স্বেচ্ছায় দেশে ফিরলে আর্থিক প্রণোদনা
যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত অবৈধ অভিবাসীরা স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে গেলে ব্যক্তিপ্রতি ১০ হাজার পাউন্ড এবং পরিবারপ্রতি সর্বোচ্চ ৪০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত পেতে পারেন। অবৈধ অভিবাসীদের চাপ কমাতে এই পাইলট পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটির সরকার। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেছেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই প্রণোদনা গ্রহণ না করলে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে জোর করে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
লন্ডনে ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) লন্ডনে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এই পরিকল্পনার ঘোষণা দেন শাবানা মাহমুদ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাউন্ড পাবেন এবং একটি পরিবারে চারজন সদস্য পর্যন্ত এই সুবিধা নিতে পারবেন। ফলে একটি পরিবার সর্বোচ্চ ৪০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত পেতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৬৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
পাইলট প্রকল্পে থাকবে ১৫০ পরিবার
এই পাইলট প্রকল্পের আওতায় করদাতাদের অর্থে পরিচালিত আশ্রয় আবাসনে থাকা প্রায় ১৫০টি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সরকারের ধারণা, পরিকল্পনাটি সফল হলে বছরে প্রায় ২ কোটি পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনে সরকারের ব্যয়
আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের জন্য সরকারের উচ্চ ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরে শাবানা মাহমুদ উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, তিন সদস্যের একটি পরিবারকে রাখতে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ব্যয় হয়। এর তুলনায় এককালীন আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে তাদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরাতে পারলে করদাতাদের অর্থ সাশ্রয় হবে।
আশ্রয় আবেদনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যে ৮২ হাজার ১০০টি আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন জমা পড়ে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬০০। এর মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। একই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে ২৮ হাজার ৪ জন স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে গেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি।
আশ্রয়প্রার্থীদের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান
আবেদনকারী ও প্রত্যাখ্যাতদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি রয়েছেন, সেই তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৪-২৫ সালের হিসাবে নাগরিকত্বের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল চতুর্থ। ওই সময়ে বাংলাদেশিদের আশ্রয়ের আবেদন ছিল ৭ হাজার ২২৫টি, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জনের আবেদন অনুমোদিত হয় এবং ৫ হাজার ৯০০ জনের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়।
আগের কর্মসূচিতে কম ছিল সহায়তা
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের একটি কর্মসূচি চালু রয়েছে। এতে দেশে ফিরতে সম্মত হলে একজন আশ্রয়প্রার্থী সর্বোচ্চ ৩ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত সহায়তা পান। নতুন পরিকল্পনায় সেই সহায়তার পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়ানো হচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক
এই প্রকল্প ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি এবং ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকে বলেছে, এ ধরনের আর্থিক প্রণোদনা মানুষকে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে আসতে উৎসাহিত করতে পারে।
বিরোধীদের সমালোচনা
কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলিপ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, অবৈধভাবে দেশে প্রবেশকারীদের অর্থ দেওয়া ব্রিটিশ করদাতাদের প্রতি অপমান। অন্যদিকে রিফর্ম ইউকের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফ বলেন, ৪০ হাজার পাউন্ড দেওয়া ‘অবিশ্বাস্য’ এবং এটি অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের জন্য যেন পুরস্কার।
সরকারের ব্যাখ্যা
তবে সরকার মনে করছে বিষয়টি উল্টো। সরকারি একটি সূত্র বলেছে, এই অর্থ মানুষকে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে আসতে উৎসাহিত করবে না। কারণ মানব পাচারকারীরা একজন অভিবাসীকে যুক্তরাজ্যে আনতে ১৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত নেয়। ফলে শুধু অর্থ পাওয়ার আশায় কেউ অবৈধভাবে এখানে আসবেন—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ
অন্যদিকে অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। প্রায় ১০০টি সংগঠনের জোট রেফিউজি অ্যান্ড মাইগ্র্যান্ট চিলড্রেনস কনসোর্টিয়াম এক বিবৃতিতে বলেছে, পরিবারগুলোকে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হবে, অথচ আইনি পরামর্শ নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় থাকবে না।
শিশুদের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা
সংগঠনটি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য সহায়তা কমিয়ে দিলে শিশুদের গৃহহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞের মতামত
যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন ও মানবাধিকার আইনে বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নতুন যে নীতি নেওয়া হয়েছে, তা মূলত ব্যয় কমানো ও দ্রুত প্রত্যাবাসন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। অর্থ দিয়ে মানুষকে দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করা নৈতিক ও মানবিক প্রশ্নও তৈরি করে। বিশেষ করে শিশুসহ পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের নীতি মানবাধিকার ও সামাজিক দায়বদ্ধতার দৃষ্টিকোণ থেকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
কার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করাও সরকারের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ, বলেন মনোয়ার হোসেন।
-
রাজনগর ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ইউকে'র ইফতার মাহফিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
-
স্টেপনি শাহজালাল মসজিদ নির্মাণ কাজ ৮০ ভাগ সম্পন্ন: জরুরি প্রয়োজন £৭০০,০০০
-
হাউস অব কমন্সে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ : রাজনৈতিক বন্দি ও সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে সরব এমপি ও লর্ডরা
-
সেবা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতায় ইস্ট লন্ডন মসজিদের পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা
-
লন্ডনে সিভিক অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত সাংবাদিক তাইসির মাহমুদ
আরও পড়ুন: