ফুজেল আহমদ ,কানাডা
বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনের ঠিক আগমুহূর্তে কানাডার বাংলা কমিউনিটির সবচেয়ে বড় ফুটবল আয়োজন ‘টরন্টো বাংলা পাড়া ফুটবল টুর্নামেন্ট’-এ আবারও চ্যাম্পিয়নের মুকুট জিতেছে বিয়ানীবাজার স্পোর্টস ক্লাব টরন্টো। স্থানীয় এক কাউন্সিলর এই টুর্নামেন্টকে ‘স্কারবোরো মিনি বিশ্বকাপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ড্যানফোর্থের ডেন্টোনিয়া পার্ক সকার ফিল্ডে অনুষ্ঠিত এ ফুটবল উৎসব যেন প্রতি বছরই বিয়ানীবাজারের নামকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করে। টুর্নামেন্টকে বর্ণিল ও সফল করে তুলতে বাংলা পাড়া ক্লাবের চেয়ারম্যান এম. আর. আজিজ এবং শরীফ আলী নিরলস পরিশ্রম করেছেন।
প্রতিবারের মতো এবারও টুর্নামেন্টকে আরও আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতামূলক করতে প্রতিটি দলে দুইজন করে বিদেশি খেলোয়াড় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে বিয়ানীবাজার স্পোর্টস ক্লাবের প্রয়োজন হয়নি কোনো বিদেশি খেলোয়াড়ের। ক্লাবটির হয়ে খেলেছেন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় লিগে খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ফুটবলাররা।
উত্তর আমেরিকার অন্যতম বাংলা ফুটবল উৎসব হিসেবে পরিচিত এ টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ও বাফেলো থেকে দল আসে। এছাড়া কানাডার মন্ট্রিয়াল থেকেও অংশ নেয় মন্ট্রিয়াল এফসি।
বাংলা টাউন তথা স্কারবোরোর ফুটবল উৎসবগুলোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এখন বিয়ানীবাজার স্পোর্টস ক্লাব। তাদের ধারাবাহিক সাফল্য ও দাপুটে পারফরম্যান্সের কারণে দর্শকদের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়েছে দলটি।
এবারের চ্যাম্পিয়নশিপ যাত্রা অনেকটাই ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অভিযানের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রথম ম্যাচে পরাজয়ের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তী সব ম্যাচে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে ফাইনালে পৌঁছে যায় বিয়ানীবাজার। ফাইনালেও দেখা যায় বিশ্বকাপের মতোই রুদ্ধশ্বাস টাইব্রেকার। সেখানে গোলরক্ষক সরোওয়ারের অসাধারণ নৈপুণ্যে শিরোপা জয় নিশ্চিত করে দলটি।
বিশ্বকাপের আবহের ঠিক আগে এমন এক রোমাঞ্চকর সমাপ্তি দর্শকদের মধ্যেও বিশ্বকাপের উন্মাদনা ছড়িয়ে দেয়।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লিবারেল পার্টির এমপিপি প্রার্থী এবং অন্টারিও সকার বোর্ডের পরিচালক বাংলাদেশি-কানাডিয়ান আহসান হাফিজ। তিনি বিয়ানীবাজারের খেলা, দর্শক সমাগম ও উচ্ছ্বাসে মুগ্ধ হয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দলের ডিনারেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেন।
ইউনাইটেড জালালাবাদ ফাউন্ডেশনের সভাপতি খসরুজ্জামান চৌধুরী দুলু বলেন, “নাম্বার ওয়ান সবসময়ই বিশেষ কিছু। বিয়ানীবাজার বারবার চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে, একজন বিয়ানীবাজারী হিসেবে আমরা গর্বিত।”
বিয়ানীবাজার সমিতির সভাপতি সরফুল ইসলাম বলেন, “তরুণদের এই সাফল্য শুধু বিয়ানীবাজার নয়, টরন্টোর বাংলা কমিউনিটিতেও আমাদের সুনাম ও মর্যাদা বৃদ্ধি করছে। এতে আমরা গর্বিত।”
প্রবীণ শিক্ষাবিদ আখলাক হোসেন বলেন, “বয়স ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে মাঠে নামতে না পারলেও মনটা এখনো তরুণদের সঙ্গেই আছে। তাই গ্যালারিতে এসে তাদের উৎসাহ দিতে কখনো পিছপা হই না।”
বাংলা পাড়া ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এম. আর. আজিজ বলেন, “আমরা জানি, বিয়ানীবাজারের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এখন তারাই। সবাই তাদের হারাতে চায়, কিন্তু আয়োজকরাও চায় তারা যেন ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায়। কারণ বিয়ানীবাজার ফাইনাল মানেই জমজমাট পরিবেশ ও দর্শকদের উচ্ছ্বাস।”
জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তি মনসুর আহমদ বলেন, “বিয়ানীবাজার যেন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্যই আসে। অন্য দলগুলোর সামনে এখন দুটি পথ—খেলায় অংশ নেওয়া অথবা রানার্সআপ হওয়া।”
রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসক ডা. নুরুল্লাহ তরুণ বলেন, “বিয়ানীবাজার স্পোর্টস ক্লাবের ঐক্য ও পারফরম্যান্স অন্য সবার জন্য অনুসরণীয় উদাহরণ।”
জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব টরন্টোর সদ্য নির্বাচিত সভাপতি এবাদ চৌধুরী দলীয় ডিনারে উপস্থিত হয়ে বলেন, “নিজেকে সবসময়ই বিয়ানীবাজারী মনে হয়।” তিনি বিশেষভাবে সায়েম, নিশাত, মোরশেদ ও অনিমসহ টিম ম্যানেজমেন্টের সবাইকে অভিনন্দন জানান।
দলের পরিচালক আরাফাত বকসী সুমন বলেন, “আমাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো ঐক্য ও একাগ্রতা। দলের সমর্থক, স্পন্সর এবং স্বেচ্ছায় অনুদান প্রদানকারী সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। এই ভালোবাসা ও বন্ধন ধরে রাখার অঙ্গীকার করছি।”
রোড টু চ্যাম্পিয়নশিপ
প্রথম ম্যাচ
বিয়ানীবাজার ০-১ আলফা ব্রাদার্স
দ্বিতীয় ম্যাচ
বিয়ানীবাজার ৫-০ ইউনাইটেড বড়লেখা
তৃতীয় ম্যাচ
বিয়ানীবাজার ২-০ রয়েল বেঙ্গল এফসি
কোয়ার্টার ফাইনাল
বিয়ানীবাজার ২-০ সিলেট ইউনাইটেড ইউএসএ
সেমিফাইনাল
বিয়ানীবাজার ২-০ টরন্টো বাংলা পাড়া
ফাইনাল
বিয়ানীবাজার ০-০ সোলজার্স
(টাইব্রেকারে বিয়ানীবাজার বিজয়ী)
ব্যক্তিগত অর্জন
- সেরা গোলরক্ষক: সরোওয়ার
- সেরা ডিফেন্ডার: ইকবাল
- সর্বোচ্চ গোলদাতা: আবু
- টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়: শিপলু

চ্যাম্পিয়ন দলের স্কোয়াড
সরোওয়ার (গোলরক্ষক), সাদ্দাম (অধিনায়ক), ইকবাল, শিপলু, আবু, শাকিল, রাফিউল, জেমি, সাহেদ, জাহেদ, সাহের ও টুটুল।
কোচ: মোরশেদ
ম্যানেজার: অনিম সাঈদ
টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জিতে টরন্টোর বাংলা কমিউনিটির ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য আরও একবার প্রতিষ্ঠিত করল বিয়ানীবাজার স্পোর্টস ক্লাব টরন্টো।