নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুদিন আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন,
“বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন।”
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না– এমন অপপ্রচারে কান না দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
“এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অপপ্রচার, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বিঘ্ন সৃষ্টি করা।
আপনারা নিশ্চিত থাকুন, নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার দায়িত্ব সমাপ্ত করবে।”
তিনি নাগরিকদের উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ‘দ্বিধাহীন চিত্তে’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
“আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দিন। দেশের চাবি আপনার হাতে। সে চাবিটি সঠিকভাবে ব্যবহার করুন। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন। এবারের ভোটের দিন হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার, এবং একই দিনে জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে গণভোটও হবে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি ২০০২৪ সালের অগাস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
ভাষণের শুরুতে তিনি বলেন,
“আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি এক অতি তাৎপর্যপূর্ণ, ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যৎনির্ধারক মুহূর্তে। আর মাত্র একদিন পর সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তার সাথে জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট। সারা জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার দিন।”
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন,
“আপামর জনগণের—বিশেষ করে জুলাইয়ের যোদ্ধাদের—আত্মত্যাগ ছাড়া এই নির্বাচন, এই গণভোট—কোনোটিই সম্ভব হতো না। সমগ্র জাতি তাই তাদের কাছে চিরঋণী।”
এই নির্বাচনের প্রভাব যে জাতির জীবনে দীর্ঘমেয়াদি হবে, তা উল্লেখ করে ইউনূস বলেন,
“রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, গণতন্ত্রের চরিত্র ও স্থায়িত্ব এবং আগামী প্রজন্মের ভাগ্য এর মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে।”
নির্বাচনের প্রচারপর্ব শান্তিপূর্ণ হওয়ায় রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও সাধারণ মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ ও সচেতনতার প্রশংসা করেন প্রধান উপদেষ্টা। তবে কিছু সহিংস ঘটনায় তিনি গভীর বেদনা প্রকাশ করেন।
ইউনূস জানান, এবারের নির্বাচনে ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, এবং স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি, যা এর আগের যে কোনো নির্বাচনের তুলনায় সর্বোচ্চ।
“এবারের নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়। এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ।”
তিনি আরও বলেন,
“এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না— একই সাথে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবারও পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট।”
নারী ও তরুণদের ভোট ও অংশগ্রহণের গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন,
“আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে—এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনদিন হারাতে দেবে না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে জানিয়ে বলেন,
“রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও ব্যাপকভাবে দায়িত্বে রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা দ্রুত ও কঠোরভাবে প্রতিহত করা যায়।”
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা, বডিক্যাম, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হবে, এবং প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পোস্টাল ভোটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি ভোটাধিকারকে সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন,
“এই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা ঠিক করি, আমাদের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।”
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন,
“নেতৃবৃন্দ যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল বা ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা না করে। কেউ যেন গুজব ছড়ায় না। রাষ্ট্র এ ধরনের আচরণ সহ্য করবে না।”
ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন,
“ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ বা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। বরং দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে।”
নির্বাচনবন্ধু হটলাইন ৩৩৩-এ ফোন করে তথ্য যাচাই করার পরামর্শও দিয়েছেন।
গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন,
“আপনার একটি ভোট শুধু কাগজে সিল নয়—এটি আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ, পরিবারের নিরাপত্তা এবং দেশের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। নাগরিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব ও অধিকার এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করুন। নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নিশ্চিত করুন।”
নির্বাচিত সরকার দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ হবে।
জাতির উদ্দেশে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন,
“আসুন উৎসবমুখর নির্বাচন বাস্তবে রূপায়িত করে এই দিনটিকে ইতিহাসের স্মরণীয় দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করি।”