রাজধানীর তপ্ত দুপুরে ব্যস্ত সড়কে এক স্বজনের কোলে চাদরে মোড়ানো তিন বছর বয়সী সাদমানের নিথর দেহ। তিনি ছুটে চলেছে উদভ্রান্তের মতো, এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবিটি দেখার পর অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারছেন না। দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের টিকাদানে অবহেলা এবং চিকিৎসাসেবা পেতে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
সাদমানের বাবা মোহাম্মদ সজীবের ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুকলে চোখে পড়ে একটি ছবি। সাদা জমিনে কারুকাজ করা পাঞ্জাবি পরে সাদমান মিষ্টি হাসি দিচ্ছে। কপালে বড় একটি কালো নজরটিপ। ছবিটি গত ঈদের দিনের।
সাদমানের মা আফসিন মীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তো মা। ছেলে যখন বাইরে যেত বা আমার চোখে ছেলেকে দেখতে খুব সুন্দর লাগত, তখন নজরটিপ দিয়ে দিতাম, যাতে নজর না লাগে। সেই তো নজরই লাগল।’
সাদমান আলী ছিল সজীব–মীম দম্পতির একমাত্র সন্তান। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে সজীব লিখেছিলেন, ‘আমার পৃথিবী’।
শিশু সাদমানের চাদরে ঢাকা ছবিটি গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া সেই ছবিটি সাদমানের মা–বাবাও দেখেছেন। বাবা ছবিটি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘আহা, আমার বাচ্চারে, কই গেলি রে, আমারে ছাইড়া।’
হামে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে—এই আশায় ১৬ এপ্রিল সাদমানকে রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু হামসহ নানা জটিলতায় সাদমান কামরাঙ্গীরচরের বাসায় ফিরেছে লাশ হয়ে। হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় তার মৃত্যু হয়।
সাদমানের মা আফসিন মীম বলেন, ‘ফেসবুকজুড়ে শুধু আমার বাবুর ছবি। মন চায় না এ ছবি দেখতে, তার পরও চোখের সামনে আসছেই।’
হামের প্রকোপ বাড়তে থাকায় বাড়তি সতর্কতা হিসেবে সাদমানকে আশপাশের অন্য শিশুদের সঙ্গে সেভাবে মিশতে দিতেন না বলে জানান আফসিন। তিনি বলেন, মারা যাওয়ার ঠিক আগে ছেলের জন্য ইনজেকশন কিনতে হাসপাতালের নিচে নেমেছিলেন। ইনজেকশন নিয়ে ফিরে এসে দেখেন, সে তার নানির কোলে। বড় চিকিৎসক এসে ছেলের বুকে–পেটে চাপ দিচ্ছিলেন; কিন্তু বাবু নড়ে না, চোখ বন্ধ। এরপর এক চিকিৎসক সাদমানকে চাদর দিয়ে ঢেকে দেন। সেকেন্ডের মধ্যে সব শেষ হয়ে যায়। ইনজেকশনটাও আর দেওয়া হলো না।
আফসিনের কত কথাই না মনে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘জানেন, আমার ছেলেটা খুব চঞ্চল ছিল। ওর দুষ্টুমিতে অনেকেই বিরক্ত হয়ে যেত। সেই ছেলে একদম চুপ হয়ে গেল।’
‘সাদমান সেভাবে গুছিয়ে কথা বলতে পারত না। বাবা, মা, নানা...এমন শব্দগুলো বলত। আহা... ছেলেটা যদি কথা বলতে পারত, তাহলে মারা যাওয়ার আগে ওর কোথায় কষ্ট হচ্ছিল বলতে পারত’—আক্ষেপ করে বললেন মা। জানালেন, ছেলেটা ললিপপ ও আইসক্রিম পছন্দ করত, বাবার সঙ্গে বেশি সখ্য ছিল, বাবাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না। মারা যাওয়ার পর থেকে ছেলের বাবা একেবারে চুপ হয়ে গেছেন। কারও সঙ্গে তেমন কথা বলছেন না।
প্রথমে জ্বর হলে সাদমানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক দেখে নাপা দেন। পরের দিন আবার নিয়ে গেলে কিছু পরীক্ষা করাতে বলেন। সব দেখে চিকিৎসক শরীরে র্যাশ ওঠে কি না খেয়াল রাখতে বলেন। র্যাশ দেখা দিলে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে নেওয়ার কথাও লিখে দেন।
আফসিন বলেন, ‘ছেলের শরীরে দু–একটা র্যাশ দেখা দেয়। রাতে মশারি টানাই না। প্রথমে ভাবি, মশার কামড় মনে হয়। তার পরও ছেলের বাবাকে ইউটিউবে সার্চ দিতে বলি। তখন বুঝতে পারি, ছেলেকে নিয়ে আর বাসায় থাকা যাবে না। তারপর হাসপাতালে ভর্তি করি।’
অনেকে ভেবেছিলেন, সাদমানের মরদেহ নিয়ে যিনি হাঁটছিলেন, তিনি তার বাবা। এ বিষয়ে আফসিন বলেন, তিনি তার ভাগনি জামাই। শিশুটি মারা যাওয়ার পর কারও মাথা ঠিক ছিল না। অ্যাম্বুলেন্স কতক্ষণে পাওয়া যাবে, তারও ঠিক ছিল না। তাই সিএনজি খুঁজছিলেন। হাসপাতালের সামনে সিএনজি না পেয়ে ফুটওভার ব্রিজ পার হয়ে সড়কের অন্য পাশে গেলে সিএনজি পাওয়া যায়। ওই সময় একজন সাংবাদিক ছবিটি তোলেন।
আফসিন আবারও আক্ষেপ করে বলেন, ‘মারা যাওয়ার আগের রাতে বারবার ছেলে মুখের অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলছিল। অনেক কাশতেছিল। একবার বসাই, আবার শুইয়ে দিই। মাম মাম করে পানি খেতে চায়। ওর মধ্যে অশান্তি হচ্ছে, কিন্তু কোথায় কষ্ট তা বলতে পারে নাই। আমার ছেলেটা অস্থির হয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু নার্স কাছে আসে নাই।’
সাদমানের বাবা কামরাঙ্গীরচরের একটি মার্কেটে চাকরি করেন। আফসিন একজন উদ্যোক্তা, অনলাইনে পণ্য বিক্রি করেন। ছেলের চিকিৎসায় কত খরচ হয়েছে, তার হিসাব এখনো করেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা মধ্যবিত্ত। হাসপাতালে সব ওষুধই বলতে গেলে কিনতে হইছে।’
আফসিনের কণ্ঠে ক্ষোভের মাত্রা বাড়তে থাকে। তিনি বলেন, ‘আমরা তো অনেক আশা নিয়ে হাসপাতালে গেছিলাম। ছেলের জ্বর বাড়তে বাড়তে ১০৬ ডিগ্রি হয়ে যায়। জ্বর কমে না কেন জানতে চাইলে ডাক্তাররা ধমক দেন। বলেন, শরীর মুছায় দেন। হাসপাতালে এত অবহেলা...! শত শত মা–বাবার বুক খালি হচ্ছে। হাসপাতালে গিয়ে বাবুরা ভালো হচ্ছে না কেন? সরকার কী করছে?’
-
পেপ্যাল আসছে বাংলাদেশে, ২ লাখ ফ্রিল্যান্সার পাবেন আইডি কার্ড: তারেক রহমান
-
যুক্তরাজ্যের ‘ইয়াং লিডারস অ্যাওয়ার্ড’ পাচ্ছেন ৪ বাংলাদেশি
-
বিদ্যুৎ ও ডিজেল সংকট, সারা দেশে সেচ পাম্প বন্ধ, কৃষকদের হাহাকার
-
মৌলভীবাজার ইনসানিয়া স্পেশালাইজড হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার উদ্বোধন
-
সংরক্ষিত নারী আসন : বিএনপির এমপি হলেন যারা