যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ‘গেম অব চিকেন’-এ ইরান আপাতত এগিয়ে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে যে ‘অস্বাভাবিক’ নৌ অবরোধ শুরু করেছেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটবে—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো দেখা যায়নি।
সিএনএন জানিয়েছে, এই নতুন পদক্ষেপ শুধু অর্থনৈতিক ঝুঁকিই নয়, এর প্রভাব আরও বিস্তৃত পরিসরে পড়তে পারে।
যুদ্ধ ও পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপট
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি থাকা দেশগুলো—যেমন কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও সৌদি আরব—এ বিমানবন্দর, দূতাবাস ও জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
এই যুদ্ধে ইরান তাদের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও আলি লারিজানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে হারায়।
হরমুজ প্রণালি ও যুদ্ধবিরতি
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরান শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এক মাসেরও বেশি সময় পর প্রণালি খুলতে সম্মত হলে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হয়।
তবে ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠকেও স্থায়ী সমাধান আসেনি, অচলাবস্থা কাটেনি।
‘গেম অব চিকেন’ কী?
‘গেম অব চিকেন’ এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে দুই পক্ষ সরাসরি সংঘর্ষের দিকে এগোয়, কিন্তু কেউই আগে সরে দাঁড়াতে চায় না। যে পক্ষ আগে পিছু হটে, তাকে দুর্বল বা ‘চিকেন’ হিসেবে ধরা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত “পারস্পরিক অর্থনৈতিক ক্ষতি”-র একটি খেলা। ৩১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে তারা চাপ সামলাতে পারবে।
সামরিক ঝুঁকি ও বাস্তবতা
অবরোধ কার্যকর রাখতে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি প্রয়োজন, যা মার্কিন সেনাদের সরাসরি ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র আকাশপথে হামলার মাধ্যমে এই ঝুঁকি কম রেখেছে।
কিন্তু সরাসরি জাহাজে অভিযান ও জলসীমা নিয়ন্ত্রণ নিতে গেলে হতাহতের আশঙ্কা বাড়তে পারে।
জনমত ও রাজনৈতিক চাপ
মার্কিন জনগণের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। এই অবরোধের ফলে দুটি বড় ইস্যু সামনে আসতে পারে—গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং সেনা হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি।
ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, গ্যাসের উচ্চমূল্য নভেম্বর পর্যন্ত থাকতে পারে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
অর্থনৈতিক অচলাবস্থা
ইরান প্রতিদিন প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছিল, যা বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ২%। অবরোধে এটি বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেলের প্রবাহ ঝুঁকিতে পড়েছে। ইতোমধ্যেই তেলের দাম ৮% পর্যন্ত বেড়েছে এবং গ্যাসের দাম চার বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
ইরানের সহনশীলতা
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতায় ইরান অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে অভ্যস্ত। তাদের কাছে কিছু সময় টিকে থাকার মতো সম্পদ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রে ভাসমান মজুদসহ ইরানের তেলের পরিমাণ প্রায় ১৯ কোটি ব্যারেল, যা পুরোপুরি থামানো কঠিন।
বিকল্প কৌশল ও পাচার পথ
ইরান অতীতে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বিভিন্ন কৌশল নিয়েছে—যেমন ইরাকি তেলের সঙ্গে মিশিয়ে রপ্তানি বা পাকিস্তান হয়ে পাচার।
এ কারণে পুরোপুরি চাপ সৃষ্টি করা কঠিন হতে পারে।
কে আগে পিছু হটবে?
বিশ্লেষকদের মতে, “সময় ইরানের পক্ষেই।” অতীতে কঠিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করেও ইরান তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
‘যুদ্ধের নতুন পর্যায়’
যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর অবরোধ কার্যত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রচেষ্টা। মার্কিন নৌবাহিনীকে ইরানের জাহাজ থামানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প সতর্ক করেছেন—অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলে জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হবে। পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানও।
সংঘাত বিস্তারের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি আরও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ইরান ইতোমধ্যে আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনায় হামলার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী ও ইরান-সমর্থিত অন্যান্য মিলিশিয়াও সংঘাতে জড়াতে পারে।