাদের ভ্রমণও শেষ হয়। কিন্তু না, আমরা নামি না ট্রেন থেকে। একটা গ্রুপ নেমে পড়ে, তাঁরা হাটতে চায় সন্ধ্যার শুরুটা তারা দেখতে চায়। বিভিন্ন রং আর ঢংএর কারুকার্য। আমরা ক‘জন ট্রেনেই থেকে যাই । ট্রেন আবার ফেরে। আমরা সেই জায়গাটিতেই ফিরে যেতে চাই। কারণ সেখানে রেখে এসেছি আমাদের দুটো মেয়ে সাব্রিয়া আর লিয়ানার দুটো প্রাম। সন্ধ্যা বাড়ার সাথে সাথে বাড়বে মানুষ । ওদের ঘুম আসবে। তাদের ধাক্কা দিয়েই চলতে হবে আমাদের ।

সন্ধ্যা উতরে যায়। মানুষের কোলাহল বাড়ে। অন্ধকার বাড়তে থাকে সারা ওয়ার্ল্ড- ডিজনি ওয়ার্ল্ডে। আলোও ছড়াতে থাকে আধাঁরের সাথে পাল্লা দিয়েই। আর এই আলো দেখতেই জমতে থাকে মানুষ। সারা বিশ্বের । কত হাজার মানুষ হবে ? সে এক বিস্ময়। দিনের পর দিন দেখেও যে ডিজনি ওয়ার্ল্ডে কিশোর-কিশোরীর এমনকি কোন মানুষের যেমন দেখার ইচ্ছে মেটে না, যে মানুষগুলো সারা দিন ছড়িয়ে থাকে মাইলের পর মাইল ডিজনি ওয়াল্ডের চারদিকে, সেই অসংখ্য মানুষ পিপিলিকার মতো কিলবিল করতে থাকে একটা ক্যাসল কিংবা প্রাসাদকে কেন্দ্র করে। যে ক্যাসল কিংবা প্রাসাদ শিশু-কিশোরদের স্বপ্নে রুপকথার কেন্দ্রবিন্দু, যে ডিজনক্যিসলকে কেন্দ্র করে সিন্ডারেলা, রুপন্জল, পিনোকিও, প্রভৃতি চরিত্রগুলো সারা বিশ্বের কোটি কোটি শিশু-কিশোর-কিশোরীদের সম্মোহনী করে রেখেছে। যে ক্যাসেলে ফ্রজেন কিংবা রুপেন্জল’রা শূন্যে পরীর মতো ডানা মেলে ঘুরে বেড়ায়, ভিলেন চরিত্রের সৎমা,ম্যালাফেসেন্ট,ক্যপ্টেন হুক যখন এদের বিপরীতে অভিনয় করে তাদের প্রিয় চরিত্রগুলো ধ্বংস করতে, তখন তাদের হৃদয়ে দুঃসহ দুঃখবোধ। কিংবা কিশোর-কিশোরীরা যখন তাদের প্রিয় চরিত্রগুলোর বিজয় দেখে, হয়ে উঠে আনন্দে উদ্বেল, সেই ক্যাসলেই জড়ো হচ্ছে মানুষ। ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই, সাড়ে আটটায় শুরু হবে এই আলোর ঝলকানি। ছয়টার মধ্যেই যেন ভরে গেছে সব। মাইলের পরম মাইল। বসে আছে সবাই। কেউবা হাঁটছে। 

শুরু হয় আলোর ঝলকানি। যেন ক্যাসলটি নড়ে চড়ে উঠে। আলো পড়ে। রুপনজলের রুপে চিৎকার করে উঠে লাখো কিশোর-কিশোরী। একের পর এক আলোর ঝলকানি। নানা চরিত্রের আনাগোনা। আমি দেখি আমাদের মেয়েগুলোর চোখের বিস্ময়। আরীবা ঘুমিয়ে পড়েছিলো আমার কোলেই। জেগে উঠে। আমি চেয়ে চেয়ে দেখি। মনে হয় স্বপ্নের মাঝে সে পাড়ি দিচ্ছে সে আরেক জগৎ। যেখানে পরী  (ফ্যায়েরী) ঘোরে বেড়ায়। রাজকীয় পোষাকে ঝলকে উঠে সেই পরীরা। হঠাৎ নিরব হয়ে যায় সব কিছু। আলোর ঝলকানি থেমে যায়। সবাই চেয়ে আছে উর্ধ্বে আকাশের দিকে। কম করে হলেও হাজার মিটার উপরে হবে।  দেখা যায় কি এক পরী লটকে আছে, আবারও জ্বলে উঠে একটা আলোর রশ্ন্, এই পরীর উপর। বিস্ময় নিয়ে আমিও তাকাই। আসলে একজন মানুষ পরীর পোষাকে শাঁ করে আকাশের দিকে উড়ে গেলো। আলোর সময়-সীমারেখা শেষ হলে মনে হলো সেই পরী মিলিয়ে গেলো যেন শূন্যে নীলিমায়। শূন্যে হারিয়ে যাওয়া এই চরিত্রটাই হলো টিংকারবেল। প্রায় ৪৫ মিনিটের এই লাইট শো শেষে শুরু হয় চোখ ধাঁধাঁনো ফায়ারওয়ার্ক (আতজবাজি)। সারা ডিজনী ওয়ার্ল্ড জুড়ে আলোর ঝলকানি। ঝলসে উঠে সারা ওয়ার্ল্ড-শব্দের স্বপ্নীলতায়। আলোকে আলোময়, অন্ধকারে আলোর ফোয়ারা -ক্যাসল থেকে বিস্তৃত হয়, দিগন্ত থেকে দিগন্তে। আঁতশবাজি শেষে এক অদ্ভুদ সম্মোহন সাথে নিয়েই মধ্যরাতে লাখো মানুষের কাফেলায় আমরাও মিলিত হই। এবারে ফিরতে হবে,হাঁটতে থাকি। ফেরির জন্যে অপেক্ষা। লাখো মানুষের কেউ যাচ্ছে ট্রেনে। আমরা এবার পাড়ি দিচ্ছি ফেরীতে। ফেরির দিকে ছুটছে শিশু-নারী পুরুষ, হাজার হাজার মানুষ। অথচ মাত্র ১৫/ ২০ মিনিটের মধ্যে উঠে যাই ফেরিতে। অন্ধকার কেটে কেটে আমরা আলোর দিকে আগাই। পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মাঝেই পারে এসে ভিড়ে ফেরি। শেষ হয় স্বপ্নের এক অধ্যায়-কিশোরী-তরুনীদের, আমাদের মতো বয়সীদেরও।

ফারুক যোশী; কলামিষ্ট, প্রধান সম্পাদক;৫২বাংলাটিভিডটকম


সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন