২৩ জুন ২০২৬ প্রকাশিত ১২২ পৃষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের জাস্টিস অ্যান্ড হোম অ্যাফেয়ার্স কমিটি সরকারের প্রস্তাবিত অভিবাসন নীতির বেশ কয়েকটি দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। কমিটির মতে, ৫ বছর থেকে ১০ বছরে Indefinite Leave to Remain (ILR)-এর যোগ্যতার সময়সীমা বাড়ানোর পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ সরকার উপস্থাপন করতে পারেনি। একই সঙ্গে, বর্তমানে বৈধ ভিসায় যুক্তরাজ্যে অবস্থানকারীদের ওপর নতুন নিয়ম পূর্ববর্তী সময় থেকে (retrospectively) প্রয়োগ না করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
সূত্র: House of Lords Justice and Home Affairs Committee, Settlement, Citizenship and Integration (২৩ জুন ২০২৬)।
১০ বছরের ILR-এর প্রস্তাব নিয়ে কমিটির আপত্তি
সরকারের 'Earned Settlement' পরিকল্পনার আওতায় অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য ILR পাওয়ার সময়সীমা ৫ বছর থেকে ১০ বছরে বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
তবে কমিটির পর্যবেক্ষণ হলো, এই পরিবর্তনের ফলে —
- দক্ষ কর্মীরা দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবেন;
- পরিবারগুলোর আর্থিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে;
- যুক্তরাজ্যে সামাজিক সংহতি (Integration) ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে;
- নিয়োগকর্তাদের জন্য দক্ষ কর্মী ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কমিটি বলেছে, এত বড় নীতিগত পরিবর্তনের আগে সরকারের উচিত পূর্ণাঙ্গ Impact Assessment প্রকাশ করা এবং স্পষ্টভাবে দেখানো যে এই পরিবর্তনের মাধ্যমে কী ধরনের বাস্তব সুফল পাওয়া যাবে।
বর্তমান ভিসাধারীদের ওপর নতুন নিয়ম চাপানো উচিত নয়
প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর একটি হলো — যারা বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী যুক্তরাজ্যে এসেছেন এবং ৫ বছর পর ILR পাওয়ার প্রত্যাশায় জীবন ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করেছেন, তাদের ওপর নতুন ১০ বছরের নিয়ম প্রয়োগ করা উচিত নয়।
কমিটি এ ধরনের পদক্ষেপকে সুস্পষ্টভাবে অন্যায্য বলে উল্লেখ করেছে।
তাদের মতে, আইন পরিবর্তন হলে সেটি ভবিষ্যতের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে; কিন্তু পূর্ববর্তী নিয়মের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে আসা ব্যক্তিদের ওপর নতুন শর্ত চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত হবে না এবং আইনি জটিলতাও সৃষ্টি করতে পারে।
শিশুদের জন্য সহজ Settlement-এর পথ
কমিটি বলেছে, যেসব শিশু অল্প বয়সে যুক্তরাজ্যে এসেছে এবং এখানেই বেড়ে উঠেছে, তাদের জন্য স্থায়ী বসবাসের একটি সহজ ও পরিষ্কার পথ থাকা উচিত।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব শিশু কার্যত ব্রিটিশ সমাজের অংশ হয়ে ওঠে। তাই তাদের দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা উচিত নয়।
'Earned Settlement' হলে হতে হবে নমনীয়
কমিটির মতে, সরকার যদি Earned Settlement ব্যবস্থা চালু করেই, তাহলে সেটি কেবল নির্দিষ্ট সময় পূরণের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়।
বরং বিবেচনায় রাখতে হবে —
- ব্যক্তির যুক্তরাজ্যে বসবাসের ইতিহাস,
- সমাজে অবদান,
- পারিবারিক পরিস্থিতি,
- শিশুদের স্বার্থ,
- এবং অন্যান্য মানবিক বিষয়।
সরকারের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি
প্রতিবেদনে Home Office-এর তথ্য ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
কমিটির মতে, সরকার জানে কত মানুষ যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করছে, কিন্তু — কতজন দেশ ছেড়ে যাচ্ছে, কতজন স্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছে, Settlement পাওয়ার পর তাদের অবস্থা কী এবং অভিবাসনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী — এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। এই লক্ষ্যে কমিটি Exit Check-এর তথ্য নিয়মিত প্রকাশের সুপারিশ করেছে।
জাতীয় Integration Strategy প্রণয়নের আহ্বান
কমিটির মতে, অভিবাসন নীতি শুধু ভিসা প্রদান বা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়। নতুন অভিবাসীদের সফলভাবে সমাজে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজন ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সরকারি সহায়তার সমন্বিত ব্যবস্থা। এই লক্ষ্যে ইংল্যান্ডের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ National Integration Strategy তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
Home Office-এর সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান জনবল ও প্রশাসনিক সক্ষমতা দিয়ে আরও জটিল অভিবাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে। তাই সুপারিশ করা হয়েছে — আরও দক্ষ Caseworker নিয়োগ, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, আবেদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং অভিবাসন ব্যবস্থার স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা।
দীর্ঘমেয়াদি Migration Plan তৈরির আহ্বান
কমিটির মতে, অভিবাসন নীতি শুধু Home Office-এর বিষয় হওয়া উচিত নয়। তারা একটি তিন বছর মেয়াদি জাতীয় Migration Plan প্রণয়ন এবং বিভিন্ন সরকারি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
এই প্রতিবেদন কি আইন?
না। এটি হাউস অব লর্ডসের জাস্টিস অ্যান্ড হোম অ্যাফেয়ার্স কমিটির একটি সুপারিশমূলক প্রতিবেদন।
সরকার এই সুপারিশগুলো মানতে আইনগতভাবে বাধ্য নয়। তবে সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনের জবাব দিতে হবে। এরপর সরকার চাইলে সুপারিশগুলো সম্পূর্ণ, আংশিক বা একেবারেই গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
৫২বাংলার বিশ্লেষণ
২৩ জুন প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত লাখো অভিবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ৫ বছর পর ILR পাওয়ার আশা নিয়ে যুক্তরাজ্যে এসেছেন, তাদের জন্য কমিটির অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে বিদ্যমান নিয়মের ভিত্তিতে আসা ব্যক্তিদের ওপর পরে নতুন শর্ত আরোপ করা ন্যায্য হবে না।
তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, এটি এখনো সরকারের নীতি নয় এবং আইনও নয়। সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত বর্তমান অভিবাসন বিধিই কার্যকর থাকবে। তাই গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সরকারি ঘোষণা এবং আইনগত পরিবর্তনের দিকেই নজর রাখা উচিত।
সূত্র: House of Lords Justice and Home Affairs Committee, Settlement, Citizenship and Integration (Published: 23 June 2026) | UK Parliament – Justice and Home Affairs Committee | UK Government Immigration White Paper (2025)
-
শুক্রবার পর্যন্ত তীব্র তাপপ্রবাহ, সপ্তাহান্তে শীতল আবহাওয়ার সম্ভাবনা
-
তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়ায় যুক্তরাজ্যে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে
-
তীব্র তাপদাহে বিপর্যস্ত যুক্তরাজ্যের সামাজিক ও কর্মজীবন
-
রেললাইনের তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি ছুঁতে পারে, সতর্ক করল যুক্তরাজ্যের নেটওয়ার্ক রেল
-
লন্ডনে ৪০ ডিগ্রি তাপদাহ: কর্মক্ষেত্রে আপনার অধিকার জানুন, সুস্থ থাকুন
আরও পড়ুন: