সব আলোচনা ও জল্পনার ইতি টেনে দেশের নতুন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেন। ৫০ সদস্যের এই মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। দফতর বণ্টনেও এসেছে একাধিক চমক। অভিজ্ঞ প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি উদ্যমী তরুণদের সমন্বয়ে গঠিত এই মন্ত্রিসভাকে অনেকেই ‘সময়োপযোগী’ বলে মনে করছেন।
নতুন মন্ত্রিসভা সম্পর্কে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন,
“ব্যক্তি নয়, বরং কাজ দিয়ে এই সরকারকে মূল্যায়ন করা হবে। আমি কাজে বিশ্বাসী। মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যই সুপরিচিত। এই সমাজেরই লোক।”
মন্ত্রিসভায় বড় চমক ও দফতর বণ্টন
দফতর বণ্টনে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সিদ্ধান্ত—
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়: দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: দীর্ঘ নির্বাসন শেষে সালাহ উদ্দিন আহমেদের হাতে এই মন্ত্রণালয়। প্রত্যাশা—দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়: আ.ন.ম. এহছানুল হক মিলনের ওপর ন্যস্ত হয়েছে দায়িত্ব। অতীতে নকলমুক্ত পরীক্ষা আয়োজনের জন্য তিনি পরিচিত।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান: তরুণ নেতা নুরুল হক নুর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।
টেকনোক্র্যাট চমক: মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানকে টেকনোক্র্যাট কোটায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বিশ্লেষকদের মতে বড় চমক।
জনআকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা
শপথের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ দেখা গেছে। তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে।
ব্যবসায়ী নিজাম উদ্দিন বলেন,
“নতুন মন্ত্রিসভায় তরুণ এবং প্রবীণের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। তারেক রহমান তার রাজপথের আন্দোলনের পরীক্ষিত সহকর্মীদের পাশেই রেখেছেন অভিজ্ঞদের।”
তিনি আরও বলেন,
“দলের জন্য পরীক্ষিত, আন্দোলনে আপসহীন, সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞ আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতো মানুষকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া এবং কারাবন্দি খালেদা জিয়া, নির্বাসিত তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে বিএনপির অভিভাবক হিসেবে দায়িত্বপালনকারী ৭৯ বছর বয়সী চৌকস নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর–এর মতো নেতা আছেন এই সরকারে। তার ওপর ভরসা করাই যায়।”
শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রসঙ্গে শিক্ষক সোহরাব হোসেন বলেন,
“আ.ন.ম. এহছানুল হক মিলন অতীতে নকলমুক্ত পরীক্ষার পরিবেশ উপহার দিয়েছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ায় আমরা আশাবাদী তিনি ক্লাসরুমে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনবেন।”
তিনি আরও জানান, শিক্ষা খাতে নতুন করে সংস্কার ও মানোন্নয়নই এখন বড় প্রত্যাশা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক হেমায়েত উদ্দিন বলেন,
“সালাউদ্দিন আহমেদ নিজেই রাজনৈতিক নিপীড়নের ভুক্তভোগী। আমাদের বিশ্বাস, তিনি মৌলিক অধিকার রক্ষা করবেন এবং চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম হবেন।”
চমক হিসেবে ‘ড. খলিলুর রহমান’
সচিবালয়ের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম-সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ড. খলিলুর রহমানের অন্তর্ভুক্তি ছিল অপ্রত্যাশিত। ইউনূস সরকারের সময় তার দক্ষতা দেখা গেছে; বিশেষত পররাষ্ট্র খাতে তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের প্রত্যাশা
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন,
“আমাদের একটাই চাওয়া—নতুন বাংলাদেশ যেন দুর্নীতিমুক্ত হয় এবং সাধারণ মানুষের ওপর যেন আর গণহারে মামলা-হামলা না হয়।”
শরীয়তপুরের মোবারক হোসেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় নিয়ে বলেন,
“নুরুল হক নুর প্রবাসীদের দুঃখ-কষ্ট বোঝেন। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে বিদেশে থাকা আমাদের ছেলেদের কল্যাণে তিনি কাজ করবেন—এটাই প্রত্যাশা।”
মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ও নারী প্রতিনিধিত্ব
পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, স্বাধীনতার প্রশ্নে সরকার আপসহীন থাকবে বলে তিনি আশা করেন।
তবে নারী প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আক্ষেপ করেছেন তাহমিনা বেগম। তিনি বলেন,
“৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় মাত্র ৩ জন নারী সদস্য হওয়াটা কিছুটা অপ্রতুল। সংখ্যাটি আরও বাড়লে ভালো হতো। তবে সামগ্রিকভাবে আমি এই সরকারের ওপর বিশ্বাস রাখতে চাই; বাকিটা তাদের কাজের ওপর নির্ভর করবে।”
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ
দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরা বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ জনআস্থা ধরে রাখা। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটানোই হবে প্রথম পরীক্ষা। প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অভিজ্ঞতা এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বের সমন্বয় দেশকে কোন পথে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।