ঢাকা ৩ চৈত্র ১৪৩২, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬
ঢাকা ৩ চৈত্র ১৪৩২, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬

সিটি ও জেলা পরিষদ কি বিএনপি নেতাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র?

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম

সিটি ও জেলা পরিষদ কি বিএনপি নেতাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র?
সিটি করপোরেশনের গাড়ি

🔹 সিটি থেকে জেলায় একই ধারা

বাংলাদেশের সিটি কর্পোরেশনের পর ৪২টি জেলা পরিষদেও দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এই সিদ্ধান্ত সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের উল্লসিত করলেও প্রশ্ন উঠছে—স্থানীয় সরকারের এসব প্রতিষ্ঠান বিএনপি নেতাদের ‘পুনর্বাসন কেন্দ্রে’ পরিণত হলো কি-না।


🔹 সরকারের ব্যাখ্যা

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অকার্যকর স্থানীয় সরকারকে সচল করতেই সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক প্রশাসক বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে রাজনৈতিক প্রশাসকরা ভালো কাজ করতে পারবেন।


🔹 বিশেষজ্ঞদের মত

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসক পদে রাজনৈতিক নেতারা সরকারি কর্মকর্তাদের তুলনায় ‘বেটার চয়েজ’ হলেও দলীয় নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।


🔹 সিটি কর্পোরেশনে নিয়োগ

সরকার ইতোমধ্যেই দেশের সব সিটি কর্পোরেশন থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের সরিয়ে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক করেছে। এসব নেতাদের কেউ সংসদ নির্বাচনে হেরে গেছেন, আবার কেউ দলীয় মনোনয়ন পাননি। প্রতিবেদনটি করেছেন বিবিসি বাংলা নিউজ-এর রাকিব হাসনাত।


🔹 জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক

রোববার ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকার আশা প্রকাশ করেছে—এতে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।


🔹 নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৮ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নিয়েই দ্রুত নির্বাচনের কথা বলেছিলেন। তবে বাস্তবে প্রশাসক নিয়োগের ধারা অব্যাহত রয়েছে।


🔹 দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামো

বর্তমানে দেশে রয়েছে—

  • ১২টি সিটি করপোরেশন

  • ৩৩০টি পৌরসভা

  • ৬৪টি জেলা পরিষদ

  • ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ

  • প্রায় ৪,৫৭০টি ইউনিয়ন পরিষদ


🔹 পটভূমি: সরকার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সব সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা ও পৌরসভার মেয়রদের অপসারণ করে। তখন অধিকাংশই ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা। অনেকে আত্মগোপনে যান, কেউ কেউ আটক হন।


🔹 প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া

এই পরিস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। উপজেলা ও পৌরসভায় এখনও সরকারি কর্মকর্তারা দায়িত্বে থাকলেও সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে রাজনৈতিক নেতাদের বসানো হয়েছে।


🔹 বিএনপি সরকারের সিদ্ধান্ত

সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতায় আসে। এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ ছয় সিটিতে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।


🔹 প্রজ্ঞাপনের ব্যাখ্যা

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশন আইন অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ কাঠামো গঠিত না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।


🔹 বিভিন্ন সিটিতে নিয়োগপ্রাপ্তরা

ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, খুলনা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সিলেটে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক করা হয়। পরে বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও কুমিল্লাতেও একই ধারা অনুসরণ করা হয়।


🔹 রাজনৈতিক যুক্তি

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন,
“জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে রাজনৈতিক প্রশাসকরা ভালো কাজ করতে পারবেন। তাই অকার্যকর স্থানীয় সরকারকে সচল করতে এই সিদ্ধান্ত।”


🔹 জেলা পরিষদেও একই চিত্র

সিটি কর্পোরেশনের পর ৪২টি জেলা পরিষদেও প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলার বিএনপি নেতারা।


🔹 বিশেষজ্ঞের মন্তব্য

স্থানীয় সরকার কমিশনের সদস্য তারিকুল ইসলাম বলেন,
“নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই সবচেয়ে প্রয়োজন। তবে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রশাসকরাই ভালো, কারণ সরকারি কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কাজ করতে পারছিলেন না।”


🔹 কমিশনের সুপারিশ

কমিশন নির্দলীয় ও সরাসরি নির্বাচনের ওপর জোর দিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন,
“দলীয় প্রভাব কমিয়ে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না করার সুপারিশ ছিল।”


🔹 নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা

অনেকেই আশা করেছিলেন সংসদ নির্বাচনের পর দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে। কিন্তু দলীয় প্রশাসক নিয়োগে সেই সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।


🔹 মন্ত্রীর ফেসবুক বার্তা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লিখেছেন,
“জনগণের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতেই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।”


🔹 সেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ

কাউন্সিলর না থাকায় সিটি কর্পোরেশনগুলোতে জনসেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন না হওয়াই এর মূল কারণ।


🔹 ‘সান্ত্বনা’ না ‘পুরস্কার’?

রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে—
প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে কাউকে ‘সান্ত্বনা’ আবার কাউকে ‘পুরস্কার’ দেওয়া হয়েছে।


🔹 আইপিডির মতামত

ইন্সটিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন,
“নির্বাচনের উদ্যোগ না নিয়ে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ ভালো ইঙ্গিত দেয় না। এটি পুনর্বাসনের মতো দেখাচ্ছে।”


🔹 ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

তিনি আরও বলেন,
“প্রশাসক নিয়োগ একটি কুপ্রথা। নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান কার্যকর থাকে না এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধতাও কমে যায়।”


🔹 বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া

ছয় সিটিতে নিয়োগের পর জামায়াতে ইসলামী তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন,
“দলীয় পদধারীদের প্রশাসক নিয়োগ গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি এবং নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।”