­
­
শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫ খ্রীষ্টাব্দ | ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭% শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের, পোশাক শিল্পে বড় ধাক্কা  » «   জাফলং ঘুরতে গিয়ে পানিতে ডুবে প্রাণ গেলো কিশোরের  » «   ১৭ বছর পরে জাতীয় ঈদগাহের ঈদ জামাতে সরকারপ্রধান  » «   ঈদ আসে, গাজায় আনন্দ আসে না  » «   এপ্রিলের মাঝামাঝি দেশে ফিরতে পারেন খালেদা জিয়া  » «   মিয়ানমারে বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পরও হামলা চালাচ্ছে জান্তা বাহিনী  » «   ঈদযাত্রা: শুক্র ও শনিবার ঢাকা ছেড়েছে ৪১ লাখ সিমধারী  » «   তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ‘ইতিবাচক’, মোংলায় আরেকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে চায় চীন  » «   মিয়ানমারে কেন এত বড় বিধ্বংসী ভূমিকম্প, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?  » «   বাংলাদেশে সাজাপ্রাপ্ত উগ্রবাদীদের মুক্তি নিরাপত্তার জন্য ‘মারাত্মক উদ্বেগের’: ভারত  » «   চাঁদ দেখা গেছে, সৌদিতে ঈদ রবিবার  » «   এনসিপি: অম্ল-মধুর একমাস পার, ভোটের পথে প্রস্তুতি কতদূর?  » «   চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকা ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে, ফায়ার সার্ভিসের সতর্কতা  » «   মিয়ানমারে ভূমিকম্প: মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে  » «   এশিয়ার দেশগুলোর ‘যৌথ সমৃদ্ধির পথরেখা’ চাইলেন ইউনূস  » «  

ঈদ আসে, গাজায় আনন্দ আসে না
মৃত্যুর ঘ্রাণে বিষাদের ঈদ




ঈদের দিনও মৃত্যু দেখতে হলো গাজার ফিলিস্তিনিদের। ইসরায়েলি হামলায় আনন্দের ঈদের দিন বিষাদের দিন হয়েই থাকল তাদের জন্য। একে তো ইসরায়েলি গোলার আঘাত, অন্য দিকে খাবার সঙ্কট, দুই মিলিয়ে ঈদ এবার ঈদ হয়ে আসেনি সেখানে। যুদ্ধবিরতি শেষে গত ১৮ মার্চ থেকে ইসরয়েলি বাহিনীর পুনঃপুনঃ হামলা চলছে গাজায়। রবিবার ঈদের দিনও কমপক্ষে ২০ ফিলিস্তিনি নিহত হন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু।

ঈদের দিনটি আনন্দে মুখরিত হওয়ার কথা ছিল। পরিবারের সবাই নতুন পোশাক পরে একত্রিত হয়ে খাবারের টেবিলে অংশগ্রহণ করবে, এমনটাই স্বাভাবিক নিয়মে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এবার গাজায় তা হয়নি। উল্টো সেখানে ২০ লাখ ফিলিস্তিনি শুধু বাঁচার জন্য লড়ছে এখন।

দেইর আল-বালাহ শহরের বাইরে নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন আদেল আল-শায়ার। তার কাছে এটি ‘দুঃখের ঈদ’। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের প্রিয়জন, শিশু, জীবন এবং ভবিষ্যত হারিয়েছি। আমরা আমাদের ছাত্র, স্কুল এবং প্রতিষ্ঠান হারিয়েছি। আমরা সবকিছু হারিয়েছি।”

শায়ারের পরিবারে ২০ সদস্য ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে কিছুদিন আগে চারজন ছোট ভাইপোও ছিল। মৃত্যুর খবর সাংবাদিকদের বলতে গিয়ে তার চোখ কান্নায় ভিজে যাচ্ছিল।

দুই মাসের যুদ্ধবিরতি শেষ করে গত ১৮ মার্চ ইসরায়েল আবার গাজায় তীব্র বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযানে শুরু করে। এরপর থেকে ইসরায়েল হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে। গত চার সপ্তাহ ধরে খাবার, জ্বালানি বা মানবিক সাহায্য গাজায় প্রবেশ করতে দেয়নি।

আরব মধ্যস্থতাকারীরা পুনরায় যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করছে। আর হামাস শনিবার জানিয়েছে, তারা মিশর ও কাতারের একটি নতুন প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এর বিস্তারিত তথ্য এখনও জানা যায়নি। ইসরায়েল বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে নিজেদের প্রস্তাব এগিয়ে নিয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলের হামলায় ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহে মার্চের শুরুতে ইসরায়েল একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি ভেঙে গাজায় আবার হামলা শুরু করে। ইসরায়েলি সরকার বলেছে, তারা হামাসকে ইসরায়েলি আটক বন্দিদের মুক্তির জন্য চাপ দেওয়ার জন্য এটি করেছে।

গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের অনুযায়ী, সম্প্রতি ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রায় ১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে শতাধিক শিশুও রয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নির্দেশে ফিলিস্তিনিরা তাদের পাড়া ছেড়ে চলে গেছে।

রমজান মাসের শেষের দিকে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশা ভেস্তে গেছে। বাড়ি ছেড়ে পালাবেন না কি থাকবেন, তা জানেন না গাজার বাসিন্দা ইসমাইল জাকাউত। তার মতে, এটি একটি মানসিক লড়াই।

এই রমজানে গাজার মানুষকে খাবারের জন্যও সংগ্রাম করতে হয়েছে। ইসরায়েল জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতির সময় মানবিক সাহায্য প্রবাহিত হতে দিয়েছিল। তবে গত এক মাস ধরে গাজায় সব ধরনের সাহায্য, এমনকি খাবারও প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ইসরায়েল বলছে, এটি হামাসকে চাপ দেওয়ার জন্য। অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এটি সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত শাস্তি। দাতব্য সংস্থাগুলো এখন সরবরাহের পরিমাণ সীমিত করছে। জাতিসংঘ কিছু কর্মী গাজা থেকে সরিয়ে নিচ্ছে।

এবার কমিউনিটি রান্নাঘরের সামনে ইফতারের জন্য মটরশুটি পেতে ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ লাইন দিয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে। সারাদিন রোজা থেকে এ এক ভীষণ অত্যাচার তাদের জন্য।

যুদ্ধের আগে ফুয়াদ নাসের ইফতার করতেন মুরগি, মাছ ও কাবাব দিয়ে। তখন খাবারের জন্য কারো সহায়তার দরকার ছিল না তার। কিন্তু এখন এক প্লেট খাবারের জন্য তাকে দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এমন বাস্তবতা কেন, এই প্রশ্ন নাসেরের।

রানা আল-আবাদি তার ইসরায়েলি বোমায় ধ্বংস হওয়া অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের কংক্রিটের ধ্বংসাবশেষের উপরে ইফতার রান্না করছেন। যুদ্ধের আগে, রমজানের প্রতিটি রাতে মসলাযুক্ত মুরগি, ভাত ও শাকসবজি পরিবেশন করা হত। এখন রানা ক্যান করা মাশরুম, ক্যান করা ভুট্টা, ক্যান করা সস এবং ক্যান করা চিজ দিয়ে পিৎজা বানাচ্ছেন।

তিনি একটি মাইক্রোওভেনের ভেতরের অংশ বের করে তা একটি ওভেনে পরিণত করেছেন। তার স্বামী যেসব বেড ম্যাট্রেসের ফোম ধ্বংসাবশেষ থেকে সংগ্রহ করেছেন তা দিয়ে আগুন জ্বালিয়েছেন। পিৎজার খামিরের সঙ্গে পোড়া ফোম লেগে থাকে। আর এগুলোই তার সন্তানদের খেতে হবে। ভিন্ন কোনো উপায় তাদের নেই।

নিজ দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে রানা জানান, “আগে রমজান ছিল ভিন্ন ভিন্ন খাবার, রঙ ও স্বাদের। এখন আমাদের কাছে একেবারেই কিছু নেই।”

রমজান মাসের শুরুতে কিছু পরিবার মিশরের একটি সংগঠনের উদ্যোগে আউটডোরে বিনামূল্যে খাবারের জন্য একত্রিত হয়েছিল। প্রতিদিনের ইসরায়েলি বিমান হামলার কারণে এমনভাবে একত্রিত হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। আসরে যুদ্ধের মধ্যে উদযাপন করার কিছুই নেই। তবে এই রমজানে মাত্র এক সপ্তাহ বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো একত্রিত হতে পেরেছিল। তারা একত্রিত হয়েছিলেন লম্বা টেবিলের পাশে, ধ্বংসস্তুপে কিংবা আলো-আধারির মধ্যে।

ঈদ আসে, গাজায় আনন্দ আসে না

জেরুজালেমের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ মোহাম্মদ আল হুসাইন শনিবার সন্ধ্যায় যখন ঘোষণা দেন, রবিবার ঈদুল ফিতর উদযাপন হবে, তখন ফিলিস্তিনিদের উৎসবে মেতে ওঠার কথা ছিল; কিন্তু যুদ্ধ আর ধ্বংসের মধ্যে দাঁড়িয়ে গাজার মুসলমানদের এখন ঈদের আয়োজন বাদ দিয়ে বেঁচে থাকার মধ্যেই আনন্দ খুঁজতে হচ্ছে।

“অলৌকিক কিছু না ঘটলে হয়ত এই শহরে আর কোনোদিন আনন্দ দেখা যাবে না,” হতাশ কণ্ঠে বলছিলেন গাজার বাসিন্দা মোহামেদ আল সারকা।

দেড় বছর ধরে চলা ইসরায়েলের হামলায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজা এখন ধ্বংসস্তূপের এক নগরী। মাঝে যুদ্ধবিরতি হলেও মার্চ মাসের ১৮ তারিখ থেকে আবার চলছে হামলা। তাতে এখন অবধি ৮৯৬ জন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে ২ হাজারের বেশি।

আর হিসাবটি যদি ২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরুর সময়টা থেকে ধরা হয়, তাহলে নিহতের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়ায়। আর আহতের সংখ্যা অন্তত ১ লাখ ১৪ হাজার, যার মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। ফলে এই মৃত্যু ্উপত্যকায় ঈদ এলে বাসিন্দাদের মনে আনন্দ আসে না। যেমন আসেনি রান্দা আল ফাউলের ক্ষেত্রে। তিনি ছিলেন আল নাসর এলাকায়। সেখানে হামলার পর তিন সন্তানকে নিয়ে এখন রয়েছেন তেল আল হাওয়া এলাকায়। রান্দার স্বামী হামলায় আহত হয়েছেন, এখন অক্ষত থাকায় নিজেকে সৌভাগ্যবতী ভাবছেন রান্দা।

সেখানেই থাকছেন মোহামেদ আল সারকা। তিনিও উদ্বাস্ত। ঈদ তার জন্য বেদনার এক স্মৃতি জাগিয়ে তোলার উপলক্ষ মাত্র। ইসরায়েলি হামলায় তিন সন্তানকে হারিয়েছেন এই ফিলিস্তিনি। এখন বাকি চার সন্তানকে নিয়ে বাঁচার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। “ঈদ আমাদের জন্য নয়। আমাদের শিশুদের জন্যও নয়। তাদের একট কাপড়ও কিনে দিতে পারিনি। যেখানে খাবার জোটানোই দায়, সেখানে অন্য কিছু কেনার সাধ কীভাবে হবে?” প্রশ্ন ছুড়ে দেন সারকা।

৪৭ বছর বয়সী নোয়া আবু হানি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উদ্বাস্ত। ছিলেন জাবালিয়া ক্যাম্পে, সেখানে হামলা হওয়ায় চলে এসেছেন উনাওরাহ ক্যাম্পে। এই নারী বললেন, “এই যুদ্ধ শুরুর আগে ঈদে কতই না আনন্দ করতাম আমরা। ঈদের সময় কা’ক (এক ধরনের কুকিজ) তৈরি করতাম। তা বিক্রি হত রোজার শেষ দিনে গাজার পথে পথে। সেই দিন ছিল কতই না আনন্দের!”

গত বছর নিরাানন্দের এক ঈদ পার করেন নোয়া। “আমরা উত্তর গাজায় আটকা পড়েছিলাম। পরিবারের সবাই। কোনও কা’ক বানাতে পারিনি। কোনো উদযাপনও হয়নি।”

ইসরায়েলের অবরোধের কারণ গাজায় খাদ্য সামগ্রীর দাম এতটাই চড়েছে যে কিছু কেনার জো নেই সাধারণ মানুষের।

খাত্তার হুসাইন নামে এক নারী আশ্রয় শিবিরে বসে কা’ক ভাজতে চেষ্টা করছিলেন। গাজায় গ্যাসের এখন বেশ সঙ্কট; তাই কাঠ-কাগজ কুড়িয়ে চুলা জ্বালাতে হচ্ছে। ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞ অবশ্য এগুলো সহজে পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

ভাজতে ভাজতেই খাত্তার বলছিলেন, “এখানে এখন বেদনাবিধূর এক পরিবেশ। আমরা আমাদের অনেক স্বজনকে হারিয়েছি। এক মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে আছি আমরা। আমাদের এখন জীবনকে ভালোবেসে বাঁচতে হচ্ছে। কিন্তু বাচ্চাগুলোকে তো বঞ্চিত রাখতে পারি না্ তাই তাদের মনে আনন্দ দিতে কিছু না কিছু আয়োজন তো করতেই হয়, সেটা যতই সামান্য হোক।”

যুদ্ধ কী, তা গাজার শিশুরা এতদিনে বুঝে গেছে। তারপরই ঈদের সময় কিছু না পাওয়ার বেদনা ভারী করে তাদের ছোট মন।

সাত বছরের হানিন কাঁদছিল অঝোরে। তার কারণ, ইসরায়েলি হামলায় তাদের ঘর তো গেছেই, সঙ্গে তার জামা-পুতুলগুলোও পুড়ে গেছে। “আমার এখন পরার মতো সুন্দর কোনো জামা নেই। আমি ঈদ পছন্দ করি না,” বলছিল হানিন।

নতুন পোশাকের চেয়ে এখন পানির গ্যালন ভর্তি করায়ই বেশি ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের। তাই শিশুদের জন্য খাবারের ন্যূনতম কিছু আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঈদ সারতে চাইছে তারা।

উম্মে মোহামেদ নামে এক নারী বলেন, “বাচ্চাগুলোর জন্য কিছু কুকিজ বানাচ্ছি, যাতে ঈদ বিষয়টি তাদের মন থেকে হারিয়ে না যায়। বাচ্চাগুলোর মন বেদনাহত। একটু আনন্দ তাদের দিতে চাই।”

“ঈদের আনন্দ নেই, সেটা ঠিক, ঈদ আনন্দও আনছে না। কিন্তু শিশুদের আমরা বোঝাতে চাই, আমরা বেঁচে আছি, বেঁচে থাকতে চাই, এমনকি এই ধ্বংসের মধ্যেও,” বলেন নোয়া।

তথ্যসূত্র : আল জাজিরা, এনপিআর

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সাবস্ক্রাইব করুন
পেইজে লাইক দিন