মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় যুদ্ধে জড়াবে কি না—সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু করার প্রয়োজন হতে পারে। এ সংক্রান্ত আলোচনার বিষয়ে আমি এবং হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া আর কেউ কিছু জানেন না।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে যুদ্ধ কবে পুরোপুরি শেষ হবে, তা নিশ্চিত না করলেও তিনি দাবি করেন, সংকটের সমাধান হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে আসবে।
ইরান প্রসঙ্গে মন্তব্যের জেরে জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা কমানোর ঘোষণা দেওয়ার পরদিনই ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হয়—তিনি ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা সরাবেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, সম্ভবত তিনি তেমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি জানান, ইরান অংশ নিলে তাঁর কোনো আপত্তি নেই।
যুদ্ধজাহাজে নতুন করে জ্বালানি, খাদ্য ও গোলাবারুদ সরবরাহ করছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা নিজেদের যুদ্ধজাহাজগুলোতে নতুন করে জ্বালানি, খাদ্য ও গোলাবারুদসহ প্রয়োজনীয় রসদ পাঠাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বার্তায় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেন্টকমের প্রকাশিত কিছু ছবিতে দেখা যায়, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ‘ইউএসএস ডেলবার্ট ডি ব্ল্যাক’-এ বিপুল পরিমাণ রসদ তোলা হচ্ছে।
এই যুদ্ধজাহাজটি বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে সহায়তা দিচ্ছে।
এদিকে, যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে মার্কিন সিনেটে তথ্য দিয়েছেন পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ। তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে এখন পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি (২৫ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় হয়েছে।
তবে বিভিন্ন সংস্থার মতে, প্রকৃত ব্যয় এই হিসাবের তুলনায় আরও বেশি হতে পারে।
নতুন হামলার শঙ্কায় তেলের দামে রেকর্ড ঊর্ধ্বগতি
ইরানে সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ব্রিফিং দেওয়া হতে পারে—এমন খবরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যদিও দিনের শেষে তা কমে ১১৪ ডলারে নেমে আসে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর তেলের দামে এমন ঊর্ধ্বগতি আর দেখা যায়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় দেশটির ওপর ‘স্বল্পমেয়াদী কিন্তু শক্তিশালী’ বিমান হামলার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করতে সেখানে পদাতিক সেনা পাঠানোর বিষয়টিও ট্রাম্পের বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে এই রুট কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামে বড় প্রভাব পড়ছে, যার সরাসরি চাপ পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে ইরানে হামলা হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধস নামতে পারে। শুধু জ্বালানি নয়, খাদ্যপণ্যের দাম ও উড়োজাহাজ ভাড়াও ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেল খাতের নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে যুদ্ধের প্রভাব মার্কিন ভোক্তাদের ওপর যেন না পড়ে, সে বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। এই আশঙ্কায় এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতেও বড় ধরনের দরপতন দেখা গেছে।