স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনায় মুখ খুললেন বিএনপির নির্বাচিত এমপি ও মন্ত্রীরা। গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান জামায়াতে ইসলামী ও একাত্তরে তাদের ভূমিকা নিয়ে কড়া বক্তব্য দেওয়া পরদিন বুধবার (২৯ এপ্রিল) বেশ কয়েকজন সরকার দলীয় সংসদ সদস্য জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে কড়া বক্তব্য দেন। জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এ সব বক্তব্য দেন।
’৭১-এর গণহত্যা প্রশ্নে জামায়াতের সঙ্গে বিতর্ক চলবে
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহিরউদ্দিন স্বপন বলেছেন, জুলাইয়ের রক্তের দাগ মুছে না ফেলা পর্যন্ত যেমন আওয়ামী লীগকে ঘিরে বিতর্কের নিষ্পত্তি হবে না, তেমনি ১৯৭১ সালের গণহত্যার বিষয়ে গ্রহণযোগ্য অবস্থান না নেওয়া পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিতর্ক অব্যাহত থাকবে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একদিকে এই বিতর্ক চালিয়ে যাবে সংবিধানের মধ্যে, সংসদের মধ্যে, গণতন্ত্রের মধ্যে এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে এবং এর বাইরে তা যেতে দেবে না, এ বিষয়ে আপস করা হবে না।’
বিরোধীদলীয় নেতার প্রসঙ্গ টেনে জহিরউদ্দিন স্বপন বলেন, বিরোধী দলের আসনে এমন একজন ব্যক্তি রয়েছেন, কারাগারে যার সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে, তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘ বা এ ধরনের কোনো প্রচলিত ছাত্রসংগঠনের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামের রাজনীতিতে আসেননি। তিনি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দলটিকে দেখেন এবং নেতৃত্ব দেন।’
জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে জহিরউদ্দিন স্বপন বলেন, ‘জামায়াত বাংলাদেশে স্বতন্ত্রভাবে যতবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, ততবারই তাদের ভোট ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এবারের নির্বাচনে সেই পরিসংখ্যানে পরিবর্তন এসেছে। এই প্রথম বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভোটের চিত্র থেকে শুরু করে সংসদের বিন্যাস এবং পলাতক ফ্যাসিবাদের সমর্থক ভোটাররা কোথায় ভোট দিয়েছেন, তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘যদি পরাজিত আওয়ামী লীগ আবার সংসদে ফিরে আসে এবং দাবি তোলে যে চব্বিশের জুলাই গণহত্যা নিয়ে কথা বলা যাবে না, তাহলে তাদের হাত থেকে রক্তের দাগ মোছা সম্ভব হবে না।’
একই আলোচনায় জামায়াতের অতীত ভূমিকাও তুলে ধরেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘১১ দলীয় জোটের প্রধান দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের সহযোগীদের মনে রাখতে হবে, তারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল… এমনকি এখনও অনেকে বক্তৃতায় শরিয়াহ আইন কায়েমের কথা বলেন।’
স্বাধীনতাবিরোধীদের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে
ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন ২০২৬–এ বীর মুক্তিযোদ্ধার যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগী—তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং আলবদর, আলশামস বাহিনী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে যারা লড়েছেন, তাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই আইন সংসদে পাস হয়েছে এবং এতে জামায়াতে ইসলামী কার্যত বিরোধিতা করেনি; এনসিপির পক্ষ থেকেও লিখিত সমর্থন দেওয়া হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, “‘বাই অপারেশন অব ল অ্যান্ড ইন্টারপ্রিটেশন’’–এ তাহলে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে কারা বিরোধিতা করেছিল। কারা খুন, গুম ও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত ছিল। কারা অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির জন্য দায়ী ছিল।’
পাকিস্তানে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অপমানের অভিজ্ঞতা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, ২০০৪ সালে তিনি জামায়াতের এক সংসদ সদস্যসহ পাকিস্তানে একটি সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের কারণে তিনি অবমূল্যায়নের শিকার হন। অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যখন বেশি বাড়াবাড়ি করে, তখন বলতে ইচ্ছা করে, তোরা রাজাকার, তোরা আলশামস, তোরা আলবদর।’
মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির উদ্যোগ
মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমদ আযম খান বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও গণহত্যার শিকারদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনও তৈরি হয়নি। তবে বর্তমান সরকার এ তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এর মাধ্যমে একটি নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য তালিকা তৈরি করা হবে।
আরও পড়ুন: ফজলুরের বক্তব্যে সংসদ উত্তপ্ত: ‘শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করতেই পারে না’