মিশরে দুই বাংলাদেশিকে অপহরণ করে শিকল দিয়ে বেঁধে নির্যাতন এবং তাদের পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে তিন বাংলাদেশি নাগরিককে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত।
দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালত সোমবার (৩১ আগস্ট) এ রায় দেন।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মো. আলাউদ্দিন (মুসা) (৩২), বাবা মো. জাহের ভূঁইয়া; সুনামগঞ্জের মো. আজাদ মিয়া (৩৬), বাবা আব্দুল বারিক এবং সোলায়মান নূর (২৯), বাবা নূর হোসেন।
চাকরির প্রলোভনে ডেকে শিকল দিয়ে নির্যাতন
জানা যায়, ২০২৫ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দুই বাংলাদেশিকে কায়রোর গিজা জেলার বুলাখ আল-ডাকরুর এলাকার একটি বাসায় ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের শিকল দিয়ে বেঁধে মারধর ও নির্যাতন করা হয়।
নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে তা বাংলাদেশে থাকা ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। পরে তাদের মুক্তির বিনিময়ে প্রত্যেকের পরিবারের কাছে আট লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মিশরে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
ভিডিওটি দেখে ২০২৫ সালের ৯ জুলাই মধ্যরাতে মার্গ এলাকার এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী কয়েকজন প্রবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বুলাখ আল-ডাকরুর এলাকায় আলাউদ্দিনের বাসায় যান। সেখানে গিয়ে তারা অপহৃত দুই বাংলাদেশিকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন।
প্রথমে অভিযুক্তরা দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানায়। দীর্ঘ সময় ধরে ডাকাডাকি ও দরজা খোলার অনুরোধ করা হলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
একপর্যায়ে বাইরে জড়ো হওয়া প্রবাসীরা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের প্রস্তুতি নিলে বাড়ির মালিক এতে আপত্তি জানান। এ সময় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ও হৈচৈ দেখে আশপাশের বাসিন্দারা পুলিশে খবর দেন।
খবর পেয়ে বুলাখ আল-ডাকরুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাসার ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের দরজা খুলে বাইরে আসার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু তারা তাতেও সাড়া না দিলে একপর্যায়ে পুলিশ দরজা ভেঙে বাসায় প্রবেশ করে।
পরে বাসার ভেতর থেকে শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দুই বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে অপহরণের অভিযোগে তিনজনসহ মোট পাঁচ বাংলাদেশিকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
পরে আটক পাঁচ বাংলাদেশিকে আদালতে হাজির করা হলে অপহৃত দুই বাংলাদেশি মিশরে অবৈধভাবে বসবাস করায় তাদের সম্মানের সঙ্গে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন আদালত। এমনটিই জানিয়েছেন মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসে সাবেক এক কর্মকর্তা।
তবে অপহরণের অভিযোগে অভিযুক্ত তিন বাংলাদেশির বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তিন আসামিকেই পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। রায়ের পর দণ্ডপ্রাপ্তদের সরকারি কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তিন বাংলাদেশির কারাদণ্ডের বিষয়ে দূতাবাসের বক্তব্য
এ বিষয়ে মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, গিজা জেলার বুলাখ আল-ডাকরুর থানায় পুলিশের দায়ের করা অপহরণ মামলায় অভিযুক্ত তিন বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে আদালতের ফৌজদারি মামলার রায় অনুযায়ী তাদের কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বিষয়টি দূতাবাসকেও অবহিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অভিযুক্ত মুসাকে নিয়ে ব্যবসায়ীর অভিযোগ
মার্গ এল আরব এলাকার পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান ‘রহমান অ্যাপারেলসে’র কর্ণধার মজিবুর রহমান জানান, আলাউদ্দিনের পরিচিত নাম ‘মুসা’। একসময় তিনি তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। সেই সুযোগে তার কাছ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ মিশরীয় পাউন্ড নিয়ে মুসা পালিয়ে যান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মজিবুর রহমানের অভিযোগ, পরবর্তীতে মুসা একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তোলেন। চক্রটির সদস্যরা বিভিন্ন ব্যক্তিকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে আনত। প্রথমে কফিশপে বসিয়ে আপ্যায়ন করার পর কৌশলে তাদের একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে তাদের শিকল দিয়ে বেঁধে মারধর ও নির্যাতন করা হতো। পরে নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সেগুলো ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে পাঠানো হতো এবং বড় অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মজিবুর রহমান আরও দাবি করেন, বাংলাদেশে মুসা ওরফে আলাউদ্দিনের বাবা ও বড় ভাই মুক্তিপণের অর্থ গ্রহণ করতেন। টাকা পাওয়ার পর ভুক্তভোগীদের ছেড়ে দেওয়া হতো বলেও জানান তিনি।
মজিবুর রহমান বলেন, এমনই এক ভুক্তভোগী তার কাছে এসে সহযোগিতা চাইলে তিনি তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে প্রথমে অভিযুক্তদের নাম ধরে ডাকেন এবং দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলেন, তোমরা বেরিয়ে আসো, কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি বাড়ির মালিকও দরজা ভাঙতে রাজি হননি।
তিনি বলেন, প্রায় সাত ঘণ্টা চেষ্টা করার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন। পরে তারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে অভিযুক্তদের আটক করেন এবং শিকল দিয়ে বাঁধা দুই বাংলাদেশিকে উদ্ধার করেন।
রায়ে সন্তোষ প্রবাসী বাংলাদেশিদের
আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে মজিবুর রহমান বলেন, তাদের শাস্তি হওয়ায় আমি এবং মিশরে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা অত্যন্ত আনন্দিত ও স্বস্তি বোধ করছি।
তিনি আরও বলেন, মিশরে এ ধরনের অপহরণকারী চক্রের আরও সদস্য থাকতে পারে। তাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং এ ধরনের অপরাধ নির্মূল করা জরুরি। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে নতুন করে মিশরে আসা প্রবাসীরা এ ধরনের চক্রের প্রতারণা ও অপহরণের শিকার হচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতি এ ধরনের অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মজিবুর রহমান বলেন, নতুন আসা প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মতো ঘটনা বন্ধে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি শিক্ষার্থীদের এমন মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার আহ্বান জানান, যারা ‘দয়ালু কিন্তু অজ্ঞ নন’ এবং ‘যোগ্য কিন্তু অহংকারী নন’।
পরিচিত ও স্বস্তিকর গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার জন্যও শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পরিবর্তনশীল বিশ্বে শিক্ষার্থীরা যখন পথ হারিয়ে ফেলবেন, তখন তাদের হৃদয়ে থাকা ‘উন্মুক্ততা, ভাগ করে নেওয়া এবং সেবা’—এই মূল্যবোধ অনুসরণ করার পরামর্শ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ঘিরে মানবপাচারের মতো একটি জটিল সামাজিক ও মানবিক সমস্যা নিয়ে গবেষণার জন্য ইয়াসমিনের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তার একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের গবেষণা ও মানবাধিকারভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।