আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ করতে যাচ্ছেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু ও নতুন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নিয়ে জনমনে আগ্রহ বেড়েছে। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ঠিক কোথায় উঠবেন—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থায়ী সরকারি বাসভবন নেই। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন **গণভবন**কে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নতুন বাসভবন নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী কোথায় থাকবেন—সে বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়েই অন্তর্বর্তী সরকার গণভবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।
যদিও রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার জন্য ২৯ নম্বর বাড়ি এবং হেয়ার রোড ও বেইলি রোডে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জন্য ১৫টি বাংলো ও অ্যাপার্টমেন্ট বরাদ্দ রয়েছে। পাশাপাশি বেইলি রোডে তিনটি মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্টে ৩০ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর থাকার সুবিধাও আছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রস্তুত কোনো নির্ধারিত বাসভবন বর্তমানে নেই।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান কোথায় থাকবেন? সরকারি ও বেসরকারি মহলে এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। একাংশের মতে, বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস দায়িত্ব ছাড়ার পর রাষ্ট্রীয় বাসভবন যমুনা-ই হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর ঠিকানা। তবে তা বাস্তবায়ন করতে অন্তত দুই মাস সময় লাগবে। কারণ নিয়ম অনুযায়ী বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনুস কিছুদিন সেখানে থাকার অধিকার রাখেন। তিনি কবে যমুনা ছাড়বেন, সেটিও এখনো নির্দিষ্ট নয়। তাছাড়া নতুন প্রধানমন্ত্রীর বসবাসের উপযোগী করতে যমুনা সংস্কার ও আসবাব সংযোজনেও সময় লাগবে।
অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করছেন মায়ের স্মৃতির কারণে তিনি **ফিরোজা**য় থাকতে পারেন। আবার গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাড়িতেও থাকার আলোচনা রয়েছে। লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর পরিবারসহ তিনি বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকেই তেজগাঁওস্থ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দাফতরিক কাজ চালাতে পারেন। ইতোমধ্যে ওই বাড়িসহ আশপাশের এলাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—সেখানে তিনি কতদিন থাকতে পারবেন? কারণ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে শুধু পরিবারের জন্য নয়, দাফতরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের আবাসনের ব্যবস্থাও থাকতে হয়, যা গুলশানের ওই বাড়িতে নেই।
আরেকটি মত হলো—নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য আলাদা করে নতুন বাসভবন নির্মাণ। তবে সেটি সময়সাপেক্ষ। সব আলোচনা মিলিয়ে বিষয়টি নির্ভর করবে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত পছন্দ এবং প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ফোর্স, বিশেষ করে এসএসএফ (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স)-এর পরামর্শের ওপর।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশের মতে, রাষ্ট্রীয় বাসভবন যমুনা স্বল্পমেয়াদি সরকারপ্রধানের জন্য উপযোগী হলেও পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর জন্য নিরাপদ নয়। তিন দিক থেকে ব্যস্ত সড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপ্রতুল বলে তারা মনে করেন।
গত বছরের ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাসভবন নির্ধারণে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্থাপত্য অধিদফতর ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা ছিলেন। শুরুতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন একীভূত করার চিন্তা করা হলেও বাস্তব কারণে তা বাদ পড়ে। কারণ এতে তাদের বিকল্প বাসস্থানের প্রশ্ন এবং স্থপতি লুই আই কান–এর নকশা সংরক্ষণের বিষয়টি জড়িত ছিল।
পরবর্তীতে শেরেবাংলা নগরের পরিত্যক্ত বাণিজ্যমেলার মাঠে নতুন বাসভবন নির্মাণের বিষয়ও বিবেচনায় আসে। সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছাকাছি হলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে সেটিও বাতিল করা হয়।
বর্তমানে এ বিষয়ে সরকারের কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প বা কর্মসূচির কথা জানা যায়নি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—নির্বাচিত সরকারের নতুন প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত কোথায় থাকবেন?
সদ্য বিদায়ী মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন,
“নতুন প্রধানমন্ত্রী আপাতত যমুনায় থাকবেন, এটি তার জন্য নির্দিষ্ট করে ধরে রাখা হয়েছে।”
তবে যমুনায় দায়িত্ব পালনকারী এপিবিএন সদস্য এম এ মেনন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,
“যমুনা কোনোভাবেই ভিভিআইপিদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান নয়। রাস্তা দিয়ে ঢিল মারলেও তা ভবনের দোতলায় কাচের জানালায় গিয়ে লাগবে… ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটি উপযোগী নয়।”
এ বিষয়ে ভিন্নমত দেন গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। তার ভাষায়,
“বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টা যেখানে আছেন সেটিই আপাতত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হতে পারে, তবে আমি নিশ্চিত নই। নতুন প্রধানমন্ত্রী নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন ওনার জন্য কোনটি যথাযথ হবে।”
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা মূলত বিদেশি অতিথিদের জন্য নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ভাইস প্রেসিডেন্ট মওদুদ আহমদ–এর জন্য যমুনা বরাদ্দ হলেও সেখানে ওঠার আগেই সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানরা অস্থায়ীভাবে যমুনায় অবস্থান করেছেন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানসহ আগের তিনজন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানও সেখানে ছিলেন।