‘আই অ্যাম ব্যাক।’
হিউস্টনে শেষ বাঁশি বাজার পর টিভি ক্যামেরার সামনে চিৎকার করে বলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এ কথার অর্থও পরিষ্কার—ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের ১-১ গোলে ড্র ম্যাচে খুব বাজে খেলেছিলেন তিনি। অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পে থেকে লিওনেল মেসির মতো তারকারা একাধিক গোল পাচ্ছেন। ৪১ বছর বয়সী রোনালদো কি তবে ফুরিয়ে গেছেন?
উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদো দেখিয়ে দিলেন—না, ফুরিয়ে যাননি, বরং তিনি ফিরেছেন!
সমালোচনার মুখে পড়ে অনেকেই তাকে বাতিলের কাতারে ফেলে দিয়েছিলেন। তবে সবাই হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন, কিংবদন্তিরা জানেন কীভাবে ফিরে আসতে হয়। হিউস্টনে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে পর্তুগালের ৫-০ গোলের জয়ে জোড়া গোল করে সেই প্রত্যাবর্তনের বার্তাই দিয়েছেন রোনালদো।
এই ম্যাচ শেষে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসিকে নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে কিছুটা বিরক্ত হন পর্তুগিজ তারকা।
আর্জেন্টিনার হয়ে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন মেসি। গ্রুপ পর্বের দুই ম্যাচেই হ্যাটট্রিকসহ করেছেন মোট পাঁচটি গোল। অন্যদিকে বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দুই গোল করা রোনালদোর দল পর্তুগাল দুই ম্যাচে এক জয় ও এক ড্র করেছে। মিক্সড জোনে প্রথম প্রশ্নেই সাংবাদিকেরা তাকে জিজ্ঞেস করেন, বিশ্বকাপের পরবর্তী ধাপগুলোতে মেসির মুখোমুখি হতে চান কি না—যেটি হতে পারে দুজনের সম্ভাব্য বিদায়ী ম্যাচও।
রোনালদো বলেন, ‘কী উত্তর দেব বুঝতে পারছি না, কারণ প্রশ্নটাই অর্থহীন। এমনটা হলে তো দারুণ হতো। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল গ্রুপ পর্ব পার হতে ম্যাচটা জেতা এবং সামনের লড়াইয়ের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা। আমরা জানি, কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটা বেশ কঠিন হবে। আমি ভালো খেলেছি, গোল পেয়েছি এবং দলকে সাহায্য করতে পেরেছি; পুরো দলই আজ দারুণ খেলেছে।’
এরপর পর্তুগালকে ঘিরে বিভিন্ন প্রশ্নে এগিয়ে চলে তার সংবাদ সম্মেলন। শেষদিকে আবারও মেসিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এক সাংবাদিক, ‘গতকাল (রাতে) মেসি দুই গোল করেন, এমবাপ্পেও...’—এ পর্যন্ত বলতেই রোনালদো তাকে থামিয়ে অন্য সাংবাদিককে প্রশ্ন করার সুযোগ দেন। পর্তুগিজ ভাষায় বলেন, ‘দালে, দালে, দালে (বলুন, বলুন, আপনিই বলুন)।’
সেই সাংবাদিক জানতে চান, তিনি আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে আগ্রহী কি না। জবাবে রোনালদো বলেন, ‘প্রশ্নের ওপর নির্ভর করছে, ভালো না হলে উত্তর দেব না।’ পরে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি কি বিশ্বকাপে চেনা ছন্দে ফিরেছেন?
রোনালদোর উত্তর, ‘আমি সব সময়ই ফিরে আসি; একটু আগে কিংবা পরে। নিজের কাজটা করে যাওয়াই আসল। আমি যা করি, তাতে আমার প্রবল বিশ্বাস আছে। আমার পুরো ক্যারিয়ারটাই এমন।’
এই ম্যাচের পর বিশ্বকাপে রোনালদোর গোল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০-এ—পর্তুগালের হয়ে যা সর্বোচ্চ। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে বাজে পারফরম্যান্সের পর সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সপ্তাহটা খুব কঠিন ছিল, অন্ধকার সময় পার করেছি। মনে হচ্ছিল, আমি যেন ফুটবল থেকে আগেই অবসর নিয়ে ফেলেছি। তবে হাল ছাড়িনি, বরাবরের মতোই লড়াই চালিয়ে গেছি। কারণ, অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে আমি কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাস করি। স্বীকার করতেই হবে, সময়টা ভীষণ কঠিন ছিল। তবে আমরা আবারও স্বরূপে ফিরেছি।’
পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ বলেন, ‘সে তো মানুষ। আমার মনে হয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো কিংবা নিজের অনুভূতি প্রকাশের পূর্ণ অধিকার তার আছে।’
ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড প্রসঙ্গে রোনালদো বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে রেকর্ড ভাঙা সব সময়ই আনন্দের। তবে আমার লক্ষ্য জাতীয় দলকে তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করা। এই পর্বের লক্ষ্য ছিল বাছাইপর্ব পার হওয়া, আর ৪ পয়েন্ট পেয়ে আমার মনে হয় আমরা ইতিমধ্যে তা করে ফেলেছি।’
রোনালদোর এক ম্যাচে ৬ রেকর্ড
হিউস্টনে ২৩ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাতে বিশ্বকাপের ‘কে’ গ্রুপের ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে হারিয়েছে শিরোপাপ্রত্যাশী পর্তুগাল। এই জয়ের রাতে জোড়া গোল করে আলো কাড়েন রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড সমালোচকদের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি গড়েছেন ছয়টি রেকর্ড।
ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটে জোয়াও কানসেলোর ক্রস থেকে ডান পায়ের শটে প্রথম গোল করেন তিনি। ৩৯তম মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেসের থ্রু বল থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন।
হ্যাটট্রিকের সুযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত জোড়া গোলেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাকে।
উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদোর গড়া রেকর্ডগুলো:
- প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে (২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬) গোল করার কীর্তি
- ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে ১১টি বড় টুর্নামেন্টে গোল
- ৪১ বছর ১৩৮ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতা
- বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে সর্বোচ্চ ১০ গোলের মালিক
- বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে বেশি বয়সে জোড়া গোলের রেকর্ড
- একই দেশের হয়ে সবচেয়ে কম ও বেশি বয়সে বিশ্বকাপে গোলদাতা হওয়ার কীর্তি
২০০৬ সালে ইরানের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেছিলেন রোনালদো। তখন তার বয়স ছিল ২১ বছর ১৩২ দিন।