বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা আপাতদৃষ্টিতে ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে ভারত যে এ বিষয়টি একেবারে ছেড়ে দিয়েছে, এমন ইঙ্গিত এখনও পাওয়া যাচ্ছে না। বরং একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ ও ‘গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচনের স্বার্থে প্রতীকী হলেও আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেওয়া উচিত— এই অবস্থান দিল্লি অতি সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও স্পষ্ট করেছে। সেই প্রেক্ষাপটেই সামনে এসেছে নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার উদাহরণ।
বাংলাদেশের মতোই ওই দুই দেশেও ‘জেন জি’ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো ক্ষমতাচ্যুত হয়। কয়েক দিন আগে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়টি তুলে ধরেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। এ ছাড়া ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিভিন্ন পর্যায়ে একই বার্তা ঢাকার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ‘জুলাই গণহত্যা’র সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশে বর্তমানে আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার । তবে অন্তর্বর্তী সরকারের বক্তব্য— দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না— এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন, এতে সরকারের কোনও ভূমিকা নেই।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের ঘোষিত অবস্থান হলো— নির্বাচন শুধু অবাধ ও সুষ্ঠু হলেই যথেষ্ট নয়, সেটি হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলকও। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ভারত চাইছে— ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কোনও না কোনও রূপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাক।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চলতি সপ্তাহে এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা যেটা শুনেছি তা হলো, বাংলাদেশের মানুষের, বিশেষ করে যারা এখন ক্ষমতায় আছেন তাদের, যেভাবে এর আগে সে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তা নিয়ে সমস্যা ছিল। তবে এটা আমাদের ইস্যু নয়, আমরা তাদের একজন হিতৈষী প্রতিবেশী– এটুকুই। কিন্তু এখন নির্বাচনটাই যদি বড় সমস্যা হয়, তাহলে এটাই তো আপনি ধরে নেবেন যে তাদের (অন্তর্বর্তী সরকারের) প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি, সেই নির্বাচন শিগগিরই হবে, কারণ সেটা তাদের দায়িত্ব। কিন্তু দিনের শেষে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিয়েই যদি সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে সেটা করাটাই সবচেয়ে জরুরি।’
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে ইঙ্গিত স্পষ্ট— বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন আদৌ পুরোপুরি সুষ্ঠু ও অবাধ হবে কি না, তা নিয়ে দিল্লির আস্থা এখনও তৈরি হয়নি। পাশাপাশি, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে সেই নির্বাচন ভারতের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে— এমন বার্তাও তিনি পরোক্ষভাবে দিয়েছেন।
কেন সামনে আনা হচ্ছে শ্রীলঙ্কা ও নেপালের উদাহরণ
আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বারবার শ্রীলঙ্কা ও নেপালের উদাহরণ তুলে ধরছেন। তাদের যুক্তি অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভকারীরা এমনকি প্রেসিডেন্টের বাসভবনও দখল করে নেয়। প্রাণ রক্ষায় রাজাপাকসে ও তার সরকারের বহু সদস্যকে দেশ ছাড়তে হয়। কিন্তু সেই ঘটনার দুই বছর পর যখন শ্রীলঙ্কায় সংসদ নির্বাচন হয়, তখন রাজাপাকসের দল শ্রীলঙ্কা পোদুজানা পেরুমানাকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। যদিও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরেছে এবং অর্থনীতিও ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে।
একইভাবে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে নেপালে ‘জেন জি’ আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। ওলিসহ তার মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যই আত্মগোপনে যান। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি নির্বাচন প্রস্তুতির কাজ শুরু করেন। সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দল— কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্ক্সিস্ট–লেনিনিস্ট)—কে নির্বাচনের বাইরে রাখার কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অন্যান্য দলের মতো তারাও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। নেপালেও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক স্থিতি ফিরে আসছে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতা তুলে ধরে ভারত বোঝাতে চাইছে— বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শান্তি, অগ্রগতি ও জাতীয় সংহতির স্বার্থে সব প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত। অন্যথায়, শেখ হাসিনার আমলে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের মতোই অন্তর্বর্তী সরকারও একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের দায়ে অভিযুক্ত হতে পারে।
তবে ভারতের এই পরামর্শ বাংলাদেশ আদৌ গ্রহণ করবে কি না, কিংবা আওয়ামী লীগকে কোনওভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে কি না— তা নিয়ে এখনও নানা প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। যদিও দিল্লির ধারণা, এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
-
সৌদির মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলা, প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি হুঁশিয়ারি
-
নিজেকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করে গেছেন ইউনূস, এক বছর পাবেন এসএসএফ নিরাপত্তা
-
ইরানে হামলা চালিয়ে ট্রাম্প মার্কিনীদের সমর্থন হারাচ্ছেন?
-
বেশ কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের খবর নিশ্চিত করল কুয়েত
-
ইরানের হামলায় এবার বাহরাইনে এক বাংলাদেশি নিহত