ইনকিলাব মঞ্চের আহ্ববায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর খবরে মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ভবনে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে; দেওয়া হয়েছে আগুন।
বৃহ্স্পতিবার মধ্যরাতের পর একদল হামলাকারী ধানমন্ডির সাততলা এ ভবনের বিভিন্ন তলায় গিয়ে প্রতিটি কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর করেছে।
তারা বিভিন্ন তলায় থাকা বাদ্যযন্ত্র ও শিল্প কর্ম ধ্বংস করেছে। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কক্ষে থাকা কাগজপত্র ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইভের ভিডিওতে।
মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখে ও হেলমেট পরে আসা হামলাকারীরা বিভিন্ন তলায় ভাঙচুর শেষে চলে যাবার সময় ভবনের সামনে আগুন দেয়। তবে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আসার আগেই সেই আগুন নিভে যাওয়ায় বড় অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষা পায় বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণের নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠনটি।
সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন হাদির মৃত্যুর খবর আসার পর শাহবাগসহ রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষোভ বিক্ষোভের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে হামলার খবরের মধ্যে একদল বিক্ষোভকারী রাত ১টার পর জড়ো হতে থাকেন ধানমন্ডির শংকরে ছায়ানটের সামনে।
ঐতিহ্যবাহী এ ভবন ও সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে হামলার বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা দলে দলে সেখানে ঢুকে পড়ে ভাঙচুর চালাতে শুরু করে। তারা সংগঠনের নামফলক ভেঙে ফেলে। নিচ তলায় গিয়ে সব আসবাবপত্র ও বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলে।
চানেলে টোয়েন্টিফোরের লাইভ ভিডিওতে তিন তলা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি কক্ষ ভেঙে চুরমার করার চিত্র দেখা যায়। মিলনায়তনে হামলাকারীর যা পেয়েছেন সেটিই ভাঙচুর করেছেন। পুরো মনিটরিং সিস্টেম, লাইট ও ফ্যান ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে থাকা মাটির তৈরি চারুকর্ম ও শিল্প কর্ম ভেঙে ফেলা হয়েছে।
এ ঘটনার ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে ভাঙচুরের সময় হামলাকারীদের বলতে শোনা যায় ‘ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চার’ কোনো জায়গা নেই বাংলাদেশে।
ভিডিওতে দেখা যায়, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কক্ষও বাদ যায়নি। আলমারির গ্লাস ভেঙে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। চেয়ার-টেবিল সব ওলট পালট করা হয়েছে। ফ্যান ও জানালাও ভাঙচুর করা হয়েছে।
ধানমন্ডি থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা মিথুন সিংহ বলেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার কিছু পরেই ছায়ানটে হামলার ঘটনা ঘটে।
পুলিশের ধারণা বিক্ষোভকারীদের একই অংশ এ দুই হামলা চালিয়েছে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ হামলার পর ছায়ানট ভবনে পরিচালিত ‘ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তনের’ ক্লাসসহ সংগঠনের সব কার্যক্রম পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রাত সাড়ে ৩টার দিকে ছায়ানটের ফেইসবুকে পেইজে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
বাঙালিকে আপন সংস্কৃতি ও দেশীয় বৈশিষ্ট্যে স্বাধীনসত্তায় বিকশিত হতে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত ছায়ানট এর আগে প্রাণঘাতি হামলার মুখেও পড়েছে।
পাকিস্তানি শাসকদের বাধা উপেক্ষা করে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদযাপন এবং তার সূত্র ধরে পরে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের জন্ম। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে রমনা বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করে এটি পরিচিতি পেয়েছে।
বর্ষবরণেই সেই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানটিই ২০০১ সালে ভয়াবহ এক বোমা হামলার শিকার হয়। এতে প্রাণ য়ায় ১০ জনের এবং আহত হন বেশ কয়েকজন।
এরপরও দমে যায়নি ছায়ানট; সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও সংগীতের দুই পুরোধা ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের নেতৃত্বে এগিয়ে যায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড।
এদিন রাতের হামলার পর সংগঠনটির সদস্য, ছাত্র ও শুভাকাঙ্খীরা সোশাল মিডিয়ায় সরব হয়ে বলেছেন, এ আঘাতেও তাদের কর্মকাণ্ড বন্ধ হবে না।
ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা সংস্কৃতি উপদেষ্টার
ছায়ানট ভবনে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত প্রত্যেককে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) দুপুরে ধানমন্ডির শংকরে ছায়ানট ভবন পরিদর্শন করেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো ঘুরে দেখেন এবং ছায়ানটের সংগঠক পার্থ তানভীর নভেদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সংস্কৃতি উপদেষ্টা বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজ দেখে প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। এই ভবনে হামলা চালানো হয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমি ছায়ানট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি—ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ দ্রুত শেষ করতে সরকার আর্থিক সহায়তাসহ সব ধরনের সহযোগিতা দেবে। এ বিষয়ে ছায়ানট পরিচালনা কমিটি আলোচনা করে আমাদের জানাবে।’
তিনি বলেন, ‘ভবনের নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ছায়ানটের বাইরে বিজিবি ও পুলিশ কঠোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গেও আলোচনা করেছি।’
এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ‘এটি অবশ্যই নির্বাচন বানচাল করার ষড়যন্ত্র। কারা প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে হামলা করেছে—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যারা এসব করেছে, তারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ চায় না।’
সংস্কৃতি উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘জাতীয় শোকের এই মুহূর্তে একটি শ্রেণী দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটে হামলা চালিয়ে ক্ষয়ক্ষতি করেছে। হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কোনও সাংস্কৃতিক সংগঠনে হামলা শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনারও পরিপন্থি।’
জাতীয় সংগীত গেয়ে প্রতিবাদ
সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটে হামলার ঘটনায় গান গেয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন নালন্দা ও ছায়ানট বিদ্যায়তনের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংস্কৃতিকর্মীরা।
শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) বিকাল ৪টায় ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের সামনে সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীতসহ কয়েকটি গান পরিবেশন করা হয়।
প্রতিবাদী এই আয়োজনে অংশ নিয়ে সংস্কৃতিকর্মী আরিফ নূর বলেন, "রাতে ছায়ানটে যে ন্যাক্কারজনক হামলা হয়েছে, তার প্রতিবাদে এটি আমাদের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ।"
ছায়ানটে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে কেউ কেউ প্ল্যাকার্ড হাতেও দাঁড়িয়েছিলেন।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন এই প্রতিবাদী আয়োজনে অংশ নিয়ে বলেন, "ছায়ানটে হামলার পর থেকেই অনেকে উৎকণ্ঠা নিয়ে সকাল থেকে ছায়ানটে এসেছেন। আমরাও এসেছি। তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংস্কৃতিকর্মীরা গান গেয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছি।
"আমরা দাবি জানাই, দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।"
-
র্যাবের নাম বদলে দিচ্ছে সরকার, নতুন নাম জানালো
-
বিএনপির ‘শাঁখের করাত’ ৯২ বিদ্রোহী প্রার্থী
-
বিশ্ব ক্যান্সার দিবস উপলক্ষে উত্তরা লেডিস ক্লাবে ক্যান্সার সচেতনতা সেমিনার অনুষ্ঠিত
-
বিমানের এমডি স্ত্রীসহ গ্রেপ্তার, আদালতের নির্দেশে কারাগারে
-
জুলাই গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে ৮৩৭টি হত্যা মামলা, ৪৫৩টিতেই শেখ হাসিনা আসামী