দেশের কয়েকটি নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীদের বিভিন্ন অভিযোগ ও বিচ্ছিন্ন ঘটনার খবর পাওয়া গেলেও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দাবি করেছেন, "এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর ছিল"।
ভোটগ্রহণ শেষে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ভোটের হার। নানা জল্পনা-কল্পনার মধ্যে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বেলা দুইটা পর্যন্ত দেশের ৩৬ হাজারের বেশি কেন্দ্রে গড়ে ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ ভোট পড়েছে।
ভোট শেষ হওয়ার আধঘণ্টা আগে জামায়াতে ইসলামী জানায়, জনগণ ভোটকেন্দ্র দখলের অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছে। তবে একই সঙ্গে দলটি অভিযোগ করে, বিভিন্ন স্থানে জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা, পোলিং এজেন্টদের ওপর হামলা ও নারীদের হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে এবং কয়েক জায়গায় কেন্দ্র দখলের চেষ্টাও হয়েছে।
এর আগে দুপুরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সারাদেশে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলছে।
বেলা সাড়ে চারটায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়। এরপর শুরু হয় ভোট গণনার প্রক্রিয়া। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে সারাদেশে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছিল।
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে এবারই প্রথম পোস্টাল ভোট গ্রহণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত ছয় লাখ ৪৮ হাজার পোস্টাল ব্যালট নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা পড়েছে বলে জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ।
অন্তর্বর্তী সরকার কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখায় আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। অন্যান্য দলের অংশগ্রহণে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুরের একটি আসনে ভোট হয়নি।
জামায়াতের জোটসঙ্গী এনসিপি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, পোলিং এজেন্টদের বাধা, ব্যালট ছিনতাই ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ তোলে।
দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মনিরা শারমিন অভিযোগ করেন, বিভিন্ন স্থানে ভোট রিগিং বা ভোট জালিয়াতি এবং ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে।
কুমিল্লা-৮, শরীয়তপুর-২ ও পটুয়াখালী-১ আসনসহ কয়েকটি কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি এ তিনটি আসনের ভোট স্থগিতের দাবি জানিয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও কুমিল্লায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলেও ভোট বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অসুস্থতাজনিত কারণে কয়েকটি জেলায় এক পোলিং কর্মকর্তাসহ অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা অভিযোগ করেন, নানা অজুহাতে তার পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের অভিযোগ, কুমিল্লার লাকসামের বরুড়া এলাকায় তাদের পোলিং এজেন্টদের কয়েকটি কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা-১৫ আসনের মনিপুর গার্লস স্কুল কেন্দ্রে প্রতিপক্ষের সমর্থকরা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে বলে জানান জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান।
ফরিদপুরে ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে ভোট কেনার অভিযোগে এক পোলিং এজেন্টকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি।
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে আগানগর ইউনিয়নের একটি কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে দায়িত্ব পালনকালে এক পোলিং কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে।
খুলনায় কেন্দ্রের বাইরে জামায়াত কর্মীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির মধ্যে এক বিএনপি নেতার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। বিএনপির দাবি, জামায়াত কর্মীদের ধাক্কায় ঘটনাটি ঘটে।
মানিকগঞ্জ-১ আসনের মহাদেবপুরে ভোট দিতে গিয়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রামের কাজীর দেউর বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এক ভোটারের মৃত্যু হয়।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বিভিন্ন আসনে অনিয়মের অভিযোগ তোলে। তাদের দাবি, কোথাও আগেই ভোট হয়ে গেছে, কোথাও হাতপাখা প্রতীকের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। ভোলা ও নরসিংদীতে হামলার অভিযোগও করে দলটি।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি কেন্দ্রে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণে আতঙ্ক ছড়ালেও বিজিবি ও সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
কুমিল্লা-১০ আসনে একটি কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ব্যালট ছিনিয়ে ধানের শীষে সিল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা বাক্সে ঢোকানো যায়নি বলে জানান প্রিজাইডিং অফিসার মো. আমজাদ হোসেন।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বিকেলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।
ময়মনসিংহ-১১ আসনের একটি কেন্দ্রে প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার ঘটনায় প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও দুই পোলিং কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
যশোর সদরে একটি কেন্দ্রে সিল চুরি ও ব্যালট সংকটে কিছু সময় উত্তেজনা দেখা দেয়।
নির্বাচন শেষে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গণভোট শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হওয়ায় জাতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে তিনি বলেন, "এই নির্বাচন আমাদের জন্য মহা আনন্দের ও উৎসবের। এর মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের এক অভূতপূর্ব যাত্রা শুরু হলো। এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর ছিলো। এই ধারা ধরে রাখা সম্ভব হলে আমাদের গণতন্ত্র উৎকর্ষের শিখরে যাবে"।
জয় ও সরকার গঠনের আশা
ভোট শেষে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতাকর্মীদের কেন্দ্র না ছাড়ার আহ্বান জানায়।
সকালে ভোট দেওয়ার পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জয়লাভের আশা প্রকাশ করেন।
বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানানো হয়, "সারা দেশে উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে বহুল আলোচিত ঐতিহাসিক গণভোট..."
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানও জয় ও সরকার গঠনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দলটির পোস্টে বলা হয়, "পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত কেউ ভোটকেন্দ্র ছাড়বেন না"।