বাংলাদেশে একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
এবারই প্রথম জামায়াতের কোনো আমির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা জানালেন। তিনি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের সংসদ সদস্যদের নিয়ে এই শ্রদ্ধা জানান। জামায়াত শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে এখনো নাজায়েজ মনে করে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
অন্যদিকে এবারই প্রথম প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা জানানো শেষে সেখানে দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন। পরে দলীয় চেয়ারম্যান হিসেবে বিএনপি নেতাদের নিয়ে এবং এরপর তার স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
ওদিকে সাধারণত একুশের প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আগে এসে শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে দেখা যেত প্রধানমন্ত্রীকে। কিন্তু এবার রাষ্ট্রপতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করে চলে যাওয়ার পর এসে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা জানানো শেষে সর্বস্তরের মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ শ্রদ্ধা জানানো শুরু করে।
তবে জাতীয় পার্টির একদল নেতাকর্মী ব্যানারসহ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য গেলেও তারা একটি রাজনৈতিক দলের একটি ইউনিটের নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়েন। একইভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শহীদ মিনারে বিএনপি কর্মীদের বাধারমুখে পড়েন বিএনবি থেকে বহিস্কৃত স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহান। তাকে ভুয়া ভুয়া ধ্বনি তুলে বাধা দেওয়া হলে তিনি এক পর্যায়ে ফুল না দিয়ে ফিরে যান। উল্লেখ্য রুমিন ফারহানার পিতা অলি আহাদ একজন খ্যাতিমান ভাষা সংগ্রামী ছিলেন।
শহীদ মিনারে কেন- প্রশ্নের জবাবে যা বললেন জামায়াতে আমির
তিন বাহিনী প্রধান শ্রদ্ধা জানানোর পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটের নেতারা। এরপর তারা শহীদ মিনারের বেদীতে দাঁড়িয়ে মোনাজাতও করেন।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ও পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মুক্তি পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলামও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
শহীদ মিনার প্রঙ্গণে একজন সাংবাদিক জামায়াত আমিরকে প্রশ্ন করেন যে, জামায়াত সাধারণত ফুল দিতে আসে না শহীদ মিনারে, এবার কী মনে করে এলেন? জবাবে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, "এবার রাষ্ট্রীয় আচার হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব। বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে এখানে আসতে হবে আমার সঙ্গীদের নিয়ে।
ওই সাংবাদিক আবার প্রশ্ন করেন, জামায়াত শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে এখনো নাজায়েজ মনে করে কিনা? জবাবে জামায়াত আমির বলেন, ‘এমন একটি পবিত্র অনুষ্ঠানে এমন প্রশ্ন কেন করছেন, এমন প্রশ্ন না করাই ভালো।’
শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে যাওয়ার সময় শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে জীবন দিয়েছেন তাদের সবাইকে আমরা স্মরণ করি। শেষ পর্যন্ত আমাদের ওসমান হাদিকেও আমরা স্মরণ করি"।
তিনি বলেন, "আমরা আসলে ভাষা শহীদদের আগে ও ৪৭ এও যারা শহীদ হয়েছে তাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। বায়ান্নর শহীদদের স্মরণ করি, একাত্তরের শহীদদের স্মরণ করি, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মরণ করি। এরপরেও যারা ফ্যাসিবাদের হাতে শহীদ হয়েছেন তাদের স্মরণ করি। বিশেষ করে সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট আমলে যারা শহীদ হয়েছে তাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। শেষ পর্যন্ত স্মরণ করি জুলাই যোদ্ধা হিসেবে জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছে তাদের সবাইকে স্মরণ করি"।
এরপর তারা আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে ভাষা শহীদদের কবর জিয়ারত করেন।
এর আগে বিভিন্ন বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে জামায়াতের সহযোগী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা হলেও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছরে দলের কোনো আমিরকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিতে দেখা যায়নি। এ প্রেক্ষাপটে এবারের উপস্থিতি রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাকে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে আবুল বরকত, সালাম, রফিকউদ্দিন এবং জব্বারসহ আরো অনেকে নিহত হন।
দিনটি বাংলাদেশ ভাষা শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। পরে ১৯৯৯ সালে দিনটিকে জাতিসংঘ 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করলে বাংলাদেশের ভাষা শহীদ দিবস ভিন্ন মাত্রা পায়।
এ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এছাড়া দেশের সব জেলা ও উপজেলাতেই শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে মানুষ।