মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন)-এর ‘খুনের রহস্য’ উদঘাটনে নতুন অগ্রগতি দেখা গেছে। আদালত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তার দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের ভিত্তিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা গত ২৪ মে এই অনুমতি দিলেও বুধবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (DMP) প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম বলেন, “তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দেহাবশেষ উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং ময়নাতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।”
তদন্ত কর্মকর্তা CID পুলিশের ইন্সপেক্টর জিয়াউল মোর্শেদ গত ২০ মে সালমান শাহর দেহাবশেষ উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, ঘটনার ২৯ বছর পর আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সালমান শাহের লাশ পূনরায় কবর থেকে উত্তোলনপূর্বক সুরতহাল প্রতিবেদন এবং ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পর্যালোচন করা একান্ত প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তদন্ত কর্মকর্তা জিয়াউল মোর্শেদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম গত বছরের ২০ অক্টোবর মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় সালমানের সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। আগামী ২৩ জুন মামলার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন নির্ধারিত রয়েছে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের একটি ফ্ল্যাটে চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যু হয়। সে সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে।
ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।
পরবর্তীতে অপমৃত্যু ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের জন্য CID-কে নির্দেশ দেয় আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে CID জানায়, সালমান শাহ ‘আত্মহত্যা’ করেছেন।
এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায়। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন, যেখানে হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
পরবর্তীতে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ‘নারাজি’ দেন এবং ১১ জনকে সম্ভাব্য জড়িত হিসেবে উল্লেখ করেন।
এরপর মামলাটি তদন্ত করে RAB। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ-৬ এর বিচারক ইমরুল কায়েশ RAB-কে তদন্ত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে তদন্তের দায়িত্ব পায় Police Bureau of Investigation (PBI)। চার বছর তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে জানায়, ৫৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি ও আলামত বিশ্লেষণে হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
PBI তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠতার’ কারণে পারিবারিক কলহ এবং স্ত্রী সামিরা হকের কারণে মা নিলুফা চৌধুরী ওরফে নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে অভিমানী সালমান শাহ আত্মহত্যা করেন।
তবে এই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট হননি নীলা চৌধুরী। তিনি আদালতের কাছে আরও তদন্তের আবেদন জানান।
২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ PBI-এর প্রতিবেদন গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতি দেন। এরপর পরিবার মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করে।
২০২২ সালের ১২ জুন রিভিশন আবেদন গ্রহণ করা হলেও বিভিন্ন কারণে শুনানি হয়নি। পরে গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন।
তিনি সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ ও রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি যুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন এবং রমনা মডেল থানা পুলিশকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, এজাহারনামীয় আসামিসহ অজ্ঞাতনামা পলাতকরা ‘পূর্ব পরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ্কে হত্যা করেছে।’