নির্বাচনে ব্যস্ত ৩৫ হেলিকপ্টার, ব্যবহার করছেন কারা?
- আপডেট সময় : ১২:২৮:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 41
দেশে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে হেলিকপ্টারে যাতায়াত। ভোগান্তিহীন চলাচল ও জরুরি প্রয়োজনে আকাশপথের এই সেবার ব্যবহার বাড়ছে। বিয়ে, প্রবাসীদের বাড়ি ফেরা, জরুরি চিকিৎসা—এসবের পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণাতেও প্রতিদিন হেলিকপ্টার ব্যবহার হচ্ছে।
বিএনপি, জামায়াত ও গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা নির্বাচনি গণসংযোগে ঢাকা থেকে দেশের নানা প্রান্তে যেতে নিয়মিত হেলিকপ্টার ব্যবহার করছেন। নির্বাচনের প্রচার শুরু হওয়ার আগেও নেতাদের এ বাহনে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে যেসব জেলায় উড়োজাহাজ যোগাযোগ নেই, সেখানে কম সময়ে পৌঁছাতে হেলিকপ্টার কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
হেলিকপ্টার খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন আর আকাশপথে যাতায়াত শুধু বিলাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জরুরি করপোরেট যাতায়াত, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের কারখানা পরিদর্শন, ঈদের আগে বাড়ি ফেরা, এমনকি পর্যটনেও হেলিকপ্টারের চাহিদা বাড়ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মুমূর্ষু রোগীদের ঢাকায় আনার ক্ষেত্রেও এ সেবা ব্যবহৃত হচ্ছে। নির্বাচন ঘিরে চাহিদা বাড়ায় ভাড়াও কিছুটা বেড়েছে।
ভোট সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার–প্রচারণা এখন তুঙ্গে। সভা–সমাবেশ ও গণসংযোগে অংশ নিতে দলীয় প্রধানরা হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করছেন, ফলে অল্প সময়ে একাধিক কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
দেশে হেলিকপ্টার সেবার বিস্তার
দেশে ১৯৯৯ সালে সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে হেলিকপ্টার সেবার যাত্রা শুরু হয়। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ খাতের বিস্তার ঘটে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হেলিকপ্টার সেবা দিচ্ছে, যাদের বহরে রয়েছে প্রায় ৩৫টি হেলিকপ্টার।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত হেলিকপ্টারের সংখ্যা ৪২টি, যার মধ্যে প্রায় ৩৫টি বর্তমানে কার্যক্রমে রয়েছে। এসব হেলিকপ্টার পরিচালনা করছে ১৩টি ব্যবসায়িক গ্রুপ।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—স্কয়ার এয়ার লিমিটেড, মেঘনা অ্যাভিয়েশন, আর অ্যান্ড আর অ্যাভিয়েশন, বসুন্ধরা এয়ারওয়েজ, ইমপ্রেস অ্যাভিয়েশন, বিআরবি এয়ার, বাংলা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস, পারটেক্স অ্যাভিয়েশন, সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইনস, আকিজ, পিএইচপি, ফ্লাই ট্যাক্সি অ্যাভিয়েশন ও প্রবাসী হেলিকপ্টার। বাণিজ্যিক ব্যবহারের পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব কাজেও এসব হেলিকপ্টার ব্যবহার করে থাকে।
নির্বাচনে হেলিকপ্টার ব্যবহারের বিধি
হেলিকপ্টারে যাত্রী পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, নির্বাচনি ভ্রমণ এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। সম্প্রতি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি সংশোধন করে চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসির সংশ্লিষ্টরা জানান, দলীয় প্রধান, সাধারণ সম্পাদক বা সমপর্যায়ের নেতারা নির্বাচনি প্রচারে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারবেন। তবে হেলিকপ্টার থেকে কোনো লিফলেট বা প্রচারসামগ্রী বিতরণ করা যাবে না এবং এতে কোনো ব্যানার ঝোলানোও নিষিদ্ধ। আগে শুধু দলীয় প্রধান বা সমপর্যায়ের ব্যক্তিদেরই এ সুবিধা ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হেলিকপ্টারে যাতায়াত করে আলোচনায় আসেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলে তিনি আবারও আলোচনায় আসেন।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সড়ক ও আকাশপথে দেশের বিভিন্ন জেলায় সফর করেছেন। সর্বশেষ গত রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) তিনি হেলিকপ্টারে খুলনা যান। একই দিনে জামায়াত আমির শেরপুরে নির্বাচনি সফরে যান। যদিও উভয় নেতারই প্রচারণার জন্য বিশেষ বাস রয়েছে।
হেলিকপ্টার খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনি মৌসুমে ভাড়া সাধারণত ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এক দিনে একাধিক জেলায় যাতায়াত, ফ্লাইট সংখ্যা বৃদ্ধি, অপেক্ষা বা স্ট্যান্ডবাই চার্জ এবং বিভিন্ন পারমিট সংক্রান্ত ব্যয় এর পেছনে ভূমিকা রাখে। তবে গন্তব্য ও গুরুত্বভেদে ভাড়া কমবেশি হয়।
স্কয়ার এয়ার লিমিটেডের সেলস বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক কাইয়ুম সরকার জাগো নিউজকে বলেন,
“আমাদের তিনটি হেলিকপ্টার রয়েছে। এর মধ্যে করপোরেট কাজে গড়ে ৪৫ শতাংশ ব্যবহার হয়। বাকি সময় বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয়। শীত মৌসুমে দিনে এক–দুটি ফ্লাইট চালানো হয়, অন্য সময় ফ্লাইট আরও বেশি থাকে।”
হেলিকপ্টারের ভাড়া কত?
বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করে। ভাড়া নির্ধারিত হয় দূরত্ব, হেলিকপ্টারের মডেল (সিঙ্গেল বা টুইন টারবাইন), আসন সংখ্যা ও ফ্লাইট ঘণ্টার ওপর।
দেশে চালু রয়েছে এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট ও দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট হেলিকপ্টার।
এক ইঞ্জিনের হেলিকপ্টারে ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া ৬৫ থেকে ৭৫ হাজার টাকা, আর ভূমিতে অপেক্ষমাণ থাকলে ঘণ্টায় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। এতে সর্বোচ্চ চারজন যাত্রী বহন করা যায়।
ছয় আসনের বড় এক ইঞ্জিনের হেলিকপ্টারের ভাড়া ঘণ্টায় এক লাখ থেকে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা।
দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট হেলিকপ্টারের ভাড়া ঘণ্টায় দুই লাখ ২০ হাজার থেকে দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা, যেখানে সর্বোচ্চ সাতজন যাত্রী ভ্রমণ করতে পারেন। রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে ভাড়ায় ৩০ শতাংশ করছাড় দেওয়া হয়।
গত কয়েক বছর ধরে প্রবাসীদের শেয়ারে বাড়ি ফেরা ও ভ্রমণেও সেবা দিচ্ছে প্রবাসী হেলিকপ্টার। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেখা যায়, আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি মাগুরায় জনপ্রতি ৬ হাজার টাকা এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে জনপ্রতি ৫ হাজার টাকা ভাড়া অফার করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটে সতর্ক করে বলা হয়েছে, হেলিকপ্টার ভ্রমণের অফার ও রেট নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে হলে নির্দিষ্ট গন্তব্য, দিন, তারিখ ও সময় মিলিয়ে নিতে হবে। জনপ্রতি সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকায় ভ্রমণের সুযোগ কেবল ঘোষিত অফারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
প্রবাসী হেলিকপ্টারের বিপণন কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন,
“প্রবাসী হেলিকপ্টার চালু হওয়ায় যাত্রীদের ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। করপোরেট ভ্রমণেও ব্যবহার হচ্ছে। তবে গত দুই মাস ধরে কুয়াশার কারণে দিনে গড়ে মাত্র একটি ফ্লাইট চালানো যাচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে দিনে দুই–তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়।”
কীভাবে হেলিকপ্টার ভাড়া নেবেন
হেলিকপ্টার ভাড়া নিতে হলে যাত্রা ও গন্তব্যের স্থান, যাত্রীদের পরিচয়সহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। ভাড়া অগ্রিম পরিশোধ বাধ্যতামূলক। বিদেশি যাত্রীদের ক্ষেত্রে পাসপোর্টের ফটোকপি জমা দিতে হয়।
হেলিকপ্টার যেখানে অবতরণ করবে সেখানে নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে আগেই সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করতে হয়। বুকিং নিশ্চিত হওয়ার পর যাত্রীর তথ্য নিয়ে হেলিকপ্টার কোম্পানিগুলো বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে উড্ডয়নের আবেদন করে। সাধারণ যাত্রার ক্ষেত্রে উড্ডয়নের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে আবেদন করা বাধ্যতামূলক।

















