ঢাকা ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬
ঢাকা ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ
মার্কিনিদের মধ্যপ্রাচ্য এখনই ছাড়ার নির্দেশ সৌদির মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলা, প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি হুঁশিয়ারি নিজেকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করে গেছেন ইউনূস, এক বছর পাবেন এসএসএফ নিরাপত্তা ইরানে হামলা চালিয়ে ট্রাম্প মার্কিনীদের সমর্থন হারাচ্ছেন? বেশ কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের খবর নিশ্চিত করল কুয়েত ইরানের হামলায় এবার বাহরাইনে এক বাংলাদেশি নিহত খামেনির মৃত্যুতে ইরানে শোকের মাতম : উল্লাস করছে কারা? ইরানের হামলার পরিণতি: আমিরাতে এক বাংলাদেশি নিহত খামেনির অবস্থান কীভাবে চিহ্নিত হয়, হত্যা করল কীভাবে? চাপের মুখে মাথা নত না করা ইরানি নেতা খামেনি, যেভাবে সর্বোচ্চ নেতা হয়েছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি নিহত, ৪০ দিনের শোক, জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার প্রেসিডেন্টের ইরানের পাল্টা হামলার মুখে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী সব ফ্লাইট স্থগিত ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল খুলনায় যুবদল নেতাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা ডান্ডাবেড়ি পায়ে বাবাকে শেষবারের মতো দেখলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা ধানমন্ডিতে মহিলা আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল পাকিস্তান সেবা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতায় ইস্ট লন্ডন মসজিদের পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা লন্ডনে সিভিক অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত সাংবাদিক তাইসির মাহমুদ নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়া কিশোরীকে অপহরণের পর হত্যা ৫ মামলায় হাইকোর্টে জামিন পেলেন সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যান্ড ওয়ারফেজ–কে একুশে পদক দিলেন প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ এমপি টিউলিপকে গ্রেপ্তারে ‘রেড নোটিস’ জারির পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের যুক্তরাজ্যের ৫১৮ ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ ফিতরা সর্বনিম্ন ১১০ টাকা, সর্বোচ্চ ২৮০৫ পোশাক ব্যবসায়ীকে গভর্নর বানালো সরকার, ইতিহাসে প্রথম কারা খুলছে আওয়ামী লীগের কার্যালয়, আসল পরিকল্পনা কী? ১৭ মাস পর কলকাতা-ঢাকা -আগরতলায় বাস চলাচল শুরু সংসদের প্রথম অধিবেশন: স্পিকারের আসনে বসবেন কে? ১৯৭৩ সালের নজির কি অনুসরণ হবে?

হেঁটে হেঁটে হাকালুকি

প্রকাশিত: ০৪ মার্চ ২০২০, ০৮:২৪ পিএম

হেঁটে হেঁটে হাকালুকি
টিলার ভেতর থেকে ঢালুপথ বেয়ে নিচে নেমে আসার সময় দেখতে পেলাম অপরুপ সেই দৃশ্যটি। কমলালেবুর মত ছোট ছোট পাতা আর সরু কান্ডের আগরের বনের নিচের অংশে যেন জমাট বেঁধে আছে ধোঁয়াশে মেঘদল। দেখতে মেঘের মতই এই জমাট বাধা ঘন কুঁয়াশার চাদরে যেন থমকে আছে বিশ্বচরাচর। প্রকৃতি চুপচাপ, গাছের পাতারাও যেন নিরবে ঠায় দাড়িয়ে আছে। বাতাসে চাঞ্চল্য আনতে হঠাৎ কৈশোরের দুষ্টুমি মাথায় খেলা করল। হাত দু’টো তরবারির মত বাঁকিয়ে লাফিয়ে ওঠে বাতাসে কোপ চালাই। জমে থাকা কুঁয়াশার দঙ্গল থমকে ওঠে দুইপাশে সরে যায়। বাড়তি পাওনা হিসেবে হাঁড়-মাংস থেকে কিছুটা ঠান্ডা বেরিয়ে গিয়ে শরীরও একটু উত্তাপ পায়। সাতসকালে আমাদের এই বেড়িয়ে পড়া হাকালুকি হাওরের উদ্দেশ্যে। দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি বড়লেখা, জুড়ি, কুলাউড়া, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা ছাড়াও সিলেট ও মৌলভীবাজারের আরো কয়েকটি উপজেলা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। হাকালুকিতে যাওয়া যায় তাই কয়েকটি রুট দিয়েই। তবে আমাদের প্লান ছিল এবার সচরাচর পথের বদলে নতুন কোন পথে পায়ে হেঁটে হাকালুকিতে বেড়াতে যাওয়া। সেই উদ্দেশ্য নিয়ে বন্ধু সৌরভের বাড়ী রতুলীতে গিয়ে ডেরা বেঁধেছিলাম আগের দিনই। খুব ভোরেই মারুফ এসে পৌছার পর কনকনে ঠান্ডার মধ্যে শীতের কাপড় ভালভাবে গায়ে জড়িয়ে তিনজন বেরিয়ে পড়লাম। রতুলীর পরই পড়ল কামিলপুর। এই গ্রামটিতেও সুগন্ধি বৃক্ষ আগরের নিসর্গ পথে পথে চোখে পড়ে। গ্রামের পাকা রাস্তা শেষ হয়ে এলে আমরা একটি ছড়ার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে থাকলাম। ভরা শীতের সময়েও ছড়াটি কানায় কানায় ভরপুর। এর পানিও একদম টলটলে পরিষ্কার। সৌরভ জানালো ছড়াটির নাম হচ্ছে মাধবগাঙ্গ। নাম শুনেই আন্দাজ করেছিলাম এর উৎস সম্পর্কে। পাথারিয়া পাহাড়ের বুকে মাধবকুন্ড জলপ্রপাত থেকেই আসছে এর এমন পরিষ্কার পানির প্রবাহ। মাধবগাঙ্গের পাড় জুড়ে কলমীবনের বেশ আধিপত্য। ছড়ার পাশের উর্বর জমিতে রবি শস্যের আবাদ দেখতে পেলাম। শর্ষে আর সয়াবিনের ফুল যেন হলুদ কার্পেটে মুড়িয়ে রেখেছে মাঠ। কলমী পাতা আর শর্ষে ফুলের পাঁপড়ি বেয়ে ঝরে পড়া মুক্তোর দানার মত শিশির বিন্দুতে মন জুড়িয়ে যায়। ফসলের মাঠ শেষ হয়ে হয়েছে একটি টিলার পাদদেশে গিয়ে। টিলাটি ঘন বাঁশঝাড়ে ঢাকা। বাঁশবন আর লতা গুল্ম ঝোপের ফাঁক-ফোকরের ট্রেইল দিয়ে হাঁটার পথ খুঁজে নিলাম। টিলা থেকে বের হলে মাধবগাঙ্গের পারে আবার নিজেদের আবিষ্কার করলাম। সামনেই পড়লো ধনুকের মত বাঁকানো একটি সেতু। সেতুটি পার হয়ে এসে পথের বাঁক পেরোতেই রাস্তা লাগোয়া একটি ঝোপ নড়েচড়ে ওঠলো। সচকিত হয়ে তাকাতেই সেখান থেকে বেরিয়ে এলো চার-পাঁচটি তিতির পাখি। তিতির গৃহপালিত পাখি হলেও সেটি এখন বেশ বিরল। তারা যেন অনাহুত আগন্তুকদের এ সময় আশা করেনি। তাই বিচিত্র শব্দে ডাকতে ডাকতে পালিয়ে যায়। তারপর শতবর্ষী একটি মসজিদের সামনে এসে পড়লাম। মসজিদটির নামফলক থেকে জানলাম নির্মাণকাল বৃটিশ আমলে, ১৯০৪ সালে। আমাদের পা চলতে থাকে আর পথে পথে টিলা-বনবনানী, আগরবাগান, বসতবাড়ি, পুকুরঘাট, ফসলিজমি, জলাভূমি পেছনে চলে যেতে থাকল। হাঁটতে হাঁটতে আজিমগঞ্জ বাজার পেছনে ফেলে আমরা সালদীঘায় গিয়ে থামি। হাকালুকি পারের শেষ গ্রাম এটাই। গ্রামটির মাঝ বরাবর চলে গেছে জুড়ি উপজেলা পর্যন্ত পাকা রোড। দাসের বাজার থেকে শুরু হয়ে এই রোডটির প্রায় পুরোটাই চলে গেছে হাওরের পাশ বেয়ে। বর্ষায় হাকালুকির উত্তাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে এর গায়ে। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ রোডের আদতে এটিকে হাওর ড্রাইভ রোড বললেও অবশ্য মন্দ হতো না। সালদীঘা থেকে হাওরের দিকে চলে যাওয়া মেঠোপথ ধরে হাঁটার সময় রাস্তার একপাশে ঘন মুর্তার বন দেখতে পেলাম। এসব মুর্তা দিয়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য শীতলপাটি বানানো হয়। মুর্তা বনের ফাঁকে ফাঁকে মাথা উচিয়ে আছে হিজল গাছ। হিজলের ডালে ডালে কানের দুলের মত ঝুলে আছে হিজল বীজের লতা। ছবি তোলার ফাঁকে বাকি দু’জন থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলাম। সৌরভের ডাক শুনে জোর পায়ে সামনে গেলাম। সে ঝোপের ফাঁক দিয়ে আঙুল তাক করে একটি হিজল গাছ দেখালো। তাকিয়ে দেখলাম গাছটিতে একটি খোড়ল। তার ভেতর কিছুটা ঘাস-পাতা। এ ধরণের খোড়লের ভেতর পেঁচা বাসা বানিয়ে থাকে। হাওরপারের মানুষজন মেঠোপথের ধূলো উড়িয়ে বেরিয়ে পড়তে শুরু করেছে। হাকালুকির শিশির ভেজা সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে আমরা বেশ বড়সড় একটি জলার সামনে গিয়ে থামলাম। পুরো জলাটি লাল শাপলায় ভরপুর। রক্তিম আভায় ফুটে থাকা ফুলগুলো যেন একেকটি ঝলঝলে তাঁরা। সূর্যের আলো কুঁয়াশার চাদর ভেদ করে তখনো না উঠতে পারলেও শাপলার আলোয় যেন ভরে আছে পুরো জলাটি। জলার পানিতে কয়েকটি পানকৌড়ি বিরামহীন ডুব দেয়া আর ভুস করে মাথা তোলার খেলায় মেতেছিল। কিছু আবার আহারপর্ব সেরে বাঁশের কঞ্চিতে বসে পাখা ছড়িয়ে গা গরম করছিল। জলার পরিষ্কার পানিতে কিছু ডিঙি নাও ডুবিয়ে রাখা। হাওরে পানি বাড়লে এই নৌকাগুলোই হয়ে যাবে মানুষের চলাচলের একমাত্র উপায়। আমাদের বিমূঢ়তায় ছেদ কেটে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল একঝাঁক পরিযায়ী পাখি। পাখির দলটি যাচ্ছে হাওরের আরো গভীরের দিকে। জলা পেরিয়ে আমরা হাওরের মাঝে কিছুটা উঁচু একটা জায়গায় এসে দাড়ালাম। বড়সড় একটি পাকুড় গাছের নিচে দেখতে পাই শ্যাওলা ধরা পুরনো পাকা দেয়াল। চারকোনা দেয়ালটির ভেতরেও বট পাকুড়ের চারা জন্মেছে। কাছেই পড়েছিল কিছু পরিত্যক্ত কাঠের টুকরো। কৌতূহল মেটানোর জন্য কাউকে খুঁজছিলাম। কিছুটা দূরে বোরো ধানের চারা বুনছিলেন একজন চাষী। তার কাছ থেকে জানলাম, এটা শ্মশানঘাট। আমরা হাওরের মাঝে জলার ধারে ধানখেতের আল দিয়ে হাঁটতে থাকি। কিছুটা দূরেই ছিল নখখাগড়ার একটি ঝোপ। ঝোপটির কাছে যেতেই বাতাস কাঁপিয়ে উড়ে গেল একঝাঁক সরালী হাঁস। চোখের ঘোর কাটিয়ে দেখি ডানার জল ফেলে তাদের উড়ে যাওয়া। এরপর আরেকটু সামনে পেয়ে গেলাম লম্বা লম্বা পায়ের অনেক গুলো সাদা বক। কোনটা মেপে মেপে পা ফেলে কাদার ভেতর ঠোঁট ডুবিয়ে শিকার খুঁজছে। কোনটি আবার একপায়ে দাড়িয়ে পালকগুলো ফুলিয়ে যেন ধ্যানে মগ্ন। মাথার ওপর দিয়ে তীক্ষè স্বরে একটি মেছো ঈগল হাওরের জলায় ছোঁ মেরে উড়ে গিয়ে দূরে একটি গাছের উচুঁ ডালে বসল। কুঁয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্য ওঠার পর রোদ গায়ে চড়তে থাকলে আমরা পাকুড় গাছটির ছায়ায় ফিরে গেলাম। যেতে চাইলেঃ বড়লেখা হয়ে হাকালুকি হাওরে যেতে চাইলে ধরতে হবে ঢাকা-বিয়ানীবাজার রুটের বাস। ভাড়া পড়বে পাঁচশ’ টাকা। বাস নামিয়ে দেবে বড়লেখায়। এছাড়া সিলেটের ট্রেনে কুলাউড়ায় নেমে লোকাল পরিবহনেও বড়লেখায় যাওয়া যাবে। মানসম্পন্ন হোটেল পাবেন বড়লেখা বাজারে। বড়লেখা বাজার থেকে হাওর পর্যন্ত রিজার্ভে সিএনজি পাওয়া যাবে। তবে ভোরের হাওর দেখার সবচে’ ভাল উপায় হাওরের ধারেকাছে কোথাও ক্যাম্পিং করে থাকা। শিমুল খালেদ : ভ্রমণ ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক এবং ব্যাংক কর্মকর্তা।